ক্যারিবীয় সাগরের রঙিন দ্বীপ কুরাসাওয়ের অজানা গল্প

ক্যারিবীয় সাগরের রঙিন এক দ্বীপ কুরাসাও
বিশ্বকাপ ফুটবলে জার্মানি-কুরাসাও খেলা চলছে। ম্যাচের তখন ২৩ মিনিট। গ্যালারির এক কোণে নীল-হলুদ পতাকা উড়ছে। সংখ্যায় তারা খুব বেশি নয়। কারণ তাদের দেশটিই তো ছোট। লিভানো কোমেনেন্সিয়া বল জালে জড়াতেই উল্লাসে ফেটে পড়লেন সেই মানুষগুলো।
বিশ্বকাপে কুরাসাওয়ের প্রথম গোল। প্রতিপক্ষ চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি। গতকাল ১৪ জুনের ম্যাচটিতে শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি ৭-১ গোলে হেরেছে কুরাসাও। কিন্তু সেটিই ছিল বিশ্বকাপে কুরাসাও নামের ছোট্ট দ্বীপদেশটির প্রথম গোল। আজ বিশ্বকাপের কারণে অনেকের মুখে নতুন একটি নাম, কুরাসাও। দেশটি কোথায়? স্বাধীন কি না? কীভাবে বিশ্বকাপে এল? আর এত ছোট একটি দেশ ফুটবলে এতদূর পৌঁছাল কীভাবে? সবগুলো প্রশ্নের উত্তরই দিচ্ছি একে একে।
ক্যারিবীয় সাগরের রঙিন এক দ্বীপ কুরাসাও। দক্ষিণ আমেরিকার ভেনেজুয়েলার উপকূল থেকে খুব বেশি দূরে নয়। আয়তন মাত্র ৪৪৪ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার। পৃথিবীর বহু শহরের জনসংখ্যা কুরাসাওয়ের পুরো দেশের চেয়েও বেশি। আমাদের মিরপুর-মোহাম্মদপুরের জনসংখ্যা এই দেশটির অন্তত কয়েক গুণ।
এটি পুরোপুরি স্বাধীন রাষ্ট্র নয়। কুরাসাও হলো কিংডম অব নেদারল্যান্ডস-এর অন্তর্ভুক্ত একটি স্বশাসিত অঞ্চল। অর্থাৎ নেদারল্যান্ডসের অংশ হলেও নিজেদের সংসদ, সরকার ও প্রশাসন রয়েছে। প্রতিরক্ষা ও কিছু বৈদেশিক বিষয় নেদারল্যান্ডসের অধীনে থাকে। বিষয়টি অনেকটা এমন যে রাজনৈতিকভাবে তারা নেদারল্যান্ডসের অংশ, কিন্তু ফুটবলে তারা সম্পূর্ণ আলাদা পরিচয়ে খেলে।
কুরাসাওয়ের নিজস্ব জাতীয় দল আছে, নিজস্ব ফুটবল ফেডারেশন আছে, আর তারা ফিফা ও কনকাকাফের সদস্য। তাই বিশ্বকাপে কুরাসাও খেলছে, নেদারল্যান্ডসও। আগে ছিল অন্য পরিচয় একসময় কুরাসাও ছিল নেদারল্যান্ডস অ্যান্টিলিস নামে পরিচিত একটি দ্বীপগোষ্ঠীর অংশ। ২০১০ সালে সেই রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে গেলে কুরাসাও আলাদা স্বশাসিত দেশের মর্যাদা পায়। ফুটবল দলটিও তখন নতুনভাবে যাত্রা শুরু করে। আজ যে দলটি বিশ্বকাপে খেলছে, তাদের বয়স আসলে খুব বেশি নয়। মাত্র দেড় দশকের মধ্যে তারা বিশ্বকাপে উঠে এসেছে।
এর আগে সবচেয়ে কম জনসংখ্যার দেশ হিসেবে আলোচনায় ছিল আইসল্যান্ড। কিন্তু কুরাসাও সেই রেকর্ডও ভেঙে দিয়েছে। প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষের এই দ্বীপ এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে ওঠা সবচেয়ে কম জনসংখ্যার দেশ। বাংলাদেশের একটি মাঝারি উপজেলার জনসংখ্যাও এর চেয়ে বেশি হয়।
ফুটবলে তাদের শক্তি কোথায়? কুরাসাওয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের প্রবাসী ফুটবলাররা। দলটির অনেক খেলোয়াড়ের জন্ম নেদারল্যান্ডসে। তাদের পরিবার বা পূর্বপুরুষ কুরাসাও থেকে গিয়েছিলেন ইউরোপে। পরে সেই সন্তানরা কুরাসাওয়ের হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে ছোট্ট একটি দ্বীপ হলেও তারা ইউরোপীয় প্রশিক্ষণ পাওয়া খেলোয়াড়দের সুবিধা পায়। এই কারণেই গত কয়েক বছরে দলটির মান দ্রুত বেড়েছে। বিশ্বকাপ দলে লিয়ান্দ্রো বাকুনা, জুনিনিয়ো বাকুনা, তাহিথ চোংয়ের মতো পরিচিত নাম রয়েছে।
বিশ্বকাপে ওঠাটাও কোনো দুর্ঘটনা নয়। বাছাইপর্বে কুরাসাও ১০ ম্যাচ খেলে অপরাজিত ছিল। ৭টি জয় ও ৩টি ড্র নিয়ে তারা ইতিহাস গড়ে। জ্যামাইকার মতো শক্তিশালী দলকে পিছনে ফেলে বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে। কনকাকাফ অঞ্চলের ফুটবলে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো, কানাডা, কোস্টারিকার মতো দলগুলোর আধিপত্য ছিল। সেই অঞ্চলের নতুন শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে কুরাসাও।
কুরাসাওয়ের আরেকটি মজার গল্প তাদের কোচকে নিয়ে। দলের দায়িত্বে আছেন অভিজ্ঞ ডাচ কোচ ডিক এডভোকাট। তাঁর বয়স ৭৮ বছর। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক কোচ হিসেবেও তিনি আলোচনায় আছেন। গতকালের ম্যাচে কুরাসাওয়ের জয় পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল খুবই কম। জার্মানি ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি। তবু ম্যাচের একপর্যায়ে স্কোর ছিল ১-১। সেই মুহূর্তটি কুরাসাওয়ের ফুটবল ইতিহাসের এক অনন্য সময় সন্দেহ নেই। বিশ্বকাপে তাদের প্রথম ম্যাচ, প্রথম গোল, আর সেটি এসেছে জার্মানির বিপক্ষে। পরে জার্মানি ৭-১ গোলে জিতলেও কুরাসাওয়ের সমর্থকেরা সবচেয়ে বেশি মনে রাখবে সেই গোলটিকেই।
দেশটির রাজধানী উইলেমস্টাড। শহরটি রঙিন বাড়ির জন্য বিখ্যাত। সাগরের ধারে সারি সারি হলুদ, নীল, গোলাপি ও কমলা রঙের ভবন দেখে মনে হয় যেন কেউ রঙের বাক্স উল্টে দিয়েছে। শহরটি Historic Area of Willemstad হিসেবে বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদাও পেয়েছে।
কুরাসাওকে অনেকেই ক্যারিবীয় সাগরের সবচেয়ে সুন্দর গোপন দ্বীপগুলোর একটি বলেন। বিমান থেকে নিচে তাকালে প্রথমেই চোখে পড়ে অবিশ্বাস্য নীল জল। এমন নীল, যা ছবিতে দেখলেও অনেক সময় অবাস্তব মনে হয়। রাজধানী উইলেমস্টাডে পৌঁছালে মনে হবে যেন কোনো শিল্পী পুরো শহরটাকে রঙতুলি দিয়ে সাজিয়েছেন। সমুদ্রতীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা গোলাপি, হলুদ, কমলা, নীল আর সবুজ রঙের বাড়িগুলো কুরাসাওয়ের সবচেয়ে পরিচিত দৃশ্য। সন্ধ্যায় যখন আলো জ্বলে ওঠে, শহরটি যেন রূপকথার কোনো বন্দরে পরিণত হয়।
তবে কুরাসাওয়ের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে সমুদ্রের নিচে। দ্বীপটির চারপাশে রয়েছে শত শত প্রজাতির মাছ, প্রবালপ্রাচীর আর ডুবে যাওয়া পুরোনো জাহাজ। পৃথিবীর অন্যতম সেরা ডাইভিং গন্তব্য হিসেবেও পরিচিত কুরাসাও। এমনকি অনেক সৈকতে সমুদ্রের পানিতে কয়েক কদম হাঁটলেই রঙিন মাছ আর প্রবাল দেখা যায়। দ্বীপজুড়ে রয়েছে ত্রিশেরও বেশি বিখ্যাত সৈকত। কোথাও সাদা বালু, কোথাও পাথুরে উপকূল, কোথাও আবার সমুদ্রের জল এতটাই স্বচ্ছ যে কয়েক মিটার নিচ পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যায়। বিশেষ করে প্লায়া কেনেপা, কাস আবাও এবং প্লায়া লাগুন পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। আরেকটি কারণে ভ্রমণপিপাসুরা কুরাসাওকে পছন্দ করেন। ক্যারিবীয় অঞ্চলের অনেক দ্বীপ প্রতিবছর শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কুরাসাও তথাকথিত ‘হারিকেন বেল্ট’-এর বাইরে অবস্থিত। ফলে বছরের প্রায় সব সময়ই এখানে ভ্রমণ করা যায়। দিনে সমুদ্র, বিকেলে রঙিন শহর আর রাতে সমুদ্রতীরের খোলা আকাশের নিচে সংগীত—কুরাসাও এমন একটি জায়গা, যেখানে ফুটবলের বাইরেও পর্যটকদের জন্য অপেক্ষা করে এক টুকরো স্বর্গ।
বাংলাদেশ থেকে কুরাসাওয়ে সরাসরি কোনো ফ্লাইট নেই। সাধারণত ঢাকা থেকে প্রথমে যেতে হয় মধ্যপ্রাচ্যের কোনো বড় বিমানবন্দর। সেখান থেকে ইউরোপের কোনো শহর, বিশেষ করে আমস্টারডাম হয়ে কুরাসাওয়ের প্রধান বিমানবন্দর কুরিাসাও ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট-এ পৌঁছানো যায়। বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের জন্য ভিসা-সংক্রান্ত নিয়ম সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই যাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট দূতাবাস বা সরকারি সূত্র থেকে সর্বশেষ তথ্য যাচাই করা জরুরি।
সূত্র: ফিফা, কনকাকাফ, ইউরোনিউজ, দ্য গার্ডিয়ান, বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, টেলিকম এশিয়া








