হিমঝুরি

ফেসবুকে অসাধারণ ভঙ্গি আর কারিশমার পাখপাখালির ছবি তুলে চমকে দিতে জানেন অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ। একেকটা ছবি যেন আরেকটার প্রতিদ্বন্দ্বী। শুধু তাই নয়, গাছপালা অন্তঃপ্রাণ মানুষটি এক্ষেত্রেও নিয়ে গেছেন নিজেকে অনন্য উচ্চতায়।
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় মহানগরীর টিটি কলেজ থেকে নিজস্ব ক্যাম্পাসে যাওয়ার পর ১৬ বছর ধরে সবুজের যে হাতছানি আর নানান উদ্ভিদরাজি চোখে পড়ে, তার নেপথ্যের অন্যতম কারিগর নিঃসন্দেহে তিনি। একদিন না জানিয়েই অফিস সময় হওয়ার বেশ আগেই হেমন্তের সম্ভবত শেষ দিকে চলে এলাম বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। খুঁজে খুঁজে ফুলের ছবি তুলছি।
ঘড়িতে সকাল ৮টা। নিশ্চিত তিনি ক্যাম্পাসে নেই। তারপরও একটু আশা নিয়েই ফোন দিলাম। বললেন, ‘পথে আছি ভাই, কুড়ি মিনিটের মাঝে পৌঁছে যাব। কোথাও যাবেন না।
ক্যাম্পাসেই থাকুন।’
চলছিল হেমন্তকাল। আলাপনে এসে গেল হিমঝুরি। ‘চলেন আপনাকে এক জায়গায় নিয়ে যাই’— কালবিলম্ব না করে চার্জার রিকশায় চড়ামাত্রই রিকশাওয়ালা প্রায় এক টানে নিয়ে এলেন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় লাগোয়া কারমাইকেল কলেজে।
প্রিয় পাঠককে বলে রাখি, কারমাইকেল কলেজের জায়গাতেই গড়ে তোলা হয়েছে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়। মূল ফটকের কয়েক গজ না যেতেই নেমে পড়লাম তেলসুরতলায়। তেলসুর কারমাইকেল কলেজের সবচেয়ে উঁচু গাছ। হাতের ডানে বৃন্দাবন।
কী যেন খুঁজছিলেন তিনি! বললেন, ‘একদিন পাখির ছবি তুলতে এসে যেই জুম করেছি, মনে হলো কোথা থেকে গাছে এলো...!’ সেটি ছিল হিমঝুরি।
মিয়ানমারে আদিবাস। উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Millingtonia hortensis, পরিবার Bignoniaceae, ইংরেজি নাম Indian Cork Tree আর হিন্দিতে আকাশনিম।
উদ্ভিদ ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক অধ্যাপক চয়ন বিকাশ ভদ্রের ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ থেকে ২০২০ সালে প্রকাশিত ‘বাংলার শত উদ্ভিদ’ বই পাঠে জানা যায়, ‘হিমঝুরি সুউচ্চ চিরসবুজ গাছ। এই গাছের ডালপালাগুলো ছড়ানো ছিটানো, আগা নিচের দিকে নুয়ে থাকে। ডালের মাথায় অসংখ্য মঞ্জরিতে বিক্ষিপ্তভাবে ফুল ফোটে। নলাকার সাদা ফুলের মাথায় পাঁচটি ছোট পাপড়ির একেকটি ফুল শুভ্র পাপড়ির মতো। আর নিচের দিকে ফুলগুলো ঝুলে থাকে। ফুল সরু, লম্বা। এর বীজ হালকা ও পাখাযুক্ত বলে বায়ুর মাধ্যমে আশপাশে ছড়িয়ে পড়ে। মাধুর্যে, কমনীয়তায় অপূর্ব হওয়া সত্ত্বেও গাছটি ঢাকায় বেশ দুষ্প্রাপ্য। হিমের দিনে সাদা হিমের মতোই যেন ফুলগুলো ঝরে পড়ে। সৌন্দর্যমুগ্ধ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একে ডেকেছেন হিমঝুরি নামে। হিমঝুরি রাতে ফোটে এবং গন্ধ বিলায়।’
গাছ খুব একটা ছায়াঘন নয়। শিকড় অগভীর হওয়ায় ঝড়ে উপড়ে পড়ার প্রবল সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। পথতরু হিসেবে আদর্শ নয়। বীজ ছাড়াও গাছের শিকড় থেকে গজানো চারা থেকে মূলত বংশবিস্তার হয়ে থাকে। এ গাছের কাঠ নরম, হালকা, হলুদ মসৃণ এবং আসবাব ও সজ্জা কাজে উপযোগী। ইন্দোনেশিয়ায় বাকলের তেতো রস থেকে জ্বরের ওষুধ বানানোর কথা শোনা যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দোয়েল চত্বর-সংলগ্ন খেলার মাঠের বিপরীতে মোকাররম ভবনের মূল ফটকের ভেতরে বাঁ দিকে সুউচ্চ একটি হিমঝুরিগাছ চোখে পড়ে। পরিষ্কার মনে পড়ে— কোনো এক হেমন্তে নিসর্গী মোকারম হোসেনের প্রকৃতিবিষয়ক লেখা পত্রিকায় পাঠ করেই উপভোগ করেছি রুপালি সাদা রঙের গাছের নিচে ঝরে পড়ে থাকা আকাশনিম কিংবা হিমঝুরিকে।
লেখক: কৃষিবিদ ও গবেষক
ছবি: অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ



