বাংলার জয়যাত্রার হরমুজ পাড়ির ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা ‘সফল’

ছবি: আগামীর সময়
প্রতিদিনের মতোই রুটিন কাজ চলছিল ‘বাংলার জয়যাত্রা’ জাহাজে। হঠাৎ ফোন এলো জাহাজের নোঙর ওঠানোর। শুরু হয়ে গেল হুটহাট প্রস্তুতি। ৩১ নাবিকের সবাই যে যার মতো ব্যস্ত হয়ে পড়েন। পারস্য উপসাগর থেকে জাহাজটি হরমুজ পাড়ি দেওয়ার কমান্ডার বা নেভিগেশন অফিসারের দায়িত্ব দেয়া হয় চৌকস নাবিক প্রণয় সেনকে। ১৫ বছরের অভিজ্ঞ চট্টগ্রাম মেরিন একাডেমি ৪৭ ব্যাচের শিক্ষার্থী প্রণয় নিজেই বুঝে উঠতে পারছিলেন না চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং এই যাত্রা কীভাবে শেষ করবেন।
নাবিকরা পরিকল্পনা চূড়ান্ত করলেন। ঝুঁকি-চ্যালেঞ্জ নির্ণয় করে কৌশল ঠিক করলেন পাড়ি দেওয়ার, বণ্টন হলো দায়িত্ব। গত সোমবার সকাল ৮টায় নোঙর তোলা হলো। জাহাজটি তখন সংযুক্ত আরব-আমিরাতের হামরিয়া বন্দরের কাছে সমুদ্র এলাকায়।
প্রণয় সেন জানালেন, বেশকিছু চ্যালেঞ্জ আমাদের সামনে ছিল। হরমুজ প্রণালি বন্ধ, অনুমতির জন্য তখনো সাড়া মেলেনি ইরানি রেভ্যুলোশনারি গার্ডের (আইআরজিসি)। আবার প্রণালিতে চলছে মার্কিন যুদ্ধ জাহাজের টহল।
‘ডিজিটালি জাহাজের গতিপথ দেখার জিপিএস বন্ধ, হরমুজ প্রণালির চলাচলের পথে সাগরে মাইন পোঁতা, উপরে আছে টহল ড্রোন। সব চ্যালেঞ্জ মাথায় নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন, তখনো জাহাজের গতি মাত্র ৫ নটিক্যাল মাইল।’
জাহাজটির মালিক বাংলাদেশে শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) আর পণ্য পরিবহনের জন্য ভাড়া নিয়েছে সিঙ্গাপুরের কম্পানি দাবা প্রাইভেট লিমিটেড। জাহাজে ছিল ৩৭ হাজার টন সার। সেই সারের গন্তব্য দক্ষিণ আফ্রিকা। দুটি কোম্পানি থেকেই যাত্রা শুরুর অনুমতি দেয়া হয়। পরামর্শ আসে ইরানের কোস্টগার্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করেই সামনে এগোনোর। নির্দেশনা আসে আগে-পরে হরমুজ পাড়ি দেয়া জাহাজগুলোকে যাতে অনুসরণ করা হয়।
একই সময়ে হরমুজ পাড়ি দিচ্ছিল দীর্ঘদিন আটকে থাকা জাহাজ ‘নর্ডিক্স পোলাক্স’। সেটি সৌদি আরব থেকে জ্বালানি তেল নিয়ে বাংলাদেশে যাবে। তেল বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি)। মূলত এই জাহাজকেই অনুসরণ করতে বলেন বিএসসি ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক।
প্রণয় সেন বললেন, সাহস-ঝুঁকি নিয়ে সামনে আগাতে থাকি। তখন বেতার বার্তায় স্পষ্ট ইংরেজিতে শোনা যাচ্ছিল ‘কোনো মিলিটারি ভ্যাসেল হরমুজ পাড়ি দিলে ধ্বংস করা হবে’। জাহাজ চলতে থাকে হরমুজের ইরানি পাড় ঘেঁষে। সাগরের নিচে অসংখ্য মাইন পোঁতার খবর আগে থেকেই জানে নাবিকরা। আবার আইআরজিসি থেকে অনুমতির সাড়াও মিলেনি। ফলে কখন হুমকি আসে জাহাজ ফেরত যাওয়ার, সেটই ভীতিও কাজ করছিল। এক অনিশ্চিত দুঃসাহসিক গন্তব্যযাত্রা।
ইসলামিক রেভোলোশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) হচ্ছে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী। যুদ্ধকালীন ও যুদ্ধপরবর্তী সময়ে হরমুজ পাড়ি দিতে হলে এই বাহিনীর অনুমোদন বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশের জাহাজ যখন অত্রিকম করছে তখন সুইজারল্যান্ডে চলছিল ইরান-আমেরিকা শান্তিচুক্তি আলোচনা। সে কারণে জাহাজ চলাচলের নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করা হয়েছিল। সেই সুযোগ নিয়েই নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে বাংলার জয়যাত্রা জাহাজ।
হরমুজ পাড়ি দিতে ইরানি বাহিনী আগেই জিপিএস বন্ধ বা জ্যাম করে রেখেছিল। আবার সমুদ্রের এই মাইনের কারণে জিপিএস কাজ করছিল না, ফলে জাহাজের সঠিক পজিশন বের করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। চরম প্রতিকূলতার মধ্যে কোনো প্রযুক্তিগত সাহায্য ছাড়াই সম্পূর্ণ ‘ম্যানুয়ালি’ জাহাজ চালিয়ে বিপদসংকুল পথ পার করতে হয়েছে, যা ছিল অত্যন্ত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ।
আমেরিকা-ইরান চলমান যুদ্ধের মধ্যে মিসাইল হামলার সার্বক্ষণিক ঝুঁকি মাথায় নিয়ে জাহাজ চালানো এবং নাবিকদের মনোবল চাঙ্গা রাখাও ছিল সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। জাহাজ চলছে আবার নিজেদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে সর্বশেষ তথ্য শেয়ার করছিলেন নেভিগেশন অফিসার।
রাত ৩টা ১২ মিনিটে হরমুজের মূল প্রণালি পার হওয়ার পর ঝুঁকিমুক্ত নিশ্চিত হয়েই সৃষ্টিকতার কাছে কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। হোয়াটসঅ্যাপে তার মেসেজ ছিল ‘বাংলার জয়যাত্রা হরমুজ ক্রসড সাকসেসফুলি’। ১১৫ দিন পারস্য উপসাগরে জাহাজে আটকে পড়ার আতঙ্ক মুহূর্তেই বিলীন। খুশিতে সবাই আটখানা।
দীর্ঘ ১৫ ঘণ্টার এই যাত্রাকে প্রণয় সেন উল্লেখ করেছেন ‘সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং এবং বিপজ্জনক’ অভিজ্ঞতা হিসেবে, যেখানে প্রতি মুহূর্তে ছিল মৃত্যুর হাতছানি।
বাংলাদেশ থেকে আগেই ফোনে ফোনে বাংলার জয়যাত্রা জাহাজের গতিবিধিতে নজর রাখছিল নৌ পরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, বিএসসি ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক। কিন্তু হরমুজ পাড়ির বিষয়টি গোপন রাখার চেষ্টা করেছিল তারা। নিরাপদে পাড়ি দেয়ার পর রাত ৩টা ২০ মিনিটে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নিশ্চিত করে বিএসসি।
বিএসসি জানিয়েছে, বাংলার জয়যাত্রা জাহাজটি এখন সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দরে নোঙর করে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করেছে। গতকাল থেকে চলছে জাহাজের ক্লিনিং কাজ। ২৫ জুন দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান বন্দরের উদ্দেশে রওনা হবে। ১৭ দিন পর সেখানে পৌঁছে নামাবে সার। এরপর নাবিকরা সেখান থেকেই ফ্লাইটে দেশের উদ্দেশ্যে রওনা দিবে। অর্থ্যাৎ ২০ দিনের মধ্যে দেশে পৌঁছার কথা।





