নতুন বেতন কাঠামো
চসিক-ওয়াসার কাঁধে চাপছে ৪৫০ কোটি টাকার বোঝা
- ওয়াসা বলছে, রাজস্ব বাড়িয়ে ব্যয় মেটানো হবে
- চসিক বলছে, করের বাইরে থাকা প্রতিষ্ঠানকে আওতায় আনবে
- সমৃদ্ধ তহবিলে নির্ভার সিডিএ

নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো ঘোষণা হওয়ায় বিপদে পড়ছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ও চট্টগ্রাম ওয়াসা। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা মেটাতে দুই সংস্থাকে বাড়তি ব্যয় করতে হবে প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা। দুটি প্রতিষ্ঠানই দুর্বল আর্থিকভাবে।
প্রতিষ্ঠান দুটির বাজেট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পুরো বছরের পরিচালন ব্যয় শেষে নামমাত্র টাকা উদ্বৃত্ত থাকে। তা-ও ব্যয় হয়ে যায় দেনা শোধ করতে। এরমধ্যে বাড়তি বেতন-ভাতার টাকা জোগাতে সিটি করপোরেশনকে হোল্ডিং ট্যাক্স (গৃহকর) ও ওয়াসাকে পানির দাম বাড়াতে হতে পারে।
তবে দুই সংস্থার কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, বাড়তি ব্যয় মেটাতে নগরবাসীর উপর করের বোঝা নয়, রাজস্ব আয় বাড়ানো হবে।
এক্ষেত্রে নির্ভার আছে আরেক সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। নতুন স্কেল অনুযায়ী বেতন-ভাতা খাতে বাড়তি ২৪ কোটি টাকা ব্যয় হলেও তাদের হাতে ৯০০ কোটির সমৃদ্ধ তহবিল জমা আছে।
গত সোমবার সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন করেছে সরকার। এতে গ্রেডভেদে মূল বেতন বেড়েছে ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ।
চসিকের কাঁধে ৩৫০ কোটি টাকার বোঝা
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বাজেট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সিটি করপোরেশনের আয় হয়েছে ১ হাজার ৬৬৫ কোটি ৯২ লাখ টাকা। ব্যয়ও হয়েছে সমানে সমান। কোনো উদ্বৃত্ত ছিল না। স্থায়ী-অস্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা খাতে ব্যয় হয়েছে ৩৩২ কোটি ২৪ লাখ টাকা। এরমধ্যে স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা খাতে ব্যয় হয়েছে ২৪৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা। নতুন বেতন স্কেল অনুযায়ী ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ বাড়লে চসিকের বেতন বাবদ অতিরিক্ত লাগবে ২৪৬ কোটি থেকে ৩৫০ কোটি টাকা। সংস্থাটির মোট বেতন-ভাতা এক লাফে দাঁড়াবে ৬৮২ কোটি টাকা।
তবে নিজস্ব উদ্বৃত্ত তহবিল না থাকায় এই বিপুল ব্যয় মেটানো সিটি করপোরেশনের পক্ষে সম্ভব নয়। সিটি করপোরেশন প্রধানত হোল্ডিং ট্যাক্স, সেবা ফি ও সরকারি অনুদানের ওপর নির্ভর করে তাদের ব্যয় মেটায়। এই বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে সরকারি থোক বরাদ্দের প্রয়োজন হবে। নয়তো নিজস্ব হোল্ডিং ট্যাক্স ও সেবা মাশুল বাড়াতে হবে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী, সিটি করপোরেশনের মোট প্রস্তাবিত বাজেট ধরা হয়েছে ২ হাজার ২৬০ কোটি ২৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪৮০ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। মূল বেতন বাবদ এতে ধরা আছে ১৬৫ কোটি টাকা। স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন প্রায় ৮ হাজার।
সিটি করপোরেশনের প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির চৌধুরী বলেছেন, ‘পে-স্কেল ঘোষণা হবে মাথায় রেখে বেতন-ভাতা খাতে বাড়তি ১৫০ কোটি টাকা বাজেট রাখা হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ গেজেট হলে কত টাকা বাড়বে সুনির্দিষ্টভাবে তা জানা যাবে। রাজস্ব খাত থেকে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার ব্যয় মেটানো হয়।’
সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এস এম সরওয়ার কামাল বলেছেন, ‘ইতোমধ্যে আমরা বন্দর থেকে ২৬৪ কোটি টাকা ন্যায্য কর আদায় করছি। পাশাপাশি ৩৬টি কনটেইনার টার্মিনালকে হোল্ডিং ট্যাক্সের আওতায় আনতে চিঠি দিয়েছি। সেখান থেকে কমপক্ষে ১২০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হবে বলে আশা করছি। এ ছাড়া সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি, সেগুলো মূল্যায়ন করে ন্যায্য হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় হবে। এভাবে আদায় হলে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা আদায় করতে পারব বলে আশা করছি। তাহলে বাড়তি বেতন-ভাতা মেটাতে আর কোনো সমস্যা হবে না।’
ওয়াসার কাঁধে চাপছে ৮৬ কোটি টাকা
চট্টগ্রাম ওয়াসার বাজেট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত অর্থবছরে ওয়াসার আয় ছিল ৩৩৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। ব্যয় হয়েছে ৩০২ কোটি টাকা।
৩৪ কোটি টাকা জমা থাকলেও সংস্থাটির ঋণ আছে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে তাদের কোনো উদ্বৃত্ত থাকে না। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট অনুযায়ী, স্বায়ত্তশাসিত এই সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মোট বেতন-ভাতা খাতে ব্যয় হয়েছে ৬৭ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। বিভিন্ন গ্রেড অনুযায়ী বেতন বৃদ্ধির হার ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ করা হলে সংস্থাটির মোট বেতন-ভাতার ব্যয় এক লাফে বেড়ে দাঁড়াবে ১৫৪ কোটি টাকায়। ফলে শুধু বেতন-ভাতা পরিশোধ করতেই ওয়াসার অতিরিক্ত ৮৬ কোটি ৩২ লাখ টাকা প্রয়োজন হবে। স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলে ওয়াসার কর্মকর্তা-কর্মচারী আছে ১ হাজার ৫৭০ জন। দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পগুলোর বিপরীতে বিপুল পরিমাণ ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতাও আছে ওয়াসার। ফলে এই অতিরিক্ত ব্যয়ভার মেটাতে হয় পানির দাম বাড়াতে হবে, নয়তো সরকারি ভর্তুকি দিতে হবে।
চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মো. জানে আলম বলেছেন, ‘পানির দাম বাড়িয়ে নয়, বকেয়া বিল ও পানি অপচয় কমিয়ে এই ব্যয় মেটানোর পরিকল্পনা আছে। গত মাসেও সর্বোচ্চ বকেয়া আদায় হয়েছে। এ ছাড়া পানি সরবরাহও বাড়ানো হচ্ছে। এতে বিলের আওতাও বাড়বে।’
সমৃদ্ধ তহবিলে নির্ভার সিডিএ
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সংস্থাটির ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আয় করেছে ১২২ কোটি টাকা। ব্যয় হয়েছে ৭৫ কোটি টাকা। ৪৭ কোটি টাকা তাদের জমা ছিল। বেতন-ভাতা খাতে ব্যয় হয়েছে ১৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। বিভিন্ন গ্রেডে ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ বাড়লে বেতন ভাড়া দাঁড়াবে প্রায় ৪৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। বাড়তি ব্যয় হবে ২৪ কোটি ৬ লাখ টাকা। সিডিএর তহবিলে জমা আছে প্রায় ৯৫০ কোটি টাকা।
সিডিএর অর্থ ও হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আনিসুল হক পাটওয়ারী বলেছেন, ‘বাড়তি বেতন-ভাতার প্রভাব সিডিএর কোষাগারে তেমন পড়বে না।’
অন্যদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিডিএর এক কর্মকর্তা বলেছেন, ‘দীর্ঘমেয়াদে বাড়তি বেতন-ভাতার ব্যয় মেটাতে প্রবাসীদের জন্য ফ্ল্যাট প্রকল্পসহ বিভিন্ন আয়বর্ধক প্রকল্পের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।’





