ঋণের সুদে দুশ্চিন্তায় সরকার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
অতিরিক্ত ঋণের বোঝায় দুশ্চিন্তায় পড়েছে সরকার। পুরনো এবং বাজেট ঘাটতি মেটানোর ঋণে তিন অর্থবছরে সুদ দিতে হবে ৪ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা, যা উন্নয়ন বাজেটের আড়াই গুণ। এর সঙ্গে যোগ হবে মূল ঋণ পরিশোধ। এটি দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক সক্ষমতা ও প্রবৃদ্ধিসহ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, আগের ঋণের অপচয়, অপব্যবহার ও দুর্নীতির কারণেই মূলত এমন পরিস্থিতি হয়েছে। শ্রীলঙ্কার মতো বড় সংকট এড়াতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
এদিকে সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি-বিবৃতিতে সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয় বলেছে, আগামী কয়েক বছরে সরকারের ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়বে। শেষ পর্যন্ত এ সুদ সামগ্রিক ব্যয়কে বাড়িয়ে দেবে। মূলত ঋণের পরিমাণ ও বৈশ্বিক অর্থবাজারে অর্থায়নের ব্যয় বৃদ্ধি, দেশীয় সুদের হার ঊর্ধ্বমুখী, টাকার অবমূল্যায়ন এবং বৈদেশিক ঋণের দায় বাড়ার প্রভাবে এই চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ এম কে মুজেরি আগামীর সময়কে বলেছেন, ঋণ নিয়ে বড় ধরনের সংকটে পড়েছিল শ্রীলঙ্কা। যদিও নীতিগত সহায়তা ও যৌক্তিক পদক্ষেপ নিয়ে দেশটি সংকট থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসছে। আমাদেরও সংকট আছে। ঋণের ফাঁদে যেন পড়তে না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এখন সতর্কতার সঙ্গে ঋণ নিতে হবে। আর সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে সঠিক নীতি, পদক্ষেপ ও যৌক্তিক সময়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। না হলে শ্রীলঙ্কার দিকেই যেতে হবে। এই অর্থনীতিবিদ মনে করেন, আগের ঋণের অর্থের দুর্নীতি, অপচয় ও অপব্যবহার হয়েছে। ঋণের সঠিক ব্যবহার হয়নি। যে কারণে আজ ঋণ বোঝা হিসেবে েদখা দিয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানাচ্ছে, আগামী (২০২৬-২৭) অর্থবছরে পরিশোধ করতে হবে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। একইভাবে ২০২৭-২৮ এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরে হিসাবে ১ লাখ ৪২ হাজার ১০০ কোটি এবং ১ লাখ ৬২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। এই তিন অর্থবছরে সুদ দিতে মোট ব্যয় হবে ৪ লাখ ৩২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। যদিও অর্থ বিভাগের পর্যবেক্ষণ বলছে, জিডিপির অনুপাতে সুদ ব্যয় ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ২ দশমিক ৫ থেকে ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ১ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে। তবে এটি মোটেই চাপ কমে যাওয়ার ইঙ্গিত নয়। বরং অর্থনীতির আকার বড় হওয়ায় অনুপাত কমলেও প্রকৃত অর্থমূল্যে সরকারের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
সরকারের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, এ মুহূর্তে সরকারের দেশি-বিদেশি মোট ঋণ হচ্ছে ২৩ লাখ ২২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। আগামী তিন অর্থবছরের মাথায় সেটি বেড়ে দাঁড়াবে ৩৩ লাখ ৭৭ হাজার ৬০০ কোটিতে। গত কয়েক বছরে মোট ঋণের অঙ্ক দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় সুদের অঙ্কও বাড়ছে বলে মনে করছে অর্থ বিভাগ। সুদ ব্যয় বৃদ্ধির পাওয়ার পেছনে আরও কয়েকটি কারণ শনাক্ত করেছে অর্থ বিভাগ। সেখানে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর মুদ্রানীতির ফলে সুদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে সুদহার বাড়িয়ে আমানতকারীদের ব্যাংকে টাকা রাখতে উৎসাহিত করা হয়। যে কারণে ব্যাংকগুলোতে উচ্চ সুদহার বিরাজ করছে। তবে সরকার যে ঋণ করছে তার বেশিরভাগ আসছে ব্যাংক খাত থেকে। এ ছাড়া ঋণ নিতে গিয়ে বড় পরিসরে ট্রেজারি বিল ও ট্রেজারি বন্ড ইস্যুর কারণে আগের চেয়ে বেশি সুদ দিতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধের অঙ্ক মোট সুদ ব্যয়ের তুলনায় কম হলেও এর বৃদ্ধির হার অনেক বেশি। অন্যতম কারণ হলো টাকার অবমূল্যায়ন। ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে গেলে একই অঙ্কের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে সরকারকে বেশি টাকা ব্যয় করতে হয়। পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থবাজারে সুদের হার এখনো তুলনামূলক বেশি থাকায় নতুন বৈদেশিক ঋণের খরচও বেড়েছে।
এ ছাড়া রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় ঋণ করতে হচ্ছে, যে কারণে সুদ ব্যয়ও বাড়ছে— এটি সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হিসেবে স্বীকার করেছে অর্থ বিভাগ। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনো আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় অনেক কম। ফলে সরকারের নিজস্ব আয় প্রত্যাশিত হারে না বাড়লে উন্নয়ন ব্যয় এবং সুদ পরিশোধ— দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠবে।
জানতে চাইলে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) বিকল্প নির্বাহী পরিচালক এবং সাবেক সিনিয়র অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ আগামীর সময়কে বলেছেন, মূল সংকট ঋণের অঙ্ক নিয়ে নয়। সমপর্যায়ের দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের ঋণের অনুপাত এখনো ঝুঁকিপূর্ণ সীমার বাইরে। আসল বিপর্যয়টি ঘটছে সরকারের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতায়। রাজস্ব ও কর আদায়ে চরম অদক্ষতার কারণে দেশে ‘কর-জিডিপির অনুপাত’ মাত্র ৬-৭ শতাংশে নেমে এসেছে, যা অন্তত ১২-১৫ শতাংশ হওয়া উচিত ছিল। সেটি হলে ভয়ের কিছুই ছিল না।




