নেশায় বুঁদ হয় হাতি, হরিণ এমনকি পাখিও

সংগৃহীত ছবি
ফ্রান্সের গ্রামীণ অঞ্চলের একটি ফাঁকা মাঠ। সেখানেই একটি হরিণকে দেখা গেল অদ্ভুতভাবে গোল হয়ে ঘুরতে। কখনও দ্রুত, কখনও টলোমলো ভঙ্গিতে। একপর্যায়ে ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে ধপাস করে লুটিয়ে পড়ে প্রাণীটি। হরিণটির এই অদ্ভুত আচরণের পেছনে আসলে কী ছিল? এটি কি কোনো আঘাত নাকি অন্য কিছু? ভিডিওটি স্থানীয় পুলিশের হাতে পৌঁছানোর পর তাদের প্রথম সন্দেহ ছিল, হরিণটি হয়তো নেশাগ্রস্ত ছিল।
সম্প্রতি ফ্রান্সের সোন এ লোয়ার অঞ্চলের জেন্ডারমেরি স্থানীয়দের সতর্ক করে জানিয়েছে, গাড়ি চালানোর সময় বন্যপ্রাণীদের অস্বাভাবিক আচরণের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ গাঁজন হওয়া ফল বা নির্দিষ্ট কিছু উদ্ভিদ খেয়ে বন্যপ্রাণীরা অনেক সময় অপ্রকৃতিস্থ আচরণ করে রাস্তার সামনে চলে আসতে পারে।
হরিণটির এই আচরণের প্রকৃত কারণ নেশা নাকি কোনো রোগ বা স্নায়বিক সমস্যা তা নিশ্চিতভাবে জানা না গেলেও প্রাণিজগতে মদ্যপ বা নেশাগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা মোটেও বিরল নয়। প্রকৃতিতে পপি ফুল থেকে শুরু করে হ্যালুসিনোজেনিক মাশরুম কিংবা গেঁজিয়ে যাওয়া আঙুর খেয়ে অনেক প্রাণীই নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রাণীরা ভুলবশত এগুলো খেয়ে ফেললেও গবেষকদের ধারণা, শিম্পাঞ্জিরা মাঝেমধ্যে ইচ্ছা করেই এমন কিছু উপাদান খুঁজে নিয়ে খায় যা মানুষের দৈনিক দুই পেগ অ্যালকোহল পানের সমান। হাতি থেকে শুরু করে রেইনডিয়ার পর্যন্ত এমন অনেক প্রাণীর উদাহরণ রয়েছে যারা প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানে মাতাল হয়ে ওঠে।
বেরি খেয়ে মাতাল
সিডার ওয়াক্সউইং পাখি তাদের আকর্ষণীয় পালক, মাথার বড় ঝুঁটি এবং চোখের চারপাশের কালো অংশের জন্য বেশ পরিচিত। উত্তর আমেরিকার এই পাখিটির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এরা একটানা কয়েক মাস কেবল ফল খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে। ফল তাদের শক্তির দারুণ উৎস হলেও অতিরিক্ত পেকে যাওয়া ফল বা বেরি এই পাখিদের জন্য এক অদৃশ্য বিপদ ডেকে আনে। পাকা ফলে প্রাকৃতিকভাবে ইস্ট তৈরি হয় যা ফলটিকে গেঁজিয়ে তোলে। এই প্রক্রিয়ায় ফলের ভেতরের শর্করা বা সুগার মলিকিউল ইথানল ও কার্বন ডাই অক্সাইডে রূপান্তরিত হয়। ফলটি যদি পুরোপুরি পচে না যায় তবে তা পাখিদের খাওয়ার উপযোগী থাকে, কিন্তু এটি খাওয়ার ফলে পাখিরা মাতাল হয়ে পড়তে পারে।
ঠিক মানুষের মতোই নেশাগ্রস্ত ওয়াক্সউইং পাখিদের প্রতিক্রিয়া ধীর হয়ে যায় এবং তারা সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এর ফলে শিকারি প্রাণীর আক্রমণ, চলন্ত যানবাহন কিংবা জানালার কাঁচের সাথে ধাক্কা খেয়ে এদের প্রাণ হারানোর ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
টেক্সাস পার্কস অ্যান্ড ওয়াইল্ডলাইফ ডিপার্টমেন্টের বন্যপ্রাণী চিকিৎসক সারা উইকফ জানান, অ্যালকোহল হলো একটি নিউরোডিপ্রেসেন্ট যা প্রাণীদের স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্ষমতা এবং দ্রুত সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। একজন মানুষ মাতাল হলে যা যা ঘটে, প্রাণীদের ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনটাই ঘটে থাকে।
পোল্যান্ডের পোজনান ইউনিভার্সিটি অব লাইফ সায়েন্সেসের প্রাণীবিজ্ঞানী পিওত্র ট্রিজানোভস্কির নেতৃত্বে ২০২০ সালে একটি গবেষণা চালানো হয়। সেখানে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ এবং ইউটিউব ভিডিও বিশ্লেষণ করে ৫৫ প্রজাতির পাখির মদ্যপানের প্রমাণ পাওয়া যায়। এর মধ্যে কিছু আধা বন্য এবং গৃহপালিত পাখিও ছিল। অনেক ভিডিওতে দেখা গেছে যে তোতাপাখি এবং কাকের মতো বুদ্ধিমান পাখিরা মানুষের রাখা পানীয় থেকে চুমুক দিচ্ছে। ট্রিজানোভস্কির মতে, মানুষ যেভাবে আড্ডা দিতে বা আনন্দ করতে বারে যায়, পাখিরাও সম্ভবত একই কারণে এটি করে থাকে।
হাতির মারুলা ফলের নেশা
আফ্রিকান হাতিরা মারুলা গাছের গেঁজিয়ে যাওয়া ফল খেয়ে মাতাল হয়ে পড়ে, এমন গল্প সাধারণ মানুষের মুখে যেমন শোনা যায় তেমনি বৈজ্ঞানিক গবেষণাতেও এর উল্লেখ আছে। তবে কিছু বিজ্ঞানী এই দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের যুক্তি ছিল, হাতির বিশাল শরীর এবং ওজনের তুলনায় মাতাল হতে যে পরিমাণ অ্যালকোহল প্রয়োজন, তা এই ফল খেয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।
কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারির তৎকালীন গবেষক ম্যারেক জানিয়াক বিভিন্ন প্রজাতির অ্যালকোহল হজম বা মেটাবলাইজ করার ক্ষমতা নিয়ে পড়াশোনা করেন। ২০২০ সালে বায়োলজি লেটার্স সাময়িকীতে প্রকাশিত তার গবেষণা থেকে জানা যায় যে বিভিন্ন প্রাণীর শরীরে অ্যালকোহল ডিহাইড্রোজেনেজ নামক এনজাইম প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষমতা জিনগতভাবে ভিন্ন হয়। এই এনজাইমটিই মূলত ইথানল ভেঙে ফেলতে সাহায্য করে।
মানুষ অ্যালকোহল পানে অভ্যস্ত হওয়ায় মানুষের শরীর খুব দ্রুত এবং দক্ষতার সাথে ইথানল ভেঙে ফেলতে পারে। ফলে ঘোড়া, গরু বা শূকরের তুলনায় মানুষের মাতাল হতে বেশি অ্যালকোহল লাগে। জানিয়াক দেখেন যে, ফলমূল খাওয়া অনেক প্রাণী খুব সহজেই ইথানল বিষমুক্ত করতে পারে, কারণ প্রাকৃতিকভাবেই পাকা ফলে ইথানল থাকে।
