গিজার পিরামিড কি ভূমিকম্প প্রতিরোধী?

মিসরের পিরামিড
খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০০ সালের কথা। মিসরের মহান ফারাও খুফু তার রাজত্বকালে এক বিশাল নির্মাণযজ্ঞ শুরু করার কথা ভাবলেন। তিনি চেয়েছিলেন গিজা মালভূমিতে এমন একটি বিশাল পিরামিড তৈরি করতে, যা পরবর্তীতে তার সমাধি হিসেবে ব্যবহৃত হবে। সেই ভাবনা থেকেই পরবর্তী ২৬ বছর ধরে হাজার হাজার শ্রমিক প্রায় ২৩ লাখ চুনাপাথর এবং গ্রানাইট ব্লক ব্যবহার করে ৪৮১ ফুট উঁচু এই বিশাল পিরামিড তৈরি করেছিলেন। হাজার হাজার বছর ধরে এই স্থাপত্যশৈলী নানা ঝড়ঝাপটা আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ পার করে টিকে আছে। তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, গিজার এই গ্রেট পিরামিড শুধু সময়ের আঘাতেই টিকে থাকেনি, বরং এটি এমনভাবে নির্মিত হয়েছে যা ভূমিকম্পের মতো ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায়ও বিশেষভাবে কার্যকর।
মিসর এবং জাপানের গবেষকরা পিরামিডের ভেতরে এবং চারপাশে প্রায় ৪০টি ভিন্ন ভিন্ন স্থানে কম্পন তরঙ্গ বিশ্লেষণ করেছেন। এর উদ্দেশ্য ছিল এটি বোঝা যে, পিরামিডটি ভূকম্পন বা সিসমিক অ্যাক্টিভিটির বিরুদ্ধে কীভাবে সাড়া দেয়। সায়েন্টিফিক রিপোর্টস জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, পিরামিডের গঠনশৈলী ভূমিকম্পের কম্পন তরঙ্গকে ছড়িয়ে দিতে অত্যন্ত দক্ষ। কায়রোর ন্যাশনাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড জিওফিজিক্সের সিসমোলজিস্ট এবং এই গবেষণার অন্যতম লেখক আসেম মোস্তফা জানিয়েছেন, পিরামিডটি এমনভাবে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে নির্মাণ করা হয়েছে যে, এটি যেকোনো শক্তিশালী ভূমিকম্পের মুখেও দৃঢ় থাকতে পারে।
পিরামিডের স্থায়িত্বের অনেক কারণ আগে থেকেই গবেষকদের জানা ছিল। এর বিশাল ভিত্তি যার প্রস্থ ৭৫৫ ফুট পর্যন্ত বিস্তৃত, তা পিরামিডকে সহজে পড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে। এটি অত্যন্ত প্রতিসম এবং শক্ত পাথুরে ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, পিরামিডের এই কাঠামোগত সহনশীলতা নিয়ে কোনোদিনই কোনো সন্দেহ ছিল না। কায়রোর ১৯ মাইল দক্ষিণে সাক্কারাতে এর আগের পিরামিডগুলো নির্মিত হয়েছিল। জোসারের পিরামিড বা স্টেপ পিরামিড হলো এর মধ্যে প্রাচীনতম। সেটির আকৃতি খুফুর পিরামিড থেকে আলাদা ছিল, যা ধাপে ধাপে ওপরের দিকে উঠে গেছে। পরে ফারাও খুফুর বাবা ফারাও স্নেফেরু বড় আকারের পিরামিড তৈরির ক্ষেত্রে মসৃণ বা সমতল পাশ তৈরির পথিকৃৎ ছিলেন। খুফুর মৃত্যুর বহু বছর পরেও মিসরে পিরামিড নির্মাণ অব্যাহত ছিল; কিন্তু পরবর্তীকালের অনেক নির্মাণশৈলীতে ব্যয় কমানোর জন্য স্থায়িত্বের সঙ্গে আপস করা হয়েছিল।
উদাহরণস্বরূপ, খুফুর ছেলে জেদেফরে কায়রোর উত্তরে একটি পিরামিড তৈরি করেছিলেন যেখানে একটি পাহাড়ের অংশবিশেষকে কাজে লাগানো হয়েছিল। সেই স্থাপনায় পাথরের ব্লকের ব্যবহার কম হওয়ায় তা তুলনামূলকভাবে কম স্থিতিশীল ছিল। আবার কয়েক শতাব্দী পরে নির্মিত অ্যামেনেমহাত তৃতীয়ের ব্ল্যাক পিরামিডটি মূলত মাটির ইট দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল, যা চুনাপাথরের তুলনায় সস্তা কিন্তু দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ার প্রবণতা ছিল। দুর্বল ভিত্তির কারণে এগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয় হয়ে গেছে এবং অনেকগুলো সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। বিপরীতে খুফুর পিরামিড তার অপ্রতিদ্বন্দ্বী স্থায়িত্ব বজায় রেখেছে।
