হজযাত্রীদের ৫৭ শতাংশের বয়স ৫০ থেকে ৭০

গ্রাফিক্স: আগামীর সময়
শারীরিক ও আর্থিক সক্ষমতা থাকলে জীবনে অন্তত একবার হজ করা মুসলমানদের জন্য ফরজ। বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর যেসব মুসলমান হজে যান তাদের বয়স বিশ্লেষণ করে মিলেছে অবাক করা এক তথ্য। ২০২৬ সালে মোট হজযাত্রীর সাড়ে ৫৭ শতাংশের বয়স ৫০ থেকে ৭০ বছর।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, দেশের মানুষ এমন এক সময়ে হজে যান, যখন তাদের জীবন একেবারে শেষবেলায়। ফলে হজের আনুষ্ঠানিকতা পালন করতে গিয়ে পড়েন নানান জটিলতায়। বাংলাদেশের মতো জটিলতায় পড়তে হয় না অন্য কোন মুসলিম দেশের হজযাত্রীদের। কারণ সেসব দেশের মানুষ হজপালন করেন কম বয়সেই।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন তালুকদার বেশি বয়সে হজে যাওয়ার কারণ জানিয়েছেন আগামীর সময়কে। তার মতে, ‘অনেকে মনে করেন হজ মানেই জীবনের শেষ ইবাদত; তরুণ বয়সে হজ করলে এর পবিত্রতা রক্ষা করা যাবে না—এমন ভ্রান্ত ধারণা থেকেই মানুষ অপেক্ষা করেন বৃদ্ধ বয়সে হজে যাওয়ার জন্য’।
তিনি জানান, আমাদের সমাজে ছেলে-মেয়ের বিয়ে বা ঘরবাড়ি তৈরির মতো দুনিয়াবি দায়িত্ব শেষ না করে হজে যাওয়াকে মনে করা হয় অন্যায়। পারিবারিক দায়িত্বকে প্রাধান্য দিতে গিয়েই অধিকাংশের বয়স পার হয়ে যায় ৫০ থেকে ৬০ বছর। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে মধ্যবিত্ত মানুষ চাকরির উপার্জন দিয়ে যেতে পারেন না হজে। তাদের নির্ভর করতে হয় অবসরকালীন প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থের ওপর। পেনশনের টাকার অপেক্ষা করতে করতে বয়স ৭০ ছুঁইছুঁই হয়।
তবে এই প্রবণতা কিছুটা পাল্টাচ্ছে। গিয়াস উদ্দিন দিলেন এমন খুশির খবরও। নিজেরও হজ এজেন্সি পরিচালনার অভিজ্ঞতা পর্যবেক্ষণ দিলেন এভাবে, ‘খুশির খবর হচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে দেখতে পাচ্ছি হজে যাচ্ছে তরুণদের একটি বড় অংশ।’
২০২৬ সালে হজযাত্রীদের বয়সভিত্তিক একটি তালিকা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়। সেখানে প্রকাশ পেয়েছে বাংলাদেশি হজযাত্রীদের বয়সের একটি চিত্র। তালিকায় ১৮ বছর বয়সে হজে যাচ্ছে এমন কোন বাংলাদেশি নেই! ১৮ থেকে ৪০ বছর বয়সে হজে যাচ্ছেন মাত্র ১২ শতাংশ মানুষ। ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সে হজে যাচ্ছেন ২৫ শতাংশ। ৫০ থেকে ৬০ বছর বয়সী হজযাত্রীর সংখ্যা সাড়ে ৩২ শতাংশ। ৬০ থেকে ৭০ বছর বয়সে হজে যাচ্ছেন প্রায় ২৫ শতাংশ। এছাড়া ৭০ বছর বয়সের পরে হজে যাচ্ছেন এমন সংখ্যা প্রায় ৬ শতাংশ।
বৈশ্বিক প্রবণতা
