অপরাধীদের হাতে থানা লুটের অস্ত্র

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চট্টগ্রাম নগরীর ৮ থানাসহ পুলিশের ২৯টি স্থাপনায় হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। ৯৪৪টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৮৬ হাজার ৪৭৮ রাউন্ড গোলাবারুদ লুট হয়েছিল।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) অপরাধ বিভাগের তথ্য, লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে ৭৯৬টি গত দুই বছরে পুলিশ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। আরও ১৪৮টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। লুট হওয়া গোলাবারুদের মধ্যে ৫৬ হাজার ৮৫৮ রাউন্ড উদ্ধার করা গেছে।
থানা-ফাঁড়ি থেকে লুট করা বেশ কিছু অস্ত্র পেশাদার অপরাধীদের কাছ থেকে উদ্ধার হয়। সর্বশেষ এমন দুটি বিদেশি নাইন এমএম পিস্তল পাওয়া গেছে ২৪ মামলার আসামি মাদক ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলমগীরের কাছ থেকে। সিএমপির তালিকাভুক্ত এ মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করতে গিয়ে গত শনিবার (২৫ জুলাই) রাতে হামলার শিকার হয়ে গুরুতর আহত হন দুই উপপরিদর্শক (এসআই)।
সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ফয়সাল আহম্মেদ বললেন, ‘জুলাই আন্দোলনে লুট হওয়া কিছু অস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে গেছে। এর মধ্যে কিছু অস্ত্র হাতবদল হয়েছে। মাদক ব্যবসায়ী আলমগীরের কাছ থেকে যে দুটি নাইন এমএম পিস্তল উদ্ধার করেছি, সেগুলো ডবলমুরিং থানা থেকে লুট হয়েছিল। পরে হাতবদল হয়ে আলমগীরের কাছে পৌঁছে বলে তথ্য পেয়েছি।’
তিনি আরও বললেন, ‘আমরা এরই মধ্যে লুট হওয়া অধিকাংশ অস্ত্র উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি। কিছু অস্ত্র পাওয়া গেছে একদম পেশাদার সন্ত্রাসীদের কাছে। কিছু অস্ত্র পরিত্যক্ত অবস্থায়ও পাওয়া গেছে। কয়েকদিন আগে আকবর শাহ থানা এলাকায় লুট হওয়া একটি চায়নিজ রাইফেল মিলেছে ড্রেনে। ১০ শতাংশের মতো অস্ত্র আমরা এখনো উদ্ধার করতে পারিনি।’
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের বিজয় উল্লাসের মধ্যে বিক্ষুব্ধ জনতা চট্টগ্রামে পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনায় আক্রমণ করে। নগরীর ১৬ থানার মধ্যে ৮টিতে লুটপাট ও আগুন দেওয়া হয়। এগুলো হলো— কোতোয়ালি, পাহাড়তলী, পতেঙ্গা, ইপিজেড, চান্দগাঁও, ডবলমুরিং, হালিশহর, আকবর শাহ ও সদরঘাট থানা।
এ ছাড়া নগর পুলিশের বায়েজিদ বোস্তামী জোনের সহকারী কমিশনারের অফিস, সদরঘাট পুলিশ ফাঁড়ি, পাথরঘাটা পুলিশ ফাঁড়ি, মধ্যম হালিশহর পুলিশ ফাঁড়ি এবং ৮টি পুলিশ বক্সে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় লুট হওয়া অস্ত্র-গোলাবারুদ্ধ স্বেচ্ছায় জমা দেওয়ার জন্য সময় বেঁধে দিয়েছিল। এ সময়সীমার মধ্যে প্রায় ৬০০ অস্ত্র জমা পড়ে। সেনাবাহিনী, পুলিশ ও র্যাবের যৌথ অভিযানে সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে এবং পরিত্যক্ত অবস্থায় প্রায় ২০০ অস্ত্র উদ্ধার হয়। বেশকিছু পিস্তল ও শটগান এখনো পায়নি পুলিশ।
নগর পুলিশের এক উপকমিশনারের ভাষ্য, ‘অস্ত্র-গোলাবারুদ লুট হয়েছিল মূলত ৮ থানা থেকে। এর মধ্যে কিছু অস্ত্র ছিল বাহিনীর নিজস্ব। পুলিশের জব্দ করা অনেক অবৈধ অস্ত্রও থানা হেফাজত থেকে লুট হয়। অনেক সাধারণ মানুষ, যারা কোনো ধরনের অপরাধে যুক্ত নন, সেসময়ের পরিস্থিতিতে অতি উৎসাহী হয়ে কিংবা কৌতূহলবশত থানা থেকে অস্ত্র নিয়ে গিয়েছিলেন। পরে অবশ্য তাদের অনেকেই অস্ত্রগুলো ফেরত দেন। যারা ফেরত দেননি, পরে তাদের কেউ কেউ সেগুলো ফেলে দেন বলে আমাদের ধারণা।’
চট্টগ্রাম থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ছড়িয়ে গেছে দেশের বিভিন্ন স্থানে— এমন তথ্যও মিলেছে। ২০২৫ সালের ২০ ডিসেম্বর লক্ষ্মীপুর সদরের এক বাড়ির মেঝে খুঁড়ে একটি বিদেশি পিস্তল উদ্ধার হয়। গ্রেপ্তার করা হয় এক যুবককে। অস্ত্রটি চট্টগ্রামের হালিশহর থানা থেকে লুট করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছিল।
গত বছরের ১৮ জুন পাহাড়তলী থানা থেকে লুট হওয়া একটি সেভেন পয়েন্ট সিক্স টু (৭.৬২) এমএম পিস্তল উদ্ধার হয় সাইদুর রহমান মাসুম ওরফে ব্লেড মাসুম নামে এক পেশাদার ছিনতাইকারীর কাছ থেকে। ১৬ জুন নগরীর কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হওয়া পুলিশের একটি পিস্তল ও গুলি উদ্ধার হয় এক কাভার্ডভ্যানচালকের কাছ থেকে।
রাউজান থানা থেকে লুট হওয়া একটি চায়নিজ রাইফেল ও ৭ রাউন্ড গুলি পাওয়া যায় চট্টগ্রামে ‘টার্গেট কিলিংয়ে’ জড়িত একটি দুর্ধর্ষ অপরাধী চক্রের কাছ থেকে। গত বছরের ৭ অক্টোবর হাটহাজারী উপজেলার মদুনাঘাট এলাকায় প্রাইভেট কার আটকে গুলি চালিয়ে আব্দুল হাকিম নামে এক ব্যবসায়ীকে হত্যা করা হয়। বিএনপি সমর্থক হাকিম রাউজানের সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
সেই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকা ছয়জনকে গ্রেপ্তারের পর তাদের কাছ থেকে থানা লুটের অস্ত্র পাওয়া গিয়েছিল বলে পুলিশ জানায়।




