রাজশাহীতে ঝুঁকিপূর্ণ ৭২১ ভবন

সংগৃহীত ছবি
রাজশাহী নগরীর অন্তত ৭২১টি ভবন বর্তমানে চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে— ফায়ার সার্ভিসের তথ্যটি শুধু পরিসংখ্যান নয়; বরং হাজারো মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের সতর্কবার্তাও বটে। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় নিয়ম না মেনে নির্মিত বহুতল ভবন, পর্যাপ্ত খোলা জায়গার অভাব, সংকীর্ণ প্রবেশপথ এবং অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি এসব ভবনকে সম্ভাব্য বিপর্যয়ের কেন্দ্রে পরিণত করেছে।
রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) হিসাবে জেলার ১ হাজার ২৪৫টি বহুতল ভবনের মধ্যে ৮৪৮টিই নির্মাণ করা হয়েছে প্রয়োজনীয় রাস্তার জায়গা না রেখে অথবা নির্মাণবিধি লঙ্ঘন করে। সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো মানুষের জীবন, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা।
গত দুই দশকে রাজশাহীতে জনসংখ্যা বেড়েছে, বেড়েছে আবাসন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের চাহিদা। সেই চাহিদা মেটাতে শহরের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য বহুতল ভবন। আরডিএর তথ্য অনুযায়ী, বহুতল ভবনের প্রায় ৬৮ শতাংশই প্রয়োজনীয় রাস্তার জায়গা না রেখে নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে কোনো অগ্নিকাণ্ড বা জরুরি পরিস্থিতিতে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
সম্প্রতি সরেজমিন নগরীর উপশহর, সাহেববাজার, লক্ষ্মীপুর, ভদ্রা, কাদিরগঞ্জ ও শিরোইল এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অনেক ভবন রাস্তার একেবারে গা ঘেঁষে নির্মাণ করা হয়েছে। কোথাও ভবনের চারপাশে প্রয়োজনীয় খোলা জায়গা নেই, কোথাও আবার পাশাপাশি দুটি ভবনের মধ্যকার দূরত্ব এতটাই কম যে, সূর্যের আলোও ঠিকমতো পৌঁছায় না। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, এসব অনিয়ম শুধু নগরীর সৌন্দর্য নষ্ট করছে না, বরং জননিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি তৈরি করছে।
নগরীর উপশহর নিউ মার্কেট মোড়ে নির্মিত একটি ৯ তলা ভবন বর্তমানে নিয়ম লঙ্ঘনের আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভবনটি নির্মাণ করে ফ্ল্যাট বিক্রিও সম্পন্ন করা হয়েছিল। পরে আরডিএ জানতে পারে, ভবনটি প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই নির্মাণ করা হয়েছে। এ ঘটনায় মামলা করা হয়েছে। একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে সাহেববাজার এলাকার ১২ তলা এসএস টাওয়ারের বিরুদ্ধেও।
রাজশাহী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, ‘বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মার্কেটসহ নগরীর ৭২১টি ভবন বর্তমানে চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। অনেক ভবনে অগ্নিনিরাপত্তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেই। কোথাও জরুরি নির্গমন পথ সংকুচিত, কোথাও আবার অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রপাতি অপ্রতুল। নিয়ম না মেনে ভবন নির্মাণের কারণে ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঝুঁকি শুধু অগ্নিকাণ্ডের নয়, ভূমিকম্পেরও। নির্মাণবিধি না মেনে তৈরি ভবনগুলো বড় ধরনের ভূমিকম্পে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল ওয়াকিল মনে করেন, শুধু নোটিস বা মামলা করেই দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। তিনি বললেন, ‘নিয়মবহির্ভূতভাবে নির্মিত ভবনের অবৈধ অংশ ভেঙে দিতে হবে। আরডিএকে মাঠপর্যায়ে আরও কঠোর হতে হবে এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনা জোরদার করতে হবে। অন্যথায় এই অনিয়ম কোনোভাবেই বন্ধ হবে না।’
অভিযোগ আছে, দীর্ঘদিন ধরে আরডিএর কয়েকজন কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশে নিয়মবহির্ভূত ভবন নির্মাণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে অনেক ক্ষেত্রে অনিয়মকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে আরডিএ। আরডিএর ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আব্দুল্লাহ আল তারিক জানিয়েছেন, গত পাঁচ বছরে দেড় শতাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ১৪০টি ভবনের বর্ধিত ও অবৈধ অংশ অপসারণ করা হয়েছে। নিয়ম লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরডিএর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান বলেছেন, ‘অনুমোদনহীন ভবনের মালিকদের বিরুদ্ধে নোটিস ও মামলা করার প্রক্রিয়ায় কিছুটা সময় লাগে। বর্তমানে কোনো কর্মকর্তাকে প্রভাবিত করে প্ল্যান পাস করানোর সুযোগ নেই।’
আরডিএ সূত্রে জানা গেছে, গত এক দশকে নকশাবহির্ভূত বা অবৈধভাবে ভবন নির্মাণের অভিযোগে সাড়ে ছয় হাজারের বেশি ভবন মালিককে নোটিস দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে নিয়মবহির্ভূত ভবন নির্মাণসংক্রান্ত ১৪টি মামলা বিচারাধীন।




