গাছের গায়ে যেন রংধনুর সাত রং!

দূর থেকে দেখলে মনে হবে, কেউ যেন বিশাল একটি গাছের কাণ্ডে রংতুলি দিয়ে এঁকে দিয়েছেন রংধনু
দূর থেকে দেখলে মনে হবে, কেউ যেন বিশাল একটি গাছের কাণ্ডে রংতুলি দিয়ে এঁকে দিয়েছেন রংধনু। কোথাও উজ্জ্বল সবুজ, কোথাও নীলচে, বেগুনি, কমলা, আবার কোথাও লালচে-বাদামি রঙের ছোপ। প্রকৃতির এমন রঙের খেলা দেখে প্রথমে বিশ্বাস করাই কঠিন যে, এটি কোনো শিল্পীর তৈরি নয়। গাছটির কাণ্ডে সত্যিই এমন নানা রং ফুটে ওঠে। এর নাম রেইনবো ইউক্যালিপটাস।
বৈজ্ঞানিক নাম ইউক্যালিপটাস ডেগলুপটা (Eucalyptus deglupta)। রেইনবো গাম বা মিনদানো গাম নামেও পরিচিত এই গাছের আদি নিবাস দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ। বিশেষ করে ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া ও পাপুয়া নিউগিনির গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বৃষ্টিবনে এর দেখা মেলে। ইউক্যালিপটাসের সাত শতাধিক প্রজাতির মধ্যে এটি কাণ্ডের বিচিত্র রঙের জন্য আলাদা পরিচিতি পেয়েছে।
কীভাবে কাণ্ডে ফুটে ওঠে এত রং?
গাছটির রঙিন হওয়ার পেছনে রয়েছে ছাল বা বাকল বদলে ফেলার এক বিশেষ প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। সাধারণত অনেক গাছের কাণ্ডে মোটা ও রুক্ষ ছাল দেখা যায়। কিন্তু রেইনবো ইউক্যালিপটাসের কাণ্ড তুলনামূলক মসৃণ। এর বাইরের ছাল একসঙ্গে ঝরে পড়ে না। বরং বিভিন্ন সময়ে কাণ্ডের বিভিন্ন অংশ থেকে পাতলা ছাল ফিতার মতো খুলে যায়।
ছাল ঝরে পড়ার পর ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে নতুন, উজ্জ্বল সবুজ রঙের স্তর। বাতাসের সংস্পর্শে এসে এই নতুন ছালের রং ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে। প্রথমে সবুজ রং গাঢ় হয়, এরপর নীলচে ও বেগুনি আভা দেখা দেয়। সময়ের সঙ্গে তা হলুদ, কমলা এবং লালচে-বাদামি রঙে পরিণত হয়। শেষ পর্যন্ত পুরোনো ছাল আবার ঝরে পড়ে এবং নতুন সবুজ স্তর বেরিয়ে আসে।
এই প্রক্রিয়া কাণ্ডের সব জায়গায় একই সময়ে ঘটে না। একেক অংশের ছাল একেক সময়ে ঝরে এবং বয়সের পার্থক্যে রংও আলাদা হয়। ফলে একই কাণ্ডে একসঙ্গে দেখা যায় বিভিন্ন রঙের স্তর। এভাবেই গাছটির গায়ে তৈরি হয় রংধনুর মতো বিচিত্র নকশা। এটি কোনো রং বা রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে তৈরি করা হয় না; গাছের স্বাভাবিক জীবনপ্রক্রিয়ারই অংশ।
শুধু সৌন্দর্য নয়, রয়েছে বাণিজ্যিক ব্যবহারও
রেইনবো ইউক্যালিপটাস চিরসবুজ ও দ্রুতবর্ধনশীল গাছ। অনুকূল গ্রীষ্মমণ্ডলীয় পরিবেশে এটি প্রায় ৬০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। এর পাতা লম্বাটে এবং ফুল ছোট, সাদাটে থেকে হালকা হলুদ রঙের। তবে ফুলের চেয়ে কাণ্ডের রঙিন ছালই বেশি আকর্ষণ করে মানুষকে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উদ্যান, পার্ক ও বাগানের সৌন্দর্য বাড়াতে গাছটি লাগানো হয়। একই সঙ্গে এর কাঠ কাগজ তৈরির পাল্প এবং অন্যান্য কাঠজাত পণ্য উৎপাদনেও ব্যবহৃত হয়।
প্রকৃতির এই বিস্ময়কর গাছের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, এর সৌন্দর্য কখনো একই রকম থাকে না। সময়ের সঙ্গে বদলে যায় কাণ্ডের রং, তৈরি হয় নতুন নকশা। যেন প্রকৃতি নিজেই প্রতিদিন নতুন করে রংতুলির আঁচড় দিয়ে সাজিয়ে তোলে গাছটিকে।
সূত্র: ইউনিভার্সিটি অব প্রিটোরিয়া বোটানিক্যাল গার্ডেন; সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল পার্কস বোর্ড; অস্ট্রেলিয়ান সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল রিসার্চ