গবেষকরা তাদের পরীক্ষায় পিরামিডের ভেতরের বিভিন্ন কক্ষ যেমন কিংস চেম্বার, কুইন্স চেম্বার, রিলিভিং চেম্বার এবং ভূগর্ভস্থ চেম্বারে কম্পন ফ্রিকোয়েন্সি পরিমাপ করেছেন। তারা অ্যাম্বিয়েন্ট ভাইব্রেশন অ্যানালাইসিস নামক একটি বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন, যা ধ্বংসাত্মক কোনো প্রভাব ছাড়াই পাথরের ব্লক এবং ভেতরের টানেলগুলোর মধ্য দিয়ে কম্পন কীভাবে প্রবাহিত হয় তা মাপতে সাহায্য করে। গবেষণার ফলাফল বলছে, পুরো কাঠামোর গড় রেজোন্যান্স ফ্রিকোয়েন্সি ২ থেকে ২.৬ হার্টজের মধ্যে। এর অর্থ হলো কম্পন এক পাথর থেকে অন্য পাথরে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে, যা স্থিতিশীলতার বড় প্রমাণ। মজার বিষয় হলো, পিরামিডের বাইরের মাটির কম্পন ফ্রিকোয়েন্সি প্রায় ০.৬ হার্টজ, যা পিরামিডের নিজস্ব ফ্রিকোয়েন্সি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
গবেষক আসেম মোস্তফা জানিয়েছেন, পিরামিডের কম্পন ফ্রিকোয়েন্সি মাটি থেকে আলাদা হওয়ায় ভূমিকম্পের সময় রেজোন্যান্স বা প্রতিধ্বনি প্রভাব অনেক কমে যায়। ফলে মাটির হিংস্র কম্পন পিরামিডের ওপর তেমন ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে না। সুয়েজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-পদার্থবিদ আহমেদ এলদোসুকি, যিনি এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তিনিও এই মতামতের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন। তিনি জানান, পিরামিডের ভেতরের বিভিন্ন অংশে যে ধারাবাহিক ফ্রিকোয়েন্সি পাওয়া গেছে, তা প্রাচীন প্রকৌশলীদের অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দেয়।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে যে, কিংস চেম্বারের ঠিক ওপরে থাকা রিলিভিং চেম্বারগুলো ক্ষতিকর ফ্রিকোয়েন্সি কমিয়ে ফেলতে দারুণভাবে কাজ করে। এই চেম্বারগুলোর কারণে কম্পন নিয়ন্ত্রণে থাকে যা কিংস চেম্বারকে সুরক্ষিত রাখে এবং পিরামিডের সামগ্রিক ক্ষতি প্রতিরোধ করে। যদিও বিজ্ঞানীরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারছেন না যে প্রাচীন মিসরীয়রা ভূমিকম্পের কথা মাথায় রেখেই এটি নির্মাণ করেছিলেন কি না, তবে এটি স্পষ্ট যে কয়েক শতাব্দী ধরে সফলতার পাশাপাশি ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়েই তারা এই স্থাপত্যশৈলী গড়ে তুলেছিলেন।
আসেম মোস্তফার মতে, এটি হাজার বছর ধরে চোখের আড়ালে থাকা অভিজ্ঞতালব্ধ প্রকৌশলবিদ্যার এক মাস্টারপিস। প্রাচীন মিসরীয় প্রকৌশলীরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এই অসাধারণ নির্মাণ কৌশল আয়ত্ত করেছিলেন। তাদের এই অর্জন আজও আধুনিক বিজ্ঞানীদের হতবাক করে দেয়। আধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্য নিয়ে পরীক্ষা করার পরও তাদের প্রকৌশলগত নিখুঁততা এবং বুদ্ধিমত্তার কাছে বর্তমান সময়ও নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। গিজার এই গ্রেট পিরামিড শুধু একটি সমাধি নয়, বরং এটি মানব ইতিহাসের এক অসাধারণ প্রকৌশলগত উপাখ্যান। অনাগত ভবিষ্যতে কত বড় বড় দুর্যোগ আসবে তা কেউ জানে না, কিন্তু খুফুর এই বিশাল পিরামিড তার বিশালতা এবং অভূতপূর্ব নির্মাণশৈলী নিয়ে যে টিকে থাকবে, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই।
প্রকৃতি এবং বিজ্ঞানের সমন্বয়ে তৈরি কোনো কাজ যদি যথাযথ পরিকল্পনা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে করা হয়, তবে তা সময়ের সীমানা ছাড়িয়ে অমর হয়ে থাকতে পারে। প্রাচীন মিসরীয়রা দক্ষ নির্মাণকারী তো ছিলেনই, তারা আরও ছিলেন আধুনিক বিজ্ঞানের সমতুল্য বা তার চেয়েও সূক্ষ্ম চিন্তাধারার অধিকারী এক অদ্ভুত জাতি।
সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক








