কেন একটানা নেচেছিল শত শত মানুষ?

শিল্পীর তুলিতে 'ড্যান্সিং প্ল্যাগ'
সময়টা মহামারীর। গোটা ইউরোপকে বিপর্যস্ত করে রেখেছিল প্ল্যাগ। মধ্যযুগ থেকে শুরু করে রেনেসাঁ, পুরো সময় ইউরোপ একদিকে ধুঁকেছে প্ল্যাগ নিয়ে, আরেকদিকে যুদ্ধ। তেমনি সময়ে ঘটেছিল এক অদ্ভুত ঘটনা। আচমকা একদিন মানুষ নাকি নিজের শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটানা নাচতে শুরু করেছিল। থামতে পারছিল না কেউ। নাচতে নাচতে অনেকে ক্লান্তিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছিলেন, কেউ কেউ মারাও গিয়েছিলেন। ইতিহাসে এই রহস্যময় ঘটনা পরিচিত ‘ড্যান্সিং প্লেগ’ বা ‘নাচের মহামারি’ নামে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় কোরিওম্যানিয়া।
এ ধরনের ঘটনার বিবরণ সপ্তম থেকে উনিশ শতক পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাওয়া গেছে। তবে চতুর্দশ থেকে সপ্তদশ শতাব্দীতে ইউরোপে এর প্রকোপ বেশি দেখা যায়। এসব ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিতটি ঘটে ১৫১৮ সালের জুলাইয়ে, বর্তমান ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গ শহরে।
শুরুটা এক নারীকে দিয়ে, যোগ দিলেন শত শত মানুষ
১৫১৮ সালের ১৪ জুলাই। স্ট্রাসবুর্গ শহরের একটি সরু পাথুরে রাস্তায় নিজের বাড়ির সামনে হঠাৎ নাচতে শুরু করেন ফ্রাউ ট্রফিয়া নামের এক নারী। তার নাচে ছিল অস্বাভাবিক ঝাঁকুনি ও শরীর মোচড়ানোর ভঙ্গি। তিনি যেন নিজের ইচ্ছায় থামতে পারছিলেন না। সারাটা দিন নেচে ক্লান্ত হয়ে পড়ে গেলেও পরদিন আবার শুরু করেন নাচ। তার পা ফুলে উঠেছিল, এমনকি রক্তও ঝরছিল বলে বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
প্রথমে ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন মনে হলেও দ্রুত পরিস্থিতি বদলে যায়। কয়েক দিনের মধ্যে আরও কয়েক ডজন মানুষ তার সঙ্গে যোগ দেন। এক মাসের মধ্যে নাচতে থাকা মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪০০। তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন নাচতে থাকেন। কারও কারও শরীর এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে তারা মাটিতে পড়ে যাচ্ছিলেন।
তৎকালীন কিছু বিবরণে দাবি করা হয়, প্রতিদিন কয়েকজন করে নৃত্যরত মানুষের মৃত্যু হচ্ছিল। অতিরিক্ত পরিশ্রম, হৃদ্রোগ কিংবা অনাহারকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মৃত্যুর সংখ্যা ও ঘটনার সব বিবরণ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে শহর কর্তৃপক্ষও অদ্ভুত কিছু পদক্ষেপ নেয়। চিকিৎসকেরা প্রথমে ধারণা করেছিলেন, শরীরে অতিরিক্ত গরম রক্তের কারণে এমন হচ্ছে। তাদের পরামর্শ ছিল, নাচতে থাকলে শরীরের সেই উত্তাপ কমবে। এ জন্য মঞ্চ তৈরি করা হয়, আনা হয় পেশাদার নৃত্যশিল্পী ও সংগীতশিল্পীও। কিন্তু এতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে বলে কিছু বিবরণে জানা যায়।
শেষ পর্যন্ত ১৫১৮ সালের সেপ্টেম্বরে নাচতে থাকা মানুষদের সেন্ট ভিটাসের একটি উপাসনালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রার্থনা ও ধর্মীয় আচার পালনের পর তাদের সুস্থ হওয়ার কথা বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
কেন এমন হয়েছিল?
ঘটনার কয়েক শতাব্দী পরও এর নিশ্চিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। সে সময় ইউরোপের মানুষের কাছে এমন অস্বাভাবিক আচরণ ছিল অতিপ্রাকৃত শক্তির প্রভাব। কেউ মনে করতেন, কোনো সাধুর অভিশাপে মানুষ নাচতে বাধ্য হচ্ছে। কেউ আবার একে শয়তানের প্রভাব কিংবা পাপের শাস্তি বলে বিশ্বাস করতেন।
আধুনিক গবেষকেরা অবশ্য ভিন্ন ব্যাখ্যা খুঁজেছেন। একটি তত্ত্ব অনুযায়ী, ভেজা রাইশস্যে জন্মানো ‘এরগট’ নামের বিষাক্ত ছত্রাক মানুষের শরীরে প্রবেশ করে এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। এই ছত্রাকের বিষে খিঁচুনি, বিভ্রম ও অন্যান্য স্নায়বিক সমস্যা হতে পারে। তবে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ছত্রাকের বিষক্রিয়ার পরিচিত কিছু লক্ষণের প্রমাণ না থাকায় তত্ত্বটি পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য নয়।
আরেকটি ব্যাখ্যা হলো গণমনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া বা ‘মাস সাইকোজেনিক ইলনেস’। অর্থাৎ তীব্র ভয়, মানসিক চাপ ও সামাজিক অস্থিরতার মধ্যে একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে একই ধরনের শারীরিক উপসর্গ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
স্ট্রাসবুর্গের মানুষ তখন দুর্যোগের পর দুর্যোগের মুখোমুখি হচ্ছিলেন। ঘটনার আগের বছরগুলোতে দুর্ভিক্ষ, বন্যা, অস্বাভাবিক আবহাওয়া ও রোগের প্রকোপে জনজীবন বিপর্যস্ত ছিল। খাদ্যাভাব ও অপুষ্টিতে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ধর্মীয় ভয় ও সামাজিক অস্থিরতা। গবেষকদের ধারণা, এসব চাপের সম্মিলিত প্রভাবেই নাচের মহামারির মতো ঘটনা ঘটতে পারে।
তবে এটিও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। ইতিহাসবিদদের মতে, শুধু আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ঘটনাটিকে ব্যাখ্যা করতে গেলে সে সময়ের মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক বাস্তবতা ও সাংস্কৃতিক আচরণের গুরুত্ব উপেক্ষিত হতে পারে।
প্রায় পাঁচ শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও ১৫১৮ সালের সেই নাচের রহস্য পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। মানুষ কেন একসঙ্গে এমন অস্বাভাবিক আচরণ করেছিল, তা নিয়ে গবেষণা চলছে। ঘটনাটি তাই কেবল অদ্ভুত এক ঐতিহাসিক কাহিনি নয়; ভয়, বিশ্বাস, সামাজিক বিপর্যয় এবং মানুষের মনস্তত্ত্বের জটিল সম্পর্ক বোঝারও এক গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।




