আকাশে বিশাল মেঘের রোল, কীভাবে তৈরি হয় এই বিস্ময়?

দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে, আকাশে বিশাল কোনো রোলার ঘুরছে
সকালের আকাশে দিগন্তের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে দীর্ঘ মেঘের সারি। দেখতে অনেকটা বিশাল নলের মতো। কোথাও মসৃণ, কোথাও আবার ঢেউখেলানো। মেঘের এই দীর্ঘাকার গঠন বাতাসের সঙ্গে এগিয়ে চলে। দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে, আকাশে বিশাল কোনো রোলার ঘুরছে।
এটি কোনো কল্পবিজ্ঞানের দৃশ্য নয়। প্রকৃতিতেই তৈরি হয় এমন মেঘ। আবহাওয়াবিদদের কাছে এটি পরিচিত ‘রোল ক্লাউড’ বা গড়ানো মেঘ নামে। এর সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ ‘মর্নিং গ্লোরি’, যা অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড অঞ্চলে কার্পেনটারিয়া উপসাগরের আশপাশে দেখা যায়। নাসার তথ্য অনুযায়ী, বিশেষ পরিস্থিতিতে এই মেঘের বিস্তার প্রায় এক হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে।
কীভাবে তৈরি হয় আকাশের এই বিশাল রোল?
মেঘের এই অদ্ভুত আকৃতির পেছনে রয়েছে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও বাতাসের চলাচলের জটিল খেলা। সাধারণত মাটির কাছাকাছি উষ্ণ বাতাস ওপরে উঠে ঠান্ডা হলে তার জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে মেঘ তৈরি করে। কিন্তু মর্নিং গ্লোরির ক্ষেত্রে বাতাসের ঢেউয়ের মতো চলাচলও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কার্পেনটারিয়া উপসাগরের আশপাশে স্থলভাগ ও সমুদ্র থেকে আসা বাতাসের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া ঘটে। রাতের পর ভোরে তাপমাত্রার পার্থক্য এবং বিপরীত দিক থেকে আসা সমুদ্রবায়ুর প্রভাবে বায়ুমণ্ডলে একধরনের তরঙ্গ তৈরি হতে পারে। এই তরঙ্গের সঙ্গে বাতাস ওঠানামা করে। বাতাসের কোনো অংশ ওপরে উঠে ঠান্ডা হলে সেখানে মেঘ তৈরি হয়; আবার নিচে নামলে মেঘের জলকণা বাষ্পীভূত হয়ে যেতে পারে। এভাবে দীর্ঘ নলাকার মেঘের আকৃতি গড়ে ওঠে।
এই মেঘের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, এটি দেখতে ঘূর্ণায়মান মনে হলেও কোনো শক্ত বস্তু বা বিশাল নলের মতো আকাশে গড়িয়ে চলে না। বরং মেঘের সামনের দিকে জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে নতুন মেঘ তৈরি হয়, আর পেছনের দিকে মেঘ মিলিয়ে যেতে থাকে। বাতাসের এই চলাচলই তৈরি করে গড়িয়ে যাওয়ার দৃশ্য।
কোথায় দেখা যায় এই বিরল মেঘ?
অস্ট্রেলিয়ার উত্তরাঞ্চলে, বিশেষ করে কুইন্সল্যান্ডের বার্কটাউনের আশপাশে, বসন্তকালে মর্নিং গ্লোরি দেখার সম্ভাবনা বেশি। স্থানীয় আবহাওয়ার বিশেষ পরিস্থিতিতে একটির পর একটি মেঘের রোলও তৈরি হতে পারে। কখনো এগুলো দিগন্তজোড়া দীর্ঘ সারি তৈরি করে এগিয়ে যায়। এই দৃশ্য দেখতে আকাশপ্রেমী, আলোকচিত্রী ও আবহাওয়াবিদেরা ওই অঞ্চলে আগ্রহ দেখান।
তবে সব রোল ক্লাউডের জন্ম একইভাবে হয় না। বজ্রঝড়ের সামনের দিকে ঠান্ডা বাতাস দ্রুত ভূমির দিকে নেমে ছড়িয়ে পড়লে তা আশপাশের উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাসকে ওপরে ঠেলে দিতে পারে। সেই বাতাস ঠান্ডা হয়ে ঘনীভূত হলে তৈরি হয় দীর্ঘ, তাকের মতো মেঘ- যাকে বলা হয় ‘শেলফ ক্লাউড’। এটি দেখতে রোল ক্লাউডের মতো হলেও সাধারণত ঝড়ের মেঘের সঙ্গে যুক্ত থাকে।
মেঘের এই সৌন্দর্যের পাশাপাশি রয়েছে কিছু ঝুঁকিও। মর্নিং গ্লোরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বায়ুপ্রবাহে কখনো শক্তিশালী দমকা হাওয়া ও বায়ুমণ্ডলীয় অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে উড়োজাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে এ ধরনের পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। তাই দৃশ্যটি যতই মনোমুগ্ধকর হোক, আবহাওয়ার অবস্থা সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।
তথ্যসূত্র: নাসা সায়েন্স, বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার ইন্টারন্যাশনাল ক্লাউড অ্যাটলাস, লুডভিগ ম্যাক্সিমিলিয়ান ইউনিভার্সিটি অব মিউনিখ, রয়্যাল সোসাইটি




