দুঃসময়ে সরব সুসময়ে নীরব

নাসিমন ভবন, ছবি: আগামীর সময়
ব্রিটিশ আমলের লাল গোলাকার ডাকবাক্স। চিঠি আর ডাকপিয়নের যুগে ছিল রাস্তার মোড়ে মোড়ে। এমন ডাকবাক্স আদলের একটি চারতলা ভবন। শহরের ভূমিপুত্রদের বিবেচনায় কালের সাক্ষী। ভবনটি দেখলেই অনেকের মানসপটে ভেসে ওঠে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কথা। স্বৈরাচার এরশাদ পতনের আন্দোলনের অগ্নিঝরা স্মৃতি। সর্বশেষ শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেড় দশকের সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দুও ছিল এ ভবন।
সরকার আসে, সরকার যায়। দুঃসময় সুসময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নাসিমন ভবন। পুরাতন বিমান অফিস নামেও এর পরিচিত ছিল। চট্টগ্রাম নগরীর নুর আহমদ সড়কে এ ভবন। এখানেই মহানগর ও উত্তর জেলা বিএনপির কার্যালয়।
আশির দশকে নাসিমন ভবনের তৃতীয় তলায় ভাড়া বাসায় থাকতেন প্রবীণ সাংবাদিক দৈনিক আমার দেশের আবাসিক সম্পাদক জাহিদুল করিম কচি।
ভবনটির রাজনৈতিক পরিচয়ের সাক্ষী কচি বললেন, ‘জিয়াউর রহমান বিএনপি গঠনের পর তার ঘনিষ্ঠজন চট্টগ্রামের ডা. এ এফ এম ইউসুফকে অফিস নেওয়ার দায়িত্ব দেন। ভবনটা ওয়াকফ কর্তৃপক্ষের। প্রথম তলায় বাংলাদেশ বিমান, দ্বিতীয় তলায় ওয়াকফ এস্টেট বিভাগ, তৃতীয় তলায় মহিলা অধিদপ্তর ছিল।’
‘মহিলা অধিদপ্তর অফিস ছেড়ে দিলে ইউসুফ সাহেব ও ক্যাপ্টেন সাফা সেটি ভাড়া নেন বিএনপির অফিস হিসেবে। এরপর নিচতলা থেকে বিমানও চলে যায়। তখন আবদুল্লাহ আল নোমান সেটি ভাড়া নিয়ে মহানগর বিএনপির অফিস করেন। আর তৃতীয় তলায় উত্তর জেলাকে দেওয়া হয়’— বলেন জাহিদুল করিম কচি।
সেই থেকে রাজনীতির সূতিকাগার নাসিমন ভবন। গত দেড় দশক ধরে মিছিল-সমাবেশে মুখর ভবনটি বারবার পুলিশের লাঠি-গুলি, টিয়ারগ্যাসে আক্রান্ত হয়েছে। স্থানীয়রা ভবনটি সরগরম দেখেছেন সবসময়। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং গত ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের পর চিত্র বদলে গেছে।
অন্তঃত ৩০ বছর ধরে নাসিমন ভবনের মূল ফটকের বাইরে ফুটপাতে বসে পান-সিগারেট বিক্রি করছেন মনজুর। হাস্যরসে বললেন, ‘নাসিমন ভবন এখন ক্ষমতায়’।
বেচাবিক্রি বেড়েছে কি-না জানতে চাইলে চট্টগ্রামের ভাষায় বললেন, ‘হমতাত ন আছিলদ্যে এঁত্তে জমজমাট থাইইতু। পান-বিড়ি হাইতু। এহন মশা মারিরদ্যে বৈ বৈ। যার যার ধান্ধায় তে তে আছে।’ (ক্ষমতায় যখন ছিল না তখন জমজমাট থাকত। পান-বিড়ি খেত। এখন বসে বসে মশা মারছি। প্রত্যেকে নিজের ধান্ধায় ব্যস্ত।)
তবে আজ মঙ্গলবার দুপুরে নাসিমন ভবন ছিল জমজমাট। অফিসের ভেতরে নেতারা বসে আছেন। নগর বিএনপির সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান, সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর, আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আহমেদুল আলম চৌধুরী রাসেলসহ জনা ত্রিশেক নেতা বসে নিজেদের মধ্যে কথা বলছেন। মাঠেও নেতাকর্মীদের জটলা। দুপুর ২টার দিকে নেতারা বেরিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে দুটি টেলিভিশন চ্যানেলে বক্তব্য দিলেন। এরপর মিছিল নিয়ে কয়েক কদম হেঁটে গাড়ি নিয়ে যার যার মতো চলে গেলেন।
আহমেদ উল আলম চৌধুরী রাসেল জানালেন, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনটির সন্ত্রাসী অপতৎপরতার প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করতে নাসিমন ভবনে এসেছিলেন।
আলাপ এগোতেই দোকানি মনজুরের কথার সত্যতা মিলল রাসেলের ভাষ্যে। ‘১৭ বছর পর আমাদের অফিস এখন অনেক পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন। কিন্তু নিয়মিত আসা হয় না। আগে তো প্রতিদিন সকাল-বিকেল আসতাম। ৪-৫ ঘন্টা পর্যন্ত অফিসে কাটিয়েছি। এখন মাঝে মাঝে বিকেলের দিকে আসি। আগের মতো নেতাকর্মীরা আসেন না। কিছুক্ষণ থেকে চলে যায়।’
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় আগের মতো আর দলীয় কার্যালয়ে আসতে পারেন না বলেও জানালেন রাসেল। বললেন, ‘আহ্বায়ক আসতে না পারলেও সদস্য সচিব নিয়মিত আসেন। পারতপক্ষে মিস করেন না।’
নাসিমন ভবনের উত্তরপাশ একসময় জঙ্গল, ময়লা-আবর্জনায় ভরা ছিল। বখাটে, নেশাগ্রস্ত, ছিঁচকে অপরাধীদের আস্তানা হয়ে উঠেছিল। সন্ধ্যা নামলেই ভুতুড়ে অন্ধকার নেমে আসতো। সামনের মাঠ ছিল খানাখন্দে ভরা।
এখন আর আগের সেই করুণ অবস্থা নেই। সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন মাঠে বিছিয়ে দিয়েছেন কনক্রিট ব্লক। জঙ্গল সাফ করে ফেলা হয়েছে। ভবনের ভেতরে পোস্টার-ব্যানারের জঞ্জালও নেই বললেই চলে। ভবনের চারপাশ জুড়ে আলোকায়ন করা হয়েছে। প্রবেশপথের দেয়ালে আঁকা হয়েছে জুলাই গ্রাফিতি। শহীদ জিয়া, বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের প্রতিকৃতিও স্থান পাচ্ছে দেয়ালে। আর বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা লিখে দেওয়া হয়েছে সীমানা দেয়ালে।
নাসিমন ভবনের সামনেই ফুটপাতে পান-সিগারেট বিক্রি করেন এক নারী। তিনি জানালেন, নিয়মিত পুলিশ নাসিমন ভবনসহ পুরো এলাকায় টহল দেয়। এজন্য এখন মাদকাসক্ত, ভবঘুরে লোকজনের আড্ডা আর নেই।






