আনারসের নাম জলডুবি, রসে টইটুম্বুর

রাঙামাটির নানিয়ারচরের জলডুবি আনারস— আগামীর সময়
আকারে খুব একটা বড় নয়, কিন্তু স্বাদে সারাদেশ মাতিয়ে রেখেছে রসালো আনারস ‘হানিকুইন’ বা ‘জলডুবি’। এই আনারসের রাজধানী বলা যায় রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলাকে।
ছোট্ট এই উপজেলার অন্তত পাঁচ হাজার পরিবার আনারস চাষের সঙ্গে জড়িত। মূলত নানিয়ারচরের জলবায়ু ও মাটির কারণেই এই আনারস চাষ এখানে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, আকারে ছোট, প্রায় ৫০০ গ্রাম থেকে ১২০০ গ্রাম ওজনের এই জলডুবি ভীষণ রসালো ও সুস্বাদু। এটি দ্রুত বর্ধনশীল। এসব আনারস রাঙামাটির খুচরা বাজারে ৩০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়, যা ঢাকার বাজারে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হতে দেখা যায়।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাঙামাটি জেলায় ২,৫৩৭ হেক্টর জমিতে আনারস চাষ হয়েছে, যার মধ্যে ১,৪৭০ হেক্টর জমি নানিয়ারচরে। এ বছর এর পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ১,৭২০ হেক্টর। উপজেলার বুড়িঘাট ইউনিয়নেই সবচেয়ে বেশি আনারস চাষ হয়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হারুনুর রশীদ বলেছেন, “নানিয়ারচরে প্রায় ৫ হাজার পরিবার আনারস চাষের সঙ্গে জড়িত। তবে কৃষি ঋণ না পাওয়া, ফড়িয়াদের কাছে আগাম ফসল বিক্রি করে চাষাবাদ করা, হিমাগার না থাকা এবং যোগাযোগ জটিলতার কারণে আনারসের প্রকৃত মূল্য পান না চাষিরা।”
জলডুবির পাকা আনারসে গড়ে শতকরা ১০ ভাগ চিনি ও ১ ভাগ সাইট্রিক অ্যাসিড থাকে। টাটকা আনারসে প্রোটিন জাতীয় খাদ্য পরিপাকে সহায়ক ব্রোমেলিন নামক জারক রস থাকে। কাশি ও ঠান্ডাজ্বর নিরাময়ে আনারসের সুখ্যাতি রয়েছে। এছাড়া আনারসের পাতা থেকে মোম ও সুতা তৈরি হয়।
নানিয়ারচরের মৌসুমি ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক সেলিম উদ্দিন রাফি বলেন, “রাঙামাটি জেলার প্রায় লাখো মানুষের জীবন ও জীবিকা আনারসের ওপর নির্ভরশীল। যে আনারস আগে প্রাকৃতিকভাবে বনে-বাদাড়ে জন্মাত, কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় ২০০৪ সালের পর থেকে সেটি বাণিজ্যিকভাবে চাষ শুরু হলে আনারস চাষ ও ব্যবসায় নতুন গতি আসে।”
লাভের গুড় খায় পিঁপড়া
রাঙামাটির নানিয়ারচরে আনারসের দাম আকার ও মানভেদে প্রতি পিস ৯ থেকে ১৫ টাকা। এমন দামের ১০ থেকে ১২ হাজার পিস আনারস নিয়ে একজন ব্যবসায়ী রাজধানী ঢাকা বা অন্য কোনো জেলার উদ্দেশে রওনা হলে সেখানে যুক্ত হয় গাড়ি ভাড়া, লোডিং-আনলোডিং খরচ, পথের চাঁদা ও সরকারি শুল্ক, আড়তের ব্যয়, শ্রমিক সংগঠনসহ নানা সমিতির টোকেন ব্যয়—যা আনুমানিক ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা। আবার পাহাড়ের আঞ্চলিক দলগুলোর বিভিন্ন গ্রুপও নেয় ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা। সেই হিসেবে ট্রাকপ্রতি খরচ বেড়ে যায় অন্তত ১০ হাজার টাকা।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাঙামাটির ট্রাক টার্মিনালে ৩৫০ টাকা, পৌরসভার শুল্ক ফাঁড়িতে ৩৫০, উপজেলা পরিষদের শুল্ক ফাঁড়িতে ৩৫০, জেলা পরিষদের ঘাগড়া শুল্ক ফাঁড়িতে ১০০০, চাহেরী বাজারে ১৩০০, রাউজান হাইওয়ে পুলিশকে ৩০০, রাজানীরহাট শ্রমিক সমিতিকে ১০০, ঘাগড়া শ্রমিক সমিতিকে ১০০, হাটহাজারি মালিক সমিতিকে ১০০, অক্সিজেন পুলিশকে ১০০, ফেনী হাইওয়ে পুলিশকে ৫০০, দাউদকান্দিতে ৫০০, যাত্রাবাড়ীতে ২০০ টাকা এবং কাওরান বাজার শ্রমিক সংগঠনকে ২৫০ টাকা দিতে হয়। তবুও সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে প্রতি গাড়িতে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা লাভ থাকে, তবে লোকসানও হয় মাঝে মাঝে। ফলে চাষিদের রক্ত-ঘামের আয় থেকেও ভাগ বসায় নানান পক্ষ— তাই বলা যায়, লাভের গুড় খায় পিঁপড়ায়।
নানিয়ারচরের ইসলামপুর এলাকার আনারস চাষি মো. মাছুম। গত বছর ১৫০ শতাংশ জমিতে ৫০ হাজার আনারস চারা রোপণ করলেও এ বছর প্রায় ৩৬০ শতাংশ জমিতে চাষ করেছেন ১ লাখ আনারস। মূলত উৎপাদনস্থলেই আনারস বিক্রি করে দেন এই চাষি।
তিনি জানান, আমরা বড়জোর আনারসপ্রতি ৯ থেকে ১০ টাকা পাই, এর মধ্যেই আমাদের সব ব্যয় থাকে। নিজেরা রাঙামাটি, ঢাকা বা চট্টগ্রামে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করতে পারলে হয়তো বেশি লাভ করতে পারতাম।