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মুসলমানরা যে বয়সে হজে যায় তার সঙ্গে সম্পূর্ণ আলাদা বাংলাদেশের এই চিত্র। জনসংখ্যায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়ার ৬৫ শতাংশ হজযাত্রীর বয়স ৩৫ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে। সেখানে শৈশব থেকেই শুরু হয় ‘হজ সেভিং অ্যাকাউন্ট’। তরুণরাই সেখানের মূল হজযাত্রী। পাকিস্তানের হজযাত্রীদের ৪৫ শতাংশই হজ পালন করেন ৪০ থেকে ৫৫ বছর বয়সে। আর ৪৫ থেকে ৬০ বছর বয়সে হজ পালন করেন ৩০ শতাংশ ভারতীয় হজযাত্রী।
বয়স্কদের ঝুঁকি
বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু প্রায় ৭২.৩ বছর। সরকারি চাকরিজীবীরা অবসরে যান ৫৯ বছর বয়সে। ৫০ থেকে ৭০ বছর বয়সে হজ পালন করতে গেলে পোহাতে বেশ কিছু জটিলতা। এই বয়সে অধিকাংশ মানুষ ভোগেন নানা অসুখে। থাকেন শারীরিকভাবে দুর্বল। হজের প্রতিটি রুকন পালনে দিনে প্রায় ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার পথ হাঁটতে হয়। বয়স ৬০ পেরলে মক্কার তীব্র গরম ও ভিড়ের মধ্যে এই শারীরিক ধকল সহ্য করা কষ্টসাধ্য।
শাহ আমানত হজ কাফেলার চেয়ারম্যান ইয়াসিন আলী মনে করেন, শারীরিক সক্ষমতা এবং আর্থিক সচ্ছলতা থাকলেই হজ মুসলমানদের জন্য ফরজ। কিন্তু এই দুটি বিষয় একসাথে যখন করা সম্ভব, আমরা করি না তখন। করি বার্ধক্যে গিয়ে। ফলে তৈরি হয় নানা জটিলতা।
তিনি জানান, হজে গিয়ে মারা যাওয়া বা অসুস্থ হওয়া যাত্রীদের বেশিরভাগই বয়স্ক। হার্ট অ্যাটাক, হিটস্ট্রোক ও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা বেশি হয় তাদের। অন্যদের সহায়তা প্রয়োজন হয় বয়স্ক হজযাত্রীদের। ফলে হজের পূর্ণ মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটে।
তার মতে, তরুণ বয়সে হজে যাওয়ার সুফল হচ্ছে শারীরিক সক্ষমতা। তরুণরা অনায়াসেই পায়ে হেঁটে পাড়ি দিতে পারেন মিনা, আরাফাহ ও মুজদালিফার কঠিন পথ। জীবনের শুরুর দিকে হজ করলে একজন মানুষের মধ্যে নৈতিক ও আদর্শগত পরিবর্তনের সুযোগ থাকে অনেক বছর। কোনও রোগ বা বার্ধক্যের ক্লান্তি ছাড়া হজের প্রতিটি সূক্ষ্ম বিষয় তরুণরা যতটা ভালোভাবে পালন করতে পারবেন, তা অনেক সময় সম্ভব হয় না বয়স্কদের পক্ষে।
ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম দেশ এবং তাদের হজ ব্যবস্থাপনা বিশ্বের জন্য একটি মডেল। দেশটি আমাদের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে উল্লেখ করে বিসমিল্লাহ ওভারসিজের কর্ণধার আবুল আনোয়ার বলেছেন, সেই দেশে কোনও শিশু জন্ম নেওয়ার পরই তার নামে ‘হজ সেভিং অ্যাকাউন্ট’ খোলার সংস্কৃতি রয়েছে। অল্প অল্প করে টাকা জমাতে থাকেন মা-বাবা। ফলে ২০ থেকে ২৫ বছর বয়সেই ওই তরুণের হজের জন্য জমা হয়ে যায় প্রয়োজনীয় অর্থ।

