ভর্তি পরীক্ষা ছাড়াই আন্তর্জাতিক রুটের নাবিক!

ছবি: আগামীর সময়
ভর্তি পরীক্ষা ছাড়াই নাবিক তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল মেরিটাইম ইনস্টিটিউট (এনএমআই)। সমুদ্রগামী জাহাজে নাবিকের চাহিদা এবং বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অজুহাত দেখিয়ে ২০৫ তরুণকে প্রশিক্ষণে সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
অভিযোগ উঠেছে, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন অধিদপ্তর এবং এনএমআইর একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট বা দালাল চক্র এই প্রক্রিয়ার নেপথ্যে সক্রিয়।
সরকারি প্রজ্ঞাপন ও বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, লিখিত ভর্তি পরীক্ষা, নির্ধারিত শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং কঠোর শারীরিক পরীক্ষা ছাড়া কোনোভাবেই একজন সাধারণ নাবিকের সরকারি বা বেসরকারি মেরিটাইম প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণের সুযোগ নেই; কিন্তু এই নিয়ম না মেনে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে, ২০২৩ সালে ‘বিশেষ ব্যাচ-১’ নাম দিয়ে ১৭৭ জনকে অনিয়মের মাধ্যমে ভর্তি করানো হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে এই বিশেষ ব্যাচকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ওঠে, যার তদন্ত এখনো চলমান।
অথচ সেই তদন্ত শেষ না হতেই এবার ‘স্পেশাল ব্যাচ-২’ নামে ২০৫ জনকে নিয়োগের চেষ্টা চালাচ্ছে একই চক্র। এক্ষেত্রে আদালতের রায়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
ন্যাশনাল মেরিটাইম ইনস্টিটিউট অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম এই অনিয়মের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানালেন, ‘আওয়ামী লীগ আমলে লাখ লাখ টাকার আর্থিক লেনদেন করা হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় নতুন ব্যাচ চালুর নামে প্রতি প্রার্থীর কাছ থেকে ৬ থেকে ৮ লাখ টাকা ঘুষ আদায়ের চেষ্টা চালাচ্ছে একই চক্র। সরকার পরিবর্তন হলেও এই দালাল চক্র বহাল রয়ে গেছে।’
মেরিটাইম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরীক্ষা ছাড়া অযোগ্য ও শিক্ষাগত যোগ্যতাহীন তরুণদের টাকার বিনিময়ে সিডিসি সনদ দিলে আন্তর্জাতিক নৌ-মহলে বাংলাদেশের সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়। ভিসা নিয়ে ইউরোপ-আমেরিকায় গিয়ে আর ফেরত আসে না। এসব অদক্ষ নাবিকদের কারণে বাংলাদেশি নাবিকদের বিশ্ববাজারে নিষিদ্ধ বা 'ব্ল্যাকলিস্টেড' হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। যা দেশের রেমিট্যান্স খাতে বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে।
প্রথম বিশেষ ব্যাচে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩৩ জনেরই ন্যূনতম এসএসসি পাসের যোগ্যতা ছিল না। অথচ তাদের প্রশিক্ষণ শেষে জাহাজে চাকরির মূল যোগ্যতা সনদ সিডিসি (কন্টিনিউয়াস ডিসচার্জ সার্টিফিকেট) দেওয়া হয়েছে, যা সম্পূর্ণ অবৈধ ও আত্মঘাতী।
সেই বিশেষ ব্যাচ ভর্তির দায়িত্বে ছিলেন নৌপরিবহন অধিদপ্তরের চিফ নটিক্যাল সার্ভেয়ার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন আহমেদ। তিনি জানালেন, ‘তখন সরকারি নির্দেশে সেটি করেছিলাম। এখনকার ব্যাচের কোনো প্রক্রিয়ায় আমি সম্পৃক্ত নই। আর এ ধরনের প্রক্রিয়ায় ব্যাচ ভর্তির পক্ষে নই।’
আগের নিয়ম উপেক্ষা করে তখনকার নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ভর্তি পরীক্ষা ছাড়াই বিশেষ বিবেচনায় এই ব্যাচ প্রশিক্ষণের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। অদ্ভুত এক শর্ত হিসেবে বলা হয়েছিল, এসব শিক্ষার্থী আবাসিক হলে থাকবে না। আবার পড়ালেখার সব খরচ শিক্ষার্থী নিজেই বহন করবে।
প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছিল সরকারি ন্যাশনাল মেরিটাইম ইনস্টিটিউটে। নতুন ব্যাচও ভর্তির প্রক্রিয়া চলছে একই প্রতিষ্ঠানে। প্রথম ব্যাচ থেকে এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের প্রধানের দায়িত্বে আছেন অধ্যক্ষ আতাউর রহমান। বক্তব্য জানতে তাকে ফোনে কল এবং এসএমএস দিয়েও সাড়া মেলেনি।
তবে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর শফিউল বারি নিশ্চিত করেছেন, ‘লেনদেন না করতে সবাইকে সতর্ক করেছি। এ ব্যাপারে আমাদের জিরো টলারেন্স।’
বর্তমানে দেশে সাধারণ নাবিক প্রশিক্ষণের জন্য মোট সাতটি অনুমোদিত মেরিটাইম প্রতিষ্ঠান রয়েছে (সরকারি দুটি এবং বেসরকারি পাঁচটি)। সমন্বিত ভর্তি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতি বছর গ্রীষ্মকালীন ও শীতকালীন— এই দুই সেশনে মোট ৯০০ জন নাবিক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। প্রতি বছর এই সামান্য আসনের বিপরীতে প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার তরুণ কঠোর লড়াইয়ে নামে। যেখানে মেধাবীরা তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে সুযোগ পাচ্ছেন। সেখানে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই সুনির্দিষ্ট কোটার নামে ২০৫ জনকে ‘স্পেশাল ব্যাচ’ সুবিধা দেওয়া চরম বৈষম্যমূলক, অনৈতিক এবং মেধার অবমূল্যায়নের সামিল।
সমুদ্রগামী একটি জাহাজে মূলত দুই শ্রেণির নাবিক কাজ করেন, অফিসার এবং সাধারণ নাবিক। মেরিন একাডেমি থেকে পাস করা অফিসারদের নির্দেশনা অনুযায়ী জাহাজের ডেক, ইঞ্জিন, স্টুয়ার্ড ও কুক বিভাগে কাজ করেন এ সাধারণ নাবিকরা। আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় জাহাজ পরিচালনায় ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন এর কঠোর কনভেনশন মেনে চলতে হয়।




