দাঁড়াশের মাথা ছিঁড়ে তিলানাগের ভোজ

ছবিটি তুলেছেন হবিগঞ্জের ডেন্টাল সার্জন ও বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী ডা. এসএস আল আমিন সুমন
চৈত্রের কাঠফাটা রোদ। শ্রীমঙ্গলের এক চা বাগান। হঠাৎ চা-গাছের আড়াল থেকে আকাশে উড়াল দেয় এক তিলানাগ ঈগল। তার পায়ে ঝুলছে একটি দাঁড়াশ সাপ। সাপটির মাথা নেই। তবে লেজ তখনো কাঁপছে। শোঁ শোঁ শব্দ তুলে পাখিটি গিয়ে বসে কাছের একটি ছায়াবৃক্ষে। মিনিটখানেকের মধ্যেই শেষ করে সকালের ভোজ। এরপর আবার ডানা মেলে মিলিয়ে যায় বনের গভীরে।
তিলানাগ ঈগলের শিকার ও আহারের এই বিরল দৃশ্যের সাক্ষী হন হবিগঞ্জের ডেন্টাল সার্জন ও শখের বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী ডা. এসএস আল আমিন সুমন। অন্য এক পাখির খোঁজে শ্রীমঙ্গলে গিয়েছিলেন তিনি। পথে সবুজে ঘেরা একটি চা বাগানে গাড়ি থামান। আর তখনই চোখে পড়ে তিলানাগ ঈগলের শিকার ও আহারের এই বিরল দৃশ্য। সুযোগ হাতছাড়া করেননি। ক্যামেরাবন্দি করেন কয়েকটি ছবিও।
ডা. সুমন বলেছেন, ‘তিলানাগ ঈগল সাধারণত সাপ ধরার পর প্রথমেই ঘাড়ের কাছ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এতে পাল্টা আক্রমণের ঝুঁকি থাকে না। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে তারা একটি দাঁড়াশ সাপের বিচ্ছিন্ন মাথাও দেখতে পান।’
‘যে পাখির খোঁজে গিয়েছিলাম, সেটির দেখা পাইনি; কিন্তু তিলানাগ ঈগলের এই অভিজাত সকালের আহার দেখা কম প্রাপ্তি নয়’— যোগ করলেন তিনি।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, তিলানাগ ঈগল প্রকৃতির এক দক্ষ শিকারি। এটি দীর্ঘসময় ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে পারে। উঁচু ডালে বসে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করে। শিকার চোখে পড়লেই ঝাঁপিয়ে পড়ে।
বিষধর চন্দ্রবোড়াসহ নানা ধরনের সাপ শিকার করে এরা। ফলে বনাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ কারণেই অনেক বিশেষজ্ঞ তিলানাগকে বন-প্রকৃতির নীরব প্রহরী বলে থাকেন।
মধ্যম আকৃতির এই শিকারি পাখির বৈজ্ঞানিক নাম Spilornis cheela। ভারতীয় উপমহাদেশ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও নিরক্ষীয় অঞ্চলের বিস্তীর্ণ বনভূমিতে এর বিচরণ। দেশভেদে এদের ২১টি উপপ্রজাতি রয়েছে।
তিলানাগ ঈগলের বড় মাথা, খাড়া ঝুঁটি এবং তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সহজেই নজর কাড়ে। হলুদ ঠোঁট, শক্ত আঁশযুক্ত পা এবং বিস্তৃত ডানা নিয়ে এটি বনাঞ্চলের আকাশে রাজকীয় ভঙ্গিতে উড়ে বেড়ায়। এর কর্ণভেদী ডাক অনেক দূর থেকেও শোনা যায়।
তিলানাগ মূলত সরীসৃপভুক। সাপ, গিরগিটি ও টিকটিকি এদের প্রধান খাদ্য। তবে সুযোগ পেলে পাখি, উভচর প্রাণী, ছোট স্তন্যপায়ী এমনকি মাছও শিকার করে।
তাইওয়ানে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, দিনের শুরুতে প্রায় ৯৮ শতাংশ সময় এরা ডালে বসে কাটায়। দীর্ঘসময় ধরে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করে। এরপর সুযোগ বুঝে শিকার ধরে।
একসময় দেশের বনাঞ্চলে তিলানাগ ঈগলের দেখা মিলত বেশি। এখন সেই সংখ্যা কমেছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বনভূমি ধ্বংস ও আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার প্রভাব পড়ছে এই প্রজাতির ওপর।
ডব্লিউসিএস বাংলাদেশের সাবেক সমন্বয়কারী সামিউল মোহসেনিন বলেছেন, ‘সিলেট অঞ্চলের বনগুলো দিন দিন অরক্ষিত হয়ে পড়ছে। এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়তে পারে তিলানাগ ঈগলসহ অনেক বন্যপ্রাণী।’
চা বাগানের সেই সকালের দৃশ্য তাই শুধু একটি শিকারের গল্প নয়। এটি প্রকৃতির চিরন্তন নিয়মের গল্প। এক প্রাণীর সমাপ্তি আরেক প্রাণীর বেঁচে থাকার অবলম্বন। দাঁড়াশের মাথা ছিঁড়ে তিলানাগের সেই ভোজ বনের নিঃশব্দ জীবনচক্রেরই এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।





