বন্দরকে ঝুঁকিতে ফেলা সেই বিদেশি জাহাজকে জরিমানা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
চট্টগ্রাম বন্দরে স্টিয়ারিং বিকল হওয়া সেই বিদেশি জাহাজ ‘সিএনসি ইউরেনাস’ ও শিপিং এজেন্ট আমেরিকান প্রেসিডেন্ট লাইনকে (এপিএল) ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। যথাসময়ে বন্দরকে না জানিয়ে জাহাজ পরিচালনার মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেল, জাহাজ, পাইলট, বন্দর স্থাপনা এবং অন্যান্য নৌযানের নিরাপত্তা চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলার প্রমাণ পেয়ে এই জরিমানা করল বন্দর কর্তৃপক্ষ।
দেশের প্রধান চট্টগ্রাম বন্দরের সুনাম ক্ষুণ্ণ করার দায়ে জাহাজটির মাস্টার ও শিপিং এজেন্টকে এই জরিমানা করেন হারবার মাস্টার ক্যাপ্টেন জহিরুল ইসলাম। গতকাল সোমবার এ-সংক্রান্ত আদেশ শিপিং এজেন্টকে পাঠানো হয়।
গত শুক্রবার স্টিয়ারিং বিকল হওয়া জাহাজটি নিয়ে ‘এত বড় জাহাজ কেন বন্দরে’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে আগামীর সময়। সেখানেই উঠে আসে, স্টিয়ারিং গিয়ারের হাইড্রোলিক হর্ন বিকল হওয়া বিদেশি জাহাজটি কীভাবে তথ্য গোপন করে চট্টগ্রাম বন্দর জেটিতে ঢুকতে চেয়েছিল। বন্দরের পাইলটরা কীভাবে সেটি বুঝে ফেলেন এবং দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজ না ভিড়িয়ে বন্দর ভবনে ফেরতের প্রসঙ্গ। এই সংবাদ প্রকাশের পর চট্টগ্রাম বন্দর ও নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তর গঠন করে আলাদা দুটি তদন্ত কমিটি। বন্দরের তদন্ত প্রতিবেদনে তথ্য গোপন করে ঝুঁকিতে ফেলার প্রমাণ মেলে। এরপরই করা হয় এই জরিমানা।
আদেশ পাওয়ার কথা স্বীকার করে এপিএল বাংলাদেশের হেড অব অপারেশন এনামুল হক টিটু বললেন, ‘বন্দর যেটা জরিমানা করেছে, সেটা এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। আমরা জরিমানা পরিশোধের প্রস্তুতি নিচ্ছি। একই সঙ্গে এই জাহাজে ১৩শ একক রপ্তানি কনটেইনার বুকিং আছে। সেগুলো জাহাজীকরণের অনুমতিও চেয়েছি।’
চট্টগ্রাম বন্দরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের স্পেশাল অফিসার (মেরিন সেফটি) মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী জরিমানার এই উদ্যোগকে বলছেন নৌযান চলাচলে শৃঙ্খলার দৃষ্টান্ত। তার ভাষ্য, ‘এখানে থামলেই হবে না। ভবিষ্যতে এসব বিষয়ে অনেক বেশি সতর্ক থাকতে হবে। কারণ আমদানি-রপ্তানির লাইফলাইন অচল হলে এই জরিমানা কোনো কাজে আসবে না।’
সিএনসি ইউরেনাস জাহাজটি এখন চট্টগ্রাম বন্দরের জেনারেল কার্গো বার্থের (জিসিবি) ১১ নম্বর জেটিতে ভিড়ে আমদানি পণ্য নামানো শেষ করে রপ্তানি পণ্য বোঝাইয়ের অপেক্ষায় আছে। আগামীকাল বুধবার জাহাজ রপ্তানি পণ্য নিয়ে বন্দর ছাড়ার কথা রয়েছে।
নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তরের প্রধান ক্যাপ্টেন শেখ জালাল উদ্দিন গাজী বলছিলেন, ‘আগামীর সময়ের রিপোর্ট পড়ে শুক্রবার সরকারি ছুটির দিন সরেজমিনে গিয়ে ত্রুটি দেখে জাহাজ আটক (ডিটেইন) করেছিলাম। এই আটকই জাহাজের জন্য পানিশমেন্ট বা কলঙ্ক তিলক। প্রাথমিক তদন্তে হিউম্যান এরর নেভিগেশন ফেইলিউর বলে মনে হয়েছে। ফাইনাল রিপোর্ট দেবে তদন্ত কমিটি।’
তদন্ত রিপোর্ট আসার আগে জাহাজকে কেন বন্দর ছাড়ার অনুমতি দেওয়া হলো— তা জানতে চাইলে শেখ জালাল উদ্দিন গাজী বললেন, ‘তদন্ত রিপোর্টের জন্য জাহাজ আটকে থাকে না। জাহাজের কারিগরি ত্রুটি সারানোর পর আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আমাদের রিপোর্ট দিয়েছে। এরপরই রবিবার জাহাজটিকে নো অবজকেশন সনদ দিয়েছি।’
চীনের শিকো বন্দর থেকে আসা জাহাজটি গত ২ আগস্ট বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছে। পরদিন দুপুরে এনসিটিতে প্রবেশের সময় বন্দর জেটিতে ঢোকার পথে কর্ণফুলী চ্যানেলের একটু সামনে গিয়ে লাল বয়ার কাছে সেটির স্টিয়ারিং বিকল হয়ে পড়ে। এ সময় পানির তীব্র স্রোত ছিল। স্রোত সামলে এগোতে না পেরে জাহাজটি একপাশ হয়ে ভাসতে ভাসতে পেছনে যেতে থাকে। একপর্যায়ে নেভাল একাডেমির পাশের রিটেইনিং দেয়ালের কাছাকাছি চরে আটকা পড়ে।
জাহাজটি যদি মূল প্রবেশপথে আটকা পড়ত বা ডুবে যেত, তাহলে অচল হয়ে পড়ত চট্টগ্রাম বন্দর, যা দেশের অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব পড়ত। পরে ৩ আগস্ট রাতেই জাহাজটি সেখান থেকে টাগবোট দিয়ে বিশেষ ব্যবস্থায় টেনে বহির্নোঙরের ব্রাভো অ্যাংকরেজে নেওয়া হয়। ৫ আগস্ট জাহাজটি ফের জেটিতে আনতে যান বন্দরের সিনিয়র তিন পাইলট। তখন স্টিয়ারিং গিয়ারের হাইড্রোলিক হর্ন বিকল থাকার বিষয় অফিসিয়ালি জানতে পারেন পাইলটরা। এরপর জাহাজ না নিয়েই বন্দর ভবনে ফেরত আসেন তারা। পরে সিঙ্গাপুর থেকে প্রকৌশলী এনে স্টিয়ারিং গিয়ারের ত্রুটি ঠিক করে গত শনিবার জাহাজটি জেটিতে ভেড়ানো হয়।




