যে আগুন নেভাতে পারে না ঝরনার পানিও

চিরন্তন শিখার ঝরনা
পৃথিবীর নানা প্রান্তে রয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাসে জ্বলা এমন আগুন, যা হাজার বছর ধরে জ্বলছে বলে ধারণা করা হয়। কোনোটি জড়িয়ে আছে প্রাচীন ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে, কোনোটি আবার প্রকৃতির অপূর্ব দৃশ্য হয়ে টানে পর্যটকদের।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের একটি বনে ঝরনার পানি ঝরে পড়ছে পাথরের গা বেয়ে। ঝরতে থাকা জলধারার ঠিক পেছনে জ্বলছে ছোট্ট একটি আগুন। বাতাস আর পানির ছিটায় শিখাটি কাঁপছে, তবু নিভে যাচ্ছে না। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, পানি আর আগুন যেন পাশাপাশি বাস করার অদ্ভুত এক কৌশল শিখে নিয়েছে।
ঝরনাটির নাম ইটারনাল ফ্লেম ফলস। বাংলায় অর্থ করলে দাঁড়ায় চিরন্তন শিখার ঝরনা। যুক্তরাষ্ট্রের চেস্টনাট রিজ কাউন্টি পার্কে এর অবস্থান। ঝরনার নিচে পাথরের খাঁজে আশ্রয় নেওয়া আগুনের শিখা আবহাওয়া ও ঋতুভেদে প্রায় ৮ থেকে ২০ সেন্টিমিটার উঁচু হয়। ঝরনার পানির আড়ালে জ্বলতে থাকা এই আগুনের দৃশ্য প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ।
তবে এটি কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়। মাটির গভীর থেকে উঠে আসা প্রাকৃতিক গ্যাসই এই আগুনের উৎস। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এমন আগুনের সন্ধান পাওয়া গেছে। কোনো কোনো আগুন হাজার বছর ধরে জ্বলছে বলে ধারণা করা হয়। প্রাচীন মানুষের ধর্মবিশ্বাস ও লোককথাতেও এসব আগুনের উপস্থিতি রয়েছে।
মাটির গভীর থেকে উঠে আসে গ্যাস
ভূতত্ত্ববিদদের ভাষায়, ইটারনাল ফ্লেমের মতো আগুন ভূগর্ভ থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস বেরিয়ে আসার একটি বিশেষ উদাহরণ। মাটির নিচে চাপের মধ্যে থাকা গ্যাস শিলার ফাটল কিংবা ছিদ্র দিয়ে ভূপৃষ্ঠে উঠে আসে। এই গ্যাসে সাধারণত মিথেন, ইথেন ও প্রোপেনের মতো দাহ্য উপাদান থাকে।
ভূগর্ভ থেকে বেরিয়ে আসা গ্যাসে মিথেনের ঘনত্ব যথেষ্ট বেশি হলে উপযুক্ত পরিবেশে তা জ্বলতে পারে। গ্যাসের সরবরাহ অব্যাহত থাকলে আগুনও দীর্ঘ সময় ধরে জ্বলতে থাকে। ইতালির ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব জিওফিজিকস অ্যান্ড ভলকানোলজির ভূতত্ত্ববিদ জিউসেপ্পে ইতিওপের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এ ধরনের আগুনকে ভূগর্ভ থেকে গ্যাস নির্গমনের একটি স্পষ্ট চিহ্ন হিসেবে দেখা যায়।
বিশ্বজুড়ে এমন আগুনের সংখ্যা খুব বেশি নয়। ইতিওপের ধারণা, পৃথিবীতে এ ধরনের আগুনের সংখ্যা ৫০টিরও কম হতে পারে। সাধারণত তেল ও গ্যাসসমৃদ্ধ ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলের আশপাশে এগুলোর দেখা মেলে। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও রোমানিয়া, ইতালি, তুরস্ক, ইরাক, আজারবাইজান, তাইওয়ান, চীন, ভারত ও অস্ট্রেলিয়ায় এমন আগুনের সন্ধান পাওয়া গেছে। কোনো কোনো আগুনের উৎপত্তি কয়েক হাজার, কয়েক দশ হাজার, এমনকি দশ লাখ বছর আগেও হয়ে থাকতে পারে।
ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞানী আর্ন্ট শিমেলম্যানের কাছে নিউইয়র্কের এই ঝরনাটি বিশেষ সুন্দর। তার ভাষায়, ঝরনার অবিরাম পানির পর্দার আড়াল থেকে আগুনের শিখা জ্বলে ওঠে। পানি আর আগুনের এই দৃশ্যই জায়গাটিকে অন্য প্রাকৃতিক স্থানের চেয়ে আলাদা করে তুলেছে।
ঝরনার পেছনে জ্বলতে থাকা ছোট্ট শিখাটি তাই শুধু প্রকৃতির অদ্ভুত সৌন্দর্য নয়। এটি মাটির গভীরে চলতে থাকা ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার চিহ্ন। মানুষ হাজার বছর ধরে এমন আগুন দেখে বিস্মিত হয়েছে, তা ঘিরে গল্প ও বিশ্বাস তৈরি করেছে। বিজ্ঞান সেই আগুনের উৎস ব্যাখ্যা করেছে। কিন্তু পানির পর্দার আড়ালে শিখাটি যখন জ্বলে ওঠে, তখন তার সামনে দাঁড়িয়ে বিস্মিত হওয়া আজও কঠিন নয়।
সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক




