ট্যাংক পরীক্ষা না করেই গ্যাসমুক্ত সনদ!

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
স্ক্র্যাপ হিসেবে কিনে আনা কোনো জাহাজ কাটতে শুরু করার আগে বিস্ফোরক পরিদপ্তর থেকে নিতে হয় গ্যাসমুক্ত সনদ। এটি পাওয়ার অর্থ হলো, জাহাজটিতে কোনো বিষাক্ত বা দাহ্য গ্যাসের উপস্থিতি নেই। নিয়ম অনুযায়ী, পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরই দিতে হয় এই সনদ। কিন্তু চট্টগ্রামের ফেরদৌস স্টিল শিপব্রেকিং ইয়ার্ডের জাহাজ ‘এমটি রাসি’র ক্ষেত্রে ঘটেছে তার উল্টোটা। জাহাজটির ব্যালাস্ট ট্যাংক পরীক্ষা না করেই গ্যাসমুক্ত সনদ দিয়েছিল বিস্ফোরক পরিদপ্তর। যার খেসারত দিতে গিয়ে বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড (H₂S) গ্যাসে প্রাণ গেছে ১০ জনের। গত ১৪ আগস্ট জাহাজটির তিন নম্বর ব্যালাস্ট ট্যাংক কাটার সময় ঘটে এ দুর্ঘটনা। এর কারণ খুঁজতে গঠন করা বিশেষজ্ঞ কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এলো এসব তথ্য।
তিন সদস্যের এই বিশেষজ্ঞ কমিটি গত সোমবার তাদের প্রতিবেদন শিল্প মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। ২০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার কারণ এবং ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে সুপারিশ করা হয়েছে। যেখানে উঠে এসেছে, ইয়ার্ডের নিরাপত্তা ঘাটতি এবং উদ্ধারকাজের অদক্ষতার প্রসঙ্গও। একই দিন শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এ কে এম মেনজামিন রিয়াজীর নেতৃত্বাধীন ১১ সদস্যের আরেক কমিটিও জমা দিয়েছে প্রতিবেদন।
ফেরদৌস স্টিল ইয়ার্ডে গ্যাস লিকেজের উৎস, প্রকৃতি নিরূপণ ও সম্ভাব্য ঝুঁকি নিরসনে ১৬ আগস্ট গঠন করা হয়েছিল বিশেষজ্ঞ কমিটি। যার প্রধান ছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. ইয়াসির আরাফাত খান। সদস্য ছিলেন বাংলাদেশ মেরিন একাডেমির পরিচালক মো. শোয়েব আহমেদ ও বিস্ফোরক পরিদপ্তরের সহকারী পরিদর্শক মুহাম্মদ মেহেদী ইসলাম খান।
ট্যাংক পরীক্ষা না করেই গ্যাসমুক্ত সনদ: বিশেষজ্ঞ টিমের সদস্যরা গত ১৭ ও ১৮ আগস্ট জাহাজ এবং সংলগ্ন এলাকা একাধিকবার পরিদর্শন করেন। কথা বলেন প্রত্যক্ষদর্শী, শ্রমিক ও ইয়ার্ড ব্যবস্থাপনার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে। জাহাজের বিভিন্ন ব্যালাস্ট ট্যাংক, ডিপ ট্যাংক, কফারডাম, দুর্ঘটনাস্থলের বাতাস, পানি ইত্যাদি পরীক্ষা করে গ্যাসের উৎস ও প্রকৃতি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন।
প্রতিবেদনে বিস্ফোরক পরিদপ্তর থেকে এক বছর আগে নেওয়া জাহাজটির গ্যাস ফ্রি সনদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয়। সেখানে বলা হয়, ব্যালাস্ট ট্যাংক পরীক্ষা না করেই সনদ ইস্যু করা হয়েছিল।
কমিটির প্রধান অধ্যাপক ইয়াসির আরাফাত খান আগামীর সময়কে বললেন, ‘বিস্ফোরক পরিদপ্তর সনদ দেওয়ার আগে জাহাজটির কম্পার্টমেন্টসহ অন্যান্য জায়গা পরীক্ষা করেছিল। কিন্তু তখন ব্যালাস্ট ট্যাংক পরীক্ষা হয়নি। এক বছর আগে তারা বিস্ফোরক সনদ দিয়েছে। এক বছরের মধ্যে জাহাজে অনেক কিছু হতে পারে। নতুন করে গ্যাসও জমতে পারে।’
এক বছর আগে পরিদপ্তরের গ্যাস ফ্রি সার্টিফিকেট নিয়ে গ্রিন সনদধারী প্রতিষ্ঠান ফেরদৌস স্টিল ইয়ার্ড জাহাজ এমটি রাসি কাটতে শুরু করেছিল, যা চলছিল এক বছর ধরে।