তবে আফ্রিকান হাতির ক্ষেত্রে একটি জিনগত পরিবর্তন দেখা যায়, যার কারণে তাদের শরীর অ্যালকোহল ডিহাইড্রোজেনেজ এনজাইমটি সহজে মেটাবলাইজ করতে পারে না। এর অর্থ হলো, বিশাল আকৃতির এই প্রাণীরা খুব সামান্য মারুলা ফল খেয়েই মাতাল হতে পারে। তবে জানিয়াক মনে করেন, হাতিরা আনন্দের জন্য নয় বরং ক্ষুধার্ত হওয়ার কারণেই এই ফল খাচ্ছে। কারণ যেখানে শর্করা থাকে সেখানেই ইথানল তৈরি হয় এবং শর্করা মানেই শক্তি। এই ইথানল হজম করার ক্ষমতার কারণে হাতিরা এমন ফলও খেতে পারে যা নষ্ট বা পচে গেছে।
বল্গা হরিণের মাশরুম প্রীতি
সাইবেরিয়ার রেইনডিয়ার বা উত্তর আমেরিকার ক্যারিবু পাখিরা আমানিতা মুসকারিয়া নামের এক ধরনের হ্যালুসিনোজেনিক মাশরুমের সাথে একই পরিবেশে বাস করে। লাল রঙের টুপি এবং সাদা ফোঁটাযুক্ত এই মাশরুমটিকে ক্রিসমাস মাশরুমও বলা হয়। সাইবেরিয়ার ওঝা বা শামানরা প্রাচীনকাল থেকেই একে নেশা এবং হ্যালুসিনেশনের জন্য ব্যবহার করে আসছেন।
জীববিজ্ঞানীরা দেখেছেন যে রেইনডিয়াররা এই বিষাক্ত কিন্তু পুষ্টিকর মাশরুমটি বেশ আগ্রহ নিয়ে খায়। তাদের জটিল পাকস্থলী এই মাশরুমের ভেতরের বিষাক্ত উপাদান অনায়াসে নিষ্ক্রিয় করে ফেলতে পারে। তবে এই মাশরুম খাওয়ার ফলে মানুষের মতো রেইনডিয়ারদেরও বমি বমি ভাব, বমি বা মাথা ঘোরার মতো সমস্যা হয় কিনা তা এখনো পরিষ্কার নয়।
ট্রি শ্রু ও অ্যালকোহলযুক্ত মধু
থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া এবং বোর্নিও দ্বীপে সাত প্রজাতির ট্রি শ্রু বা কাঠবিড়ালির মতো দেখতে প্রাণী বাস করে। এদের প্রধান খাবার হলো বার্টাম পাম গাছের মধু। এই গাছের ফুল থেকে নিঃসৃত মধু খুব দ্রুত গেঁজিয়ে ওঠে এবং তাতে তিন শতাংশেরও বেশি অ্যালকোহল তৈরি হয়।
সিডার ওয়াক্সউইং পাখিদের মতো ট্রি শ্রুদের ক্ষেত্রে এই অ্যালকোহল কোনো ক্ষতি করে না। ২০০৮ সালের একটি গবেষণা অনুযায়ী, নিয়মিত এই উচ্চ মাত্রার অ্যালকোহলযুক্ত মধু খাওয়ার পরও তাদের শরীরে মাতলামির কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। ২০২০ সালে গবেষকরা আরও জানতে পারেন যে বার্টাম পামের পরাগায়ন ঘটানো অন্যান্য প্রাণী যেমন কাঠবিড়ালি ও ইঁদুর জাতীয় প্রাণীরাও এই উচ্চ মাত্রার অ্যালকোহল হজম করতে পুরোপুরি অভ্যস্ত।
বন্যপ্রাণীরা আনন্দের জন্য এসব খাবার খাচ্ছে নাকি পুষ্টির জন্য, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে বিজ্ঞানী ট্রিজানোভস্কি বিশ্বাস করেন যে প্রাণীদের কাছে এই খাবারগুলোর পুষ্টিগুণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই গেঁজিয়ে যাওয়া খাবারগুলো থেকে তারা অ্যালকোহলের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় শর্করা এবং ভিটামিনও পেয়ে থাকে, যা তাদের বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক


