প্রকৃতি প্রত্যয়
বর্ষার আগুনফুল উলটচণ্ডাল

উলটচণ্ডাল। ছবি : ফিরোজ মাহমুদ
রংপুর মহানগরীর ছোট নূরপুরের ‘নিভৃত নিলয়’ নামের সেই পুরনো বাড়িটির দেয়ালে দেড় দশক আগে বিমুগ্ধ চোখে প্রথম দেখেছিলাম ফুলটি। তখন স্মার্টফোন এত সহজলভ্য ছিল না, যে মুহূর্তেই ছবি তুলে পরিচয় খুঁজে নেওয়া যায়। তাই কোনো নাম জানা হয়নি, কোনো তথ্যও সংগ্রহ করা হয়নি— শুধু বিস্ময়ভরা চোখে অপলক তাকিয়ে দেখা। আগুনের শিখার মতো বাঁকানো পাপড়ি, দেয়াল বেয়ে ওঠা লতা আর রঙের অপূর্ব বদল— দেখে মনে হয়েছিল, বুঝি দূরদেশ থেকে আসা কোনো দুর্লভ ফুল ফুটেছে।
কিন্তু না, সেটি বিদেশি কোনো অতিথি নয়; বরং আমাদের এই অঞ্চলের প্রকৃতিতেই জন্ম নেওয়া এক আপন ফুল—উলটচণ্ডাল।
বর্ষা এলেই প্রকৃতির সবুজ ক্যানভাসে দু-এক মাসের জন্য নিজের অনন্য সৌন্দর্য মেলে ধরে ফুলটি। প্রথম দেখায় অনেকের মনে হতে পারে, এমন অদ্ভুত গড়নের ফুল বুঝি বিদেশি কোনো উদ্যান থেকে এসেছে। অথচ বনজঙ্গল, ঝোপঝাড় আর প্রাকৃতিক পরিবেশেই জন্মায় এই লতানো উদ্ভিদ। কন্দজ হওয়ায় একে বনজঙ্গল থেকে সহজে পুরোপুরি বিলুপ্ত করে দেওয়ার আশঙ্কাও কম; মাটির নিচে থাকা গুচ্ছমূল থেকেই অনুকূল সময়ে আবার জন্ম নেয় নতুন চারা।
উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Gloriosa superba। পরিবার Liliaceae। ইংরেজিতে এর নাম Glory lily। বাংলাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এটি পরিচিত নানা নামে— অগ্নিজিহ্বা, বহ্নিশিখা, অগ্নিমুখী, নক্তেন্দু, পুষ্পিকা, বিদ্যুৎ, স্বর্ণপুষ্প, পুষ্পসৌরভা—আরও কত নামে! বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতি ও লোকজ চিকিৎসায় ব্যবহারের কারণে একে বলা হয় বিষলাঙুলিও।
নামের সঙ্গে আগুনের সম্পর্ক যেন এর রূপেও স্পষ্ট। ফুলটি প্রথমে হলুদাভ রঙে ফোটে, সময়ের সঙ্গে বদলে যায় কমলায়, তারপর ধারণ করে উজ্জ্বল লাল আভা। যেন একটি ফুলের শরীরে ধীরে ধীরে জ্বলে ওঠে আগুনের শিখা। পাপড়িগুলো পেছনের দিকে বাঁকানো, তাই দূর থেকে দেখলে মনে হয় লতার গায়ে ছোট ছোট অগ্নিশিখা দুলছে। ফুলে তেমন কোনো গন্ধ নেই, কিন্তু রূপের মুগ্ধতায় গন্ধহীনতার অভাবটুকু যেন টেরই পাওয়া যায় না।
উলটচণ্ডাল গাছ লতানো। এর পাতার আগা আকর্ষীতে রূপান্তরিত হয়। সেই আকর্ষীর সাহায্যে আশ্রয় আঁকড়ে ধরে গাছটি ওপরে উঠে যায়। পাতা লম্বা ও বোঁটাহীন। বর্ষার ভেজা দিনে দেয়াল, বেড়া কিংবা আশপাশের গাছপালার শরীর বেয়ে যখন এই লতা ওপরে ওঠে, তখন তার ফুল প্রকৃতির নিভৃত কোণে তৈরি করে অন্যরকম এক দৃশ্য।
তবে সৌন্দর্যের আড়ালে রয়েছে গাছটির আরেক পরিচয়— এর রাসায়নিক ও ঔষধি গুরুত্ব। উলটচণ্ডালের মূল ও পাতাকে অনেক সময় বিষাক্ত বলা হলেও এর জীবাণুনাশক গুণও গুরুত্বপূর্ণ। মূল পরীক্ষায় বিভিন্ন ধরনের অ্যালকালয়েড, কোলচিসিন ও গ্লোরিসিনের উপস্থিতির কথা জানা গেছে। রয়েছে বেনজয়িক অ্যাসিড, ফাইটোস্টেরোল ও গ্লাইকোসাইড-জাতীয় উপাদান। মূলের স্টেরোল নিয়ে ভারতীয় ও মার্কিন বিজ্ঞানীরাও গবেষণা করেছেন।
লোকজ চিকিৎসায়ও গাছটির ব্যবহার দীর্ঘদিনের। গর্ভপাত ঘটানো, কৃমির উপদ্রব, কুষ্ঠরোগ, সাপ ও বিছার বিষের চিকিৎসাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর মূল ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। পাতার রস উকুন নাশেও ব্যবহৃত হয় বলে জানা যায়। তবে গাছটিতে বিষাক্ত উপাদান থাকায় চিকিৎসকের পরামর্শ ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞান ছাড়া এর কোনো অংশ ব্যবহার করা নিরাপদ নয়।
প্রকৃতির নিয়মে বর্ষা শেষে ফুলটিরও বিদায়ের সময় আসে। শরৎ এলে ধীরে ধীরে শুকিয়ে যায় লতা। শীতে গাছটি মরে গেছে বলেই মনে হয়। কিন্তু সেটি শেষ নয়; মাটির নিচে গুচ্ছমূল নীরবে অপেক্ষা করে। গ্রীষ্মের আগমনে আবার সেখান থেকে বেরিয়ে আসে নতুন চারা। তারপর বর্ষার কোনো একদিন, নিভৃত কোনো দেয়ালে বা ঝোপের ভেতর, আবার জ্বলে ওঠে সেই আগুনরঙা ফুল।
দেড় দশক আগে ছোট নূরপুরের ‘নিভৃত নিলয়’-এর দেয়ালে দেখা সেই অচেনা ফুলটির নাম আজ জানা হয়েছে— উলটচণ্ডাল। কিন্তু নাম জানার পরও প্রথম দেখার বিস্ময়টুকু কমেনি। বরং মনে হয়, আমাদের চেনা প্রকৃতির বুকেই কত অচেনা সৌন্দর্য নীরবে জন্ম নেয়, কত ফুল ফুটে আবার ঝরে যায়— আমরা শুধু কখনো থেমে তাকাই, কখনো তাকানোর সময়ও পাই না।
আর বর্ষা এলেই হয়তো কোথাও না কোথাও আবার নিভৃতে জ্বলে উঠবে উলটচণ্ডালের সেই ছোট্ট আগুনশিখা।