তবে এমটি রাসির ব্যালাস্ট ট্যাংকের জন্য গ্যাসমুক্ত সনদ চাওয়া হয়নি বলে দাবি কমিটির সদস্য বিস্ফোরক পরিদপ্তরের সহকারী পরিদর্শক মুহাম্মদ মেহেদী ইসলাম খানের। তিনি বলছিলেন, ‘যে জায়গায় গ্যাসের উৎস সেই ব্যালাস্ট ট্যাংকের গ্যাসমুক্ত সনদ এক বছর আগে চাওয়া হয়নি। জাহাজের অন্যান্য অংশ দেখে গ্যাস ফ্রি সনদ দেওয়া হয়েছিল। যতটুকু সনদ চাওয়া হয়, ততটুকুই দেওয়া হয়েছিল।’
যদিও গোটা জাহাজ পরীক্ষা করেই গ্যাসমুক্ত সনদ দেওয়ার কথা বিস্ফোরক পরিদপ্তরের। কোনো বিশেষ অংশের জন্য আলাদা করে এই সনদ চাওয়ার বা দেওয়ার নিয়ম নেই।
১০ মৃত্যুর কারণ: অধ্যাপক ইয়াসির আরাফাত খান জানালেন, হাইড্রোজেন সালফাইডের কারণে ঘটেছে এসব মৃত্যু। নমুনা পরীক্ষায় ট্যাংকটির আশপাশের পানিতে গ্যাসটির কিছু অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এ ছাড়া জাহাজটিতে থাকা আরও দুটি অক্ষত ব্যালাস্ট ট্যাংকেও একই গ্যাস পাওয়া গেছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে গ্যাসের উৎস এবং মৃত্যুর কারণ বর্ণনা করা হয়েছে। এতে বলা হয়, ব্যালাস্ট ট্যাংকের নিচে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা স্থির পানিতে দ্রবীভূত অবস্থায় হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস ছিল। ট্যাংকের নিচের প্লেটে ছিদ্র করে পানি নিষ্কাশনের সময় আশপাশের বায়ুতে তা ছড়িয়ে পড়ে। ফলে পানি নিষ্কাশন এলাকায় উচ্চমাত্রার গ্যাসটির কারণে বিষাক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সেখানে অবস্থানরত শ্রমিকরা স্বল্প সময়ে মাত্রাতিরিক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্রহণ করে গুরুতর বিষক্রিয়ার শিকার হন। দ্রুত অচেতন হয়ে পড়েন, যা পরে তাদের মৃত্যুর কারণ হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ব্যালাস্ট ট্যাংকের তলদেশে দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রের পানি স্থির অবস্থায় থাকলে সেখানে কাদা, জৈব পদার্থ এবং বিভিন্ন অণুজীব জমা হয়। ব্যালাস্ট ট্যাংকের স্থির পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেয়ে অক্সিজেন স্বল্পতা সৃষ্টি হয়। নমুনা পরীক্ষায় এর প্রমাণ পাওয়া গেছে।
অক্সিজেন স্বল্প পরিবেশে ট্যাংকের তলানিতে উপস্থিত অণুজীব সামুদ্রিক পানিতে বিদ্যমান সালফেটকে বিয়োজিত করার মধ্য দিয়ে সালফাইডে রূপান্তর হতে পারে। নমুনা পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, ব্যালাস্ট ট্যাংকের স্থির পানিতে যেখানে অক্সিজেনের পরিমাণ অনেক কম, সেখানে পানি কিছুটা অম্লীয় এবং সালফাইডের উপস্থিতি অনেক বেশি। উপস্থিত এ সালফাইডের একটি অংশ দ্রবীভূত বা আবদ্ধ অবস্থায় পানি ও সেডিমেন্টে জমা থাকতে পারে, যা পানি থেকে সহজে বের হয়ে নিষ্কাশন পয়েন্টের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে।
গাফিলতি ও অদক্ষ উদ্ধারকাজ: ফেরদৌস স্টিলে ট্যাংক কাটার সময় পর্যাপ্ত সরঞ্জামের ব্যবহার করা হয়নি বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। গ্যাস পরিমাপের মনিটর থাকলেও তা ব্যবহার করা হয়নি। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জামও ছিল না শ্রমিকদের। পাশাপাশি দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকাজে অদক্ষতার পরিচয় দেওয়া হয়। পেশাদার উদ্ধারকারী দলকেও সঠিক সময়ে ডাকা হয়নি।
অধ্যাপক ইয়াসির আরাফাত খান বলছিলেন, ‘ইয়ার্ডটিতে গ্যাস মনিটর ছিল। কিন্তু ট্যাংকের পানি নিষ্কাশনের সময় তা ব্যবহার করা হয়নি। পানি নিষ্কাশনের সময় যদি গ্যাসের উপস্থিতি মনিটরের মাধ্যমে ধরতে পারত, তাহলে এত বড় ক্ষয়ক্ষতি নাও হতে পারত। এ ছাড়া জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থারও ঘাটতি ছিল।’
আরও দুই ট্যাংকে বিষাক্ত গ্যাস: এমটি রাসি জাহাজটিতে মোট চারটি ব্যালাস্ট ট্যাংক ছিল। এর মধ্যে ৪ নম্বরটি আগে কাটা হয়। ৩ নম্বরটি কাটার সময় হাইড্রোজেন সালফাইড বিষক্রিয়া হয়। ১ ও ২ নম্বর ট্যাংকের মধ্যেও একই বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এই দুটি কাটার সময় বিশেষ সতর্কতা বা ডি ব্যালাস্টিং পদ্ধতি অনুসরণ করার পরামর্শ দিয়েছে তদন্ত কমিটি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যালাস্ট ট্যাংকের পানি নিষ্কাশন কাজ ঝুঁকিপূর্ণ। এ কারণে ডি-ব্যালাস্টিং পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। ডি-ব্যালাস্টিংয়ের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যালাস্ট ট্যাংকের ইতিহাস, ধারণক্ষমতা, পানির পরিমাণ ও স্থায়িত্বকাল এবং সম্ভাব্য হাইড্রোজেন সালফাইডসহ অন্যান্য গ্যাসের উপস্থিতি বিবেচনায় নিতে হবে। ট্যাংকের ওপর, মধ্য ও নিচের অংশের বাতাসে অক্সিজেন, হাইড্রোজেন সালফাইড, কার্বন মনোঅক্সাইড এবং পানির বিভিন্ন স্তরে পিএইচ, দ্রবীভূত অক্সিজেন ইত্যাদি পরীক্ষা করতে হবে।
অধ্যাপক ইয়াসির আরাফাত খান বললেন, ‘ট্যাংক থেকে পানি নিষ্কাশন পদ্ধতি সাবধানতার সঙ্গে ডি ব্যালাস্টিং পদ্ধতিতে করতে হবে। পোস্ট ভেন্টিলেশন অর্থাৎ ছোট ছিদ্র করে বাতাসে তা ধীরে ছাড়তে হবে। বাতাস ও ট্যাংকে গ্যাসের উপস্থিতি সার্বক্ষণিক পরিমাপ করার জন্য মনিটর লাগবে। জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থা থাকতে হবে। ঝুঁকি মনে হলে ওই স্থান দ্রুত ত্যাগ করতে হবে।’
ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে সুপারিশ: তদন্ত কমিটির ৯ দফা সুপারিশের মধ্যে শিপব্রেকিং ইয়ার্ডগুলোতে এ ধরনের গ্যাসযুক্ত ট্যাংক কাটার সময় কী করা দরকার, তার প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের প্রতি নির্দেশনা দেওয়া হয়। এতে করে ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলা সম্ভব হবে বলে মনে করছে তদন্ত কমিটি।
এ ছাড়া পানি নিষ্কাশনের সময় শ্রমিকদের নিরাপদ দূরত্বে থাকতে হবে। তলার প্লেটে ছোট ছিদ্র করে ডি ব্যালাস্টিং করতে হবে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে যাতে তা করা না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে সুপারিশে বলা হয়েছে। এ ছাড়া বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ব্যবহার নিশ্চিত করা, কাটার আগে এবং পানি নিষ্কাশনের সময় গ্যাস পরিমাপ করার জন্য মনিটর ব্যবহার করতে হবে। গ্যাস অ্যালার্ম ব্যবহারের সুপারিশও এসেছে। সেই সঙ্গে পরিবেশে কী পরিমাণ গ্যাস যুক্ত হয়েছে, তা দেখতে এবং জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থার আধুনিকায়নের ওপরও জোর দেওয়া হয়।





