বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের কোটি টাকার বিনিয়োগ ফাঁদ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মেডিক্যাল পড়ার সময়ই টিউশনি করে অল্প অল্প করে টাকা জমিয়েছিলেন। ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দেখে পরিচিত ও বিশ্বাসযোগ্য মনে হওয়ায় সেই সঞ্চয় থেকেই ‘অ্যাগ্রো নেক্সট’-এ প্রথমে ১ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। বিনিময়ে মুনাফা হিসেবে পান ১০ হাজার টাকাও। তখন আস্থা আরও বাড়ে। পরে বিনিয়োগ করেন আরও ৩ লাখ।
এখন সেই ৪ লাখ টাকাই ফেরত পাচ্ছেন না নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বর্তমানে ইন্টার্ন করা সেই তরুণ। মুনাফা বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি নিজের জমানো মূলধন ফেরত পাওয়া নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
তার মতো আরও অনেকের একই অভিযোগ। কৃষি, গরুর খামার, অ্যানিমেল মেডিসিন, দোকানসহ বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগের কথা বলে টাকা নেওয়ার পর তা ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) সহকারী প্রক্টর ও ইনস্টিটিউট অব মডার্ন ল্যাঙ্গুয়েজেসের প্রভাষক মো. শাহজালাল বাদশা রিপনের বিরুদ্ধে। ‘অ্যাগ্রো নেক্সট’সহ বিভিন্ন প্রকল্পে শতাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে প্রায় ৮ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। এর মধ্যে শুধু অ্যাগ্রো নেক্সটের বিনিয়োগকারীদেরই পাওনা প্রায় ৪ কোটি ২৯ লাখ টাকা।
তবে মো. শাহজালাল বাদশা রিপন বলছেন, তিনি কারও টাকা আত্মসাৎ করেননি। ব্যবসায়িক সংকটের কারণে টাকা ফেরত দিতে দেরি হচ্ছে। সমস্যা সমাধানে সব অংশীজনের সঙ্গে তার আলোচনা চলছে বলেও দাবি তার।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, লাভের আশ্বাস দিয়ে বিনিয়োগ নেওয়ার পর একপর্যায়ে টাকা ফেরতের সময় নানা অজুহাতে বাড়ানো হয়েছে। কেউ কেউ টাকা চাইতে গিয়ে মামলার হুমকিও পেয়েছেন। এমনকি একই গরু, দোকান ও পণ্য একাধিক বিনিয়োগকারীকে দেখিয়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
আগামীর সময়ের পক্ষ থেকে রিপনের ব্যবসায় বিনিয়োগ করা অন্তত ১০ জনের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। তাদের দেওয়া তথ্য, চুক্তিপত্র, অঙ্গীকারনামা ও অন্যান্য নথি পর্যালোচনায় এসব অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, রিপন তার ব্যাচমেট। একসময় একই হলে থাকতেন তারা। গত বছরের মার্চে গরুর ব্যবসায় সাপ্তাহিক চুক্তিতে ৪০ শতাংশ লাভ দেওয়ার কথা বলে প্রথমে দেড় লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন তিনি। পরে কোরবানির ঈদ উপলক্ষে আরও ১ লাখ টাকা দেন।
তার ভাষ্য, ঈদের এক সপ্তাহের মধ্যে মূলধন ও লাভ ফেরত দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর রিপন নানা অজুহাতে সময় নিতে থাকেন। কয়েক দফা টাকা ফেরতের তারিখ দিলেও কোনো টাকা দেননি।
তিনি বলেছেন, ‘বর্তমানে আমার আড়াই লাখ টাকা তার কাছে পাওনা। আরও কয়েকজন বিনিয়োগকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করে একই ধরনের অভিযোগ পেয়েছি। টাকা চাইলে উল্টো মামলা করার হুমকি দেওয়া হয়েছে।’
রিপনের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকা আরেক ব্যক্তির দাবি, ২০২৩ সালের আগস্টে তাদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ফেসবুক গ্রুপে ব্যবসায়িক অংশীদার খুঁজতে পোস্ট দিয়েছিলেন রিপন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো ছাত্র এবং ভবিষ্যতে শিক্ষক হতে পারেন— এমন বিবেচনায় তাকে নিরাপদ মনে হয়েছিল তার। সেই বিশ্বাস থেকেই বিনিয়োগ করেছেন তিনি।
তার অভিযোগ, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির পর ব্যবসার হিসাব দেওয়া বন্ধ করে দেন রিপন। টাকা ফেরতের জন্য একের পর এক তারিখ দিতে থাকেন। কখনো ১০ লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলে মাত্র ১ লাখ টাকা দিয়েছেন বলেও অভিযোগ তার।
একপর্যায়ে ফোন বন্ধ রাখা, মেসেজের উত্তর না দেওয়া এবং নির্ধারিত অনলাইন সভায় উপস্থিত না থাকার অভিযোগও করেন হাসান। ব্যবসা সরাসরি তদারকির জন্য রিপনের এলাকায় নিজস্ব কর্মচারী রাখতে চেয়েছিলেন তিনি। তবে এতে আপত্তি জানান রিপন। পরে খামার পরিদর্শনে গিয়ে গরুর সংখ্যা ও ব্যবসার প্রকৃত অবস্থা নিয়েও অসংগতি দেখতে পান বলে দাবি করেন তিনি। তার দাবি, একপর্যায়ে রিপন জানিয়েছেন, খামার দেখানোর জন্য সাময়িকভাবে স্থানীয় লোকজনের কিছু গরু এনে সেখানে রাখা হয়েছে।
এই অভিযোগকারী আরও বলেছেন, অ্যানিমেল মেডিসিন প্রকল্পে একই দোকান ও পণ্য একাধিক বিনিয়োগকারীর বিনিয়োগের অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে। প্রত্যন্ত এলাকার একটি দোকানে থাকা পণ্যের মূল্য ২ কোটি টাকা দাবি করা হলেও সেই পরিমাণ পণ্যের ক্রয় রসিদ বা স্টকসংক্রান্ত নথি দেখাতে পারেননি রিপন— এমন দাবি তার। এমনকি তার বিনিয়োগের অর্থে কেনা একটি গরুর ছবি অন্য একটি ব্যবসায়িক গ্রুপে ব্যবহার করে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ভুক্তভোগীদের দেওয়া নথির মধ্যে রিপনের স্বাক্ষর করা একটি অঙ্গীকারনামাও রয়েছে। এতে অ্যাগ্রো নেক্সট ও এর বিভিন্ন প্রকল্পের বিনিয়োগকারীদের ৪ কোটি ২৯ লাখ ৯১ হাজার ৪৬৫ টাকা পাওনা থাকার কথা স্বীকার করে ওই অর্থ পরিশোধের দায়িত্ব নেওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন রিপন।
অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষরের সময় বিনিয়োগকারীদের তিন প্রতিনিধি এবং অ্যাগ্রো নেক্সটের প্রতিষ্ঠাতা আবু বকর, সহ-প্রতিষ্ঠাতা রাফি মুদাব্বির ও মেজবাউর রহমান উপস্থিত ছিলেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। তারাও নথিটির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
বিনিয়োগকারীদের প্রতিনিধি ফাহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, পাওনা টাকা পরিশোধের আশ্বাস দিয়ে গত ১২ জুন ওই অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করেন রিপন। জুলাইয়ে ৩০ লাখ এবং আগস্টে ৫০ লাখ টাকা দেওয়ার কথা থাকলেও সেই প্রতিশ্রুতিও রক্ষা হয়নি।
এক বিনিয়োগকারীর দাবি, তার ৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়েও রিপনের স্বাক্ষর করা একটি স্ট্যাম্পের চুক্তি রয়েছে। এতে আগামী ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে ওই অর্থ ফেরত দেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে বলে নথিতে দেখা যায়।
তিনি জানিয়েছেন, গত ১৩ জুন আরও একজন পাওনাদারকে সঙ্গে নিয়ে লালমনিরহাটে রিপনের বাড়িতে যান তিনি। সেখানে রিপন ও তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বসে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেন। তার দাবি, ব্যবসার অর্থ অন্য খাতে ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিভিন্ন নথি পর্যালোচনা করে জমি, ফ্ল্যাট, গাড়ি, দোকান, ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন সম্পদ কেনার তথ্য পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন তিনি।
আগামীর সময়ের হাতে আসা একটি দলিলে দেখা যায়, ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে লালমনিরহাটে রিপনের মায়ের নামে ২৯ শতাংশ জমি ২৯ লাখ টাকায় রেজিস্ট্রি করা হয়েছে। তবে জমিটির প্রকৃত বাজারমূল্য এবং এর অর্থের উৎস স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
এদিকে বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পেতে এরই মধ্যে আদালতের আশ্রয় নিয়েছেন এক বিনিয়োগকারী দাবি করা এক ব্যক্তি। শাহজালাল বাদশা রিপনের বিরুদ্ধে দুটি এবং তার বাবা ও ছোট ভাইয়ের বিরুদ্ধে একটি করে চেক জালিয়াতির মামলা করেছেন তিনি।
এদিকে, আরেকটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও নতুন করে বিনিয়োগ সংগ্রহের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। ওই প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে শাহজালাল বাদশা রিপনকে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলেও তারা জানিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে শাহজালাল বাদশা রিপন আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘সারা দেশের মতো আমরাও সাময়িক অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছি। আমি লালমনিরহাট থেকে চট্টগ্রামে আসার পর একসঙ্গে কয়েকজন বিনিয়োগকারী বিনিয়োগের অর্থ উত্তোলন শুরু করায় ব্যবসা পরিচালনায় মূলধন সংকট তৈরি হয়েছে। এর ফলে সাময়িক ব্যবসায়িক বিপর্যয় থেকে এই আর্থিক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। সাড়ে তিন বছরের বেশি সময়ের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ও সংশ্লিষ্ট লেনদেনের সব দলিলপত্র সংরক্ষিত আছে, যা প্রমাণ করবে এখানে কোনো আত্মসাৎ হয়নি। এটি সাময়িক ব্যবসায়িক সংকট। এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শ ও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. হোসেন শহীদ সরওয়ার্দী আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘এটি একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। যারা বিনিয়োগ করেছেন, তারা আদালতে মামলা করতে পারেন। এরপর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নিয়ে এলে আমরা তাকে গ্রেপ্তারের অনুমতি দিতে পারি।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার হাছান মিয়াও একই কথা জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়ে পরে গ্রেপ্তার হলে তাকে বহিষ্কার করা হয়। আর আদালতে তিন বছর বা তার বেশি সাজা হলে চাকরিও থাকে না।





