লাল ফিতায় বন্দি খনিজ অনুসন্ধান

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রংপুরের পীরগঞ্জে দাঁড়ালে দূরদূরান্ত পর্যন্ত চোখে পড়ে সবুজ ফসলের মাঠ। কোথাও ধানক্ষেত, কোথাও আলু কিংবা ভুট্টার আবাদ। স্থানীয়দের ধারণা, এই অঞ্চলের মাটির গভীরেই লুকিয়ে রয়েছে কয়লা, লৌহ আকরিক, চুনাপাথর ও কাঁচ বালির সম্ভাব্য ভাণ্ডার। একের পর এক জরিপ, গবেষণা ও অনুসন্ধানে সে সম্ভাবনার প্রমাণও মিলেছে বহু আগে; কিন্তু ছয় দশক পেরিয়ে গেলেও উত্তোলন শুরু হয়নি খনিজ সম্পদের। সরকারি দপ্তরে ফাইল ঘুরছে, নতুন নতুন সমীক্ষা হচ্ছে, শোনা যাচ্ছে আশার বাণীও। তবে খনির মুখ খুলছে না।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, পীরগঞ্জ উপজেলা দীর্ঘদিন ধরে কৃষিনির্ভর অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। গত কয়েক দশকে এ জনপদ দেশের খনিজ সম্পদ সম্ভাবনার আলোচনায়ও গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিয়েছে। বিশেষ করে খালাশপীরের কয়লাখনি এবং ভেলামারী এলাকার লৌহ আকরিকের সম্ভাব্য মজুদ নিয়ে সরকারি পর্যায়ে একাধিক অনুসন্ধান ও গবেষণা হয়েছে।
পীরগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে মাগুরা গ্রামসংলগ্ন খালাশপীর এলাকায় প্রথম কয়লার উপস্থিতি শনাক্ত হয় গত শতকের ষাটের দশকে। বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর (জিএসবি) ১৯৫৯-৬২ সালের মধ্যে প্রাথমিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে নির্ণয় করে খনিটির অবস্থান। পরে ১৯৮৯-৯০ সালে ২৫ বর্গকিলোমিটার এলাকায় খনন করা হয় চারটি অনুসন্ধান কূপ। এর মধ্যে তিনটিতে ২৮৪-৪৮০ মিটার গভীরতায় পাওয়া যায় উন্নতমানের বিটুমিনাস কয়লার স্তর।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, খালাশপীর কয়লাক্ষেত্রে ৮২৮ মিলিয়ন টন কয়লার মজুদ রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। সম্ভাব্য উত্তোলনযোগ্য মজুদ ধরা হয়েছে প্রায় ৬৭৫ মিলিয়ন টন। এর মধ্যে প্রায় ৪৫১ মিলিয়ন টন উন্নতমানের বিটুমিনাস কয়লা।
২০০৬ সালে খনিটির সম্ভাব্যতা ও সমীক্ষা প্রতিবেদন পাঠানো হয় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, পেট্রোবাংলা এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে। কিন্তু প্রায় দুই দশক পার হলেও উত্তোলনের বিষয়ে হয়নি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।
কয়লার পাশাপাশি পীরগঞ্জের শানেরহাট ও মিঠিপুর ইউনিয়নের ভেলামারী পাথার এলাকায় লৌহ আকরিকের সম্ভাবনাও দীর্ঘদিনের।
স্থানীয় সূত্র ও খনিজ বিভাগ জানায়, ১৯৬৫ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের খনিজ সম্পদ বিভাগ প্রথম এই অঞ্চলে লৌহ আকরিকের সম্ভাব্য উপস্থিতি শনাক্ত করে। সে সময় চারটি অনুসন্ধান কূপ খনন করে চিহ্নিত করা হয় খনিজ সম্ভাবনাময় এলাকা। পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের পর ওই অনুসন্ধান কার্যক্রম থেমে যায়। বাংলাদেশ স্বাধীনের পরও বিভিন্ন সময়ে নতুন উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও হয়নি কার্যকর অগ্রগতি। সর্বশেষ চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি ভেলামারীতে নতুন করে অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করে বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর।
অনুসন্ধান কার্যক্রম উদ্বোধনের সময় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘উত্তরাঞ্চলের মাটির নিচে থাকা সম্পদ দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে এবং সরকার এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে।’
অবশ্য জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, কয়লা উত্তোলনের ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রভাব, পুনর্বাসন পরিকল্পনা, উত্তোলন পদ্ধতি এবং বিনিয়োগ ব্যয় নিয়ে বিতর্ক রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। ফলে কয়েকবার আলোচনা হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি।
অন্যদিকে লৌহ আকরিকের ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত অনুসন্ধান ও বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শেষ হয়নি এখনো। ফলে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও প্রকল্পগুলো পাচ্ছে না বাস্তব রূপ।
জিএসবির উপমহাপরিচালক প্রকৌশলী আলী আকবর জানিয়েছেন, অতীতের বিভিন্ন অনুসন্ধান কূপ থেকে খনিজ সম্পদের উপস্থিতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। নতুন অনুসন্ধানে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের জন্য ১ হাজার ২০০ মিটার গভীর পর্যন্ত খননের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
পীরগঞ্জে মাটির নিচে থাকা খনিজ সম্পদের গল্প মূলত সম্ভাবনা আর অপেক্ষার। একদিকে কোটি কোটি টন কয়লা ও লৌহ আকরিকের তথ্য, অন্যদিকে ছয় দশক ধরে সিদ্ধান্তহীনতা। খনিগুলো চালু হলে উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন গতি আসতে পারে— এমন বিশ্বাস এখনো ধরে রেখেছেন স্থানীয় মানুষ। তবে সে সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে হলে অনুসন্ধানের গণ্ডি পেরিয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত, বিনিয়োগ এবং বাস্তবায়নের পথেই এগোতে হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।




