টানা ৩৩১ দিন বৃষ্টি, সত্যি সম্ভব!

প্রচুর বৃষ্টিপাতের জন্য নাম আছে হাওয়াইয়ের
বর্ষাকাল চলছে। এখন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় টানা কয়েক ঘণ্টা বৃষ্টি হলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় অভিযোগ, ‘আর কত বৃষ্টি!’ অথচ বাবা-চাচাদের মুখে শুনেছি, বাংলাদেশের অনেক এলাকায় বর্ষাকালে টানা কয়েক দিন বৃষ্টি হওয়া অস্বাভাবিক ছিল না। সন্দেহ নেই, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন বৃষ্টির ধরন বদলে যাচ্ছে। দীর্ঘ সময় ধরে মৃদু বৃষ্টির বদলে অনেক ক্ষেত্রে অল্প সময়ে ভারী বৃষ্টি হচ্ছে, আবার মাঝখানে দীর্ঘ বিরতিও দেখা যাচ্ছে।
কিন্তু পৃথিবীতে এমন একটি জায়গা আছে, যেখানে এক-দুই দিন নয়, একটানা প্রায় এক বছর প্রতিদিন বৃষ্টি হয়েছিল। শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও ঘটনাটি সত্যি। সেই বিস্ময়কর স্থানটি প্রশান্ত মহাসাগরের মাঝখানে অবস্থিত হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ।
ঘটনার শুরু ১৯৩৯ সালের ২৭ আগস্ট। যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াইয়ের মাউই দ্বীপের মানাওয়াউই গাল্চ এলাকার একটি বৃষ্টিমাপ কেন্দ্র সেদিন বৃষ্টি রেকর্ড করল। সেদিন কেউ কল্পনাও করেননি এ বৃষ্টিই ইতিহাসের অংশ হয়ে যাবে। পরদিনও বৃষ্টি হলো। তারপরের দিনও। এভাবে সপ্তাহ গড়িয়ে মাস, মাস পেরিয়ে ঋতু বদলে গেল। কিন্তু আকাশ যেন থামতেই ভুলে গেল।
অবশ্য প্রতিদিন যে প্রবল বর্ষণ হয়েছে, এমন নয়। কোনো দিন ঝিরঝিরে, কোনো দিন মাঝারি, আবার কোনো দিন কিছুটা বেশি। কিন্তু প্রতিদিনই অন্তত এতটুকু বৃষ্টি হয়েছে, যা সরকারি হিসেবে পরিমাপ করা যায়।
শুরুর দিকে কৃষকেরা খুশিই ছিলেন। পর্যাপ্ত পানিতে ফসল ভালো হবে বলে আশা করেছিলেন। কিন্তু সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অতিরিক্ত পানিতে অনেক জমিতে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। কাঁচা রাস্তা কর্দমাক্ত হয়ে যায়, চলাচলে সমস্যা দেখা দেয়। মানুষের দৈনন্দিন জীবনও বদলে যেতে থাকে। অথচ আকাশের যেন কোনো তাড়া নেই। সে নিজের ছন্দেই ঝরে চলেছে।
অবশেষে ১৯৪০ সালের ২২ জুলাই সেই বৃষ্টি থামে। হিসাব করে দেখা গেল, টানা ৩৩১ দিন প্রতিদিন অন্তত শূন্য দশমিক শূন্য এক ইঞ্চি, অর্থাৎ প্রায় শূন্য দশমিক ২৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। আবহাওয়াবিজ্ঞানে এটিকে পরিমাপযোগ্য বৃষ্টি বলা হয়। আজও এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিদিন পরিমাপযোগ্য বৃষ্টিপাতের সরকারি রেকর্ড।
তবে হাওয়াইয়ের আরও পুরোনো একটি ঘটনা বিজ্ঞানীদের আজও বিস্মিত করে। ওআহু দ্বীপের হনোমু মাউকা এলাকায় ১৯১৩ সালের আগস্ট থেকে টানা ৮৮১ দিন প্রতিদিন বৃষ্টির উপস্থিতি নথিভুক্ত হয়েছিল। তবে অধিকাংশ দিন বৃষ্টির পরিমাণ এত কম ছিল যে তা যন্ত্রে মাপার মতো ছিল না। এটিকে বলা হয় ‘বৃষ্টির চিহ্ন’—অর্থাৎ কয়েক ফোঁটা বা খুব হালকা বৃষ্টি হয়েছে, কিন্তু পরিমাপযোগ্য মাত্রায় পৌঁছায়নি।
হাওয়াইয়ে এমন ঘটনা বারবার ঘটল কেন?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে দ্বীপগুলোর ভৌগোলিক অবস্থানে। চারপাশের উষ্ণ সমুদ্র থেকে সব সময় জলীয় বাষ্পভরা বাতাস আসে। সেই বাতাস পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে ওপরে উঠে ঠান্ডা হয়ে মেঘে পরিণত হয়। এরপর বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে। আবার অনেক পাহাড় এমনভাবে অবস্থান করছে যে মেঘ সহজে সরে যেতে পারে না। ফলে দিনের পর দিন একই এলাকায় বৃষ্টি হওয়ার পরিবেশ তৈরি হয়।
এ কারণেই হাওয়াইয়ের কিছু এলাকা পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতপ্রবণ অঞ্চলের মধ্যে পড়ে। কাওয়াই দ্বীপের ওয়াইআলেয়ালে এবং মাউই দ্বীপের বিগ বগ এলাকায় এখনো বছরে কয়েক শ ইঞ্চি বৃষ্টি হয়। তবে আগের মতো দীর্ঘ সময় ধরে টানা বৃষ্টির ঘটনা এখন অনেক কম দেখা যায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখানেও স্পষ্ট। কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও দীর্ঘ খরা, আবার কোথাও দাবানলের ঝুঁকি বেড়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবী উষ্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টির স্বাভাবিক ছন্দও বদলে যাচ্ছে।
এ লেখাটি পড়ার পর বর্ষার রাতে জানালায় বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ শুনলে হাওয়াইয়ের সেই ৩৩১ দিনের কথা হয়তো আপনার মনে পড়বে। আমাদের কাছে কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিই কখনো বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অথচ পৃথিবীর এক কোণে মানুষ একসময় টানা ৩৩১ দিন প্রতিদিন বৃষ্টির সঙ্গে বসবাস করেছে।
সূত্র: গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস, ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস, ন্যাশনাল ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়








