কেন আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ‘মিডটার্ম অভিশাপ’ বলা হয়?

প্রতীকী ছবি
নির্বাচনে জিতে হোয়াইট হাউসে ঢোকার সময় প্রেসিডেন্টের মুখে লেগে থাকে হাসি। তবে সেই হাসি উবে যেতে লাগে মাত্র ২ বছর। দলের নেতাকর্মীদের উৎসবের আমেজে যেন জল ঢেলে দেয় সে দেশের মধ্যবর্তী নির্বাচন। এই নির্বাচনে নেই প্রেসিডেন্ট পদের লড়াই, কিন্তু এতে যা ঘটে তাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং এই নির্বাচনেই অনেক সময় ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দলের জনপ্রিয়তার বেলুন চুপসে যায়। কংগ্রেসের আসন খোয়াতে হয়, কমে যায় রাজনৈতিক দাপট। মার্কিন রাজনীতিতে এই পরিচিত বিপত্তির নাম ‘মিডটার্ম অভিশাপ’ বা ‘মিডটার্ম কার্স’।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টের মেয়াদ চার বছর। কিন্তু প্রতিনিধি পরিষদের (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) সদস্যদের মেয়াদ মাত্র দুই বছর। তাই প্রতি দুই বছর পরপরই তাদের ভোটের লড়াইয়ে নামতে হয়। একই সময়ে সিনেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনেও নির্বাচন হয়। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাঝামাঝি সময়ে এই ভোট অনুষ্ঠিত হয় বলেই এর নাম মধ্যবর্তী নির্বাচন বা মিডটার্ম ইলেকশন। এখানে প্রেসিডেন্ট পদে ভোট হয় না, তবে তার দলের রাজনৈতিক শক্তির পরীক্ষা ঠিকই হয়ে যায়।
দুই বছর পরপর ভোটের ব্যবস্থা কেন?
মধ্যবর্তী নির্বাচনের গোড়ার কথা জানতে হলে ফিরতে হবে ১৭৮৭ সালের ১৭ সেপ্টেম্বরে। এইদিনে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান প্রণেতারা নতুন রাষ্ট্রের সংবিধানে স্বাক্ষর করেন। তাদের সামনে প্রশ্ন ছিল, জনগণের প্রতিনিধিরা কত দিন ক্ষমতায় থাকবেন?
দীর্ঘ মেয়াদ হলে তারা ভোটারদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারেন। আবার ঘন ঘন নির্বাচন হলে আইন প্রণয়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে বিঘ্ন ঘটতে পারে। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যদের মেয়াদ ঠিক করা হয় দুই বছর।
১৭৮৯ সালে নতুন সংবিধানের অধীনে প্রথম কংগ্রেসের কার্যক্রম শুরু হয়। ১৭৯০–৯১ সালে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম মধ্যবর্তী পর্যায়ের কংগ্রেস নির্বাচন। তখনো যুক্তরাষ্ট্রে আজকের মতো ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান দলের কাঠামো গড়ে ওঠেনি। তবে প্রশাসনপন্থী ও বিরোধী প্রতিনিধিদের মধ্যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন ছিল। এভাবেই দুই বছর পরপর কংগ্রেস নির্বাচনের রীতি মার্কিন রাজনীতির স্থায়ী অংশ হয়ে ওঠে।
প্রেসিডেন্টের দলের ওপর নেমে আসে বিপদ!
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের আসন কমার পেছনে বড় কারণ ভোটারদের মনোভাব। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতির সবকিছু দুই বছরে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। এর মধ্যে মূল্যস্ফীতি বাড়লে, কর্মসংস্থানে সংকট দেখা দিলে কিংবা সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত বিতর্ক তৈরি করলে ভোটারদের একাংশের মন বদলে যায়। মধ্যবর্তী নির্বাচন তখন সরকারের প্রতি ক্ষোভ জানানোর সুযোগ হয়ে ওঠে।
আরেকটি বিষয় হলো, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় জনপ্রিয় নেতার টানে তার দলের অনেক প্রার্থীও জয়ী হন। রাজনৈতিক পরিভাষায় একে বলা হয় ‘কোটটেইল ইফেক্ট’। কিন্তু দুই বছর পর প্রেসিডেন্ট নিজে ভোটের মাঠে না থাকায় দলের প্রার্থীরা সেই বাড়তি সুবিধা পান না। উল্টো বিরোধী দলের সমর্থকেরা সরকারকে চাপে ফেলতে বেশি উৎসাহ নিয়ে ভোট দিতে আসেন। ফলে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনেকটা ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের কাজের হিসাব নেওয়ার মঞ্চে পরিণত হয়।
দেড় শতাব্দীর ইতিহাসে একই চিত্র
এই অভিশাপের শিকড় বেশ পুরোনো। ১৮৬২ সাল থেকে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৩০ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ১৮টি নির্বাচনের মধ্যে ১৭টিতেই প্রেসিডেন্টের দল প্রতিনিধি পরিষদে আসন হারিয়েছে। একমাত্র ব্যতিক্রম ১৯০২ সাল। সে বছর প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্টের রিপাবলিকান পার্টি আসন বাড়ালেও প্রতিনিধি পরিষদের আসনসংখ্যা সম্প্রসারণের কারণে ডেমোক্র্যাটরা আরও বেশি আসন পায়। ফলে সংখ্যায় এগোলেও আপেক্ষিকভাবে পিছিয়ে পড়ে রিপাবলিকানরা।
পরবর্তী সময়েও এই প্রবণতা খুব একটা বদলায়নি। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান্তা বারবারার ‘দ্য আমেরিকান প্রেসিডেন্সি প্রজেক্ট’-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৩৪ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ২৩টি মধ্যবর্তী নির্বাচনের মধ্যে ২০টিতেই প্রেসিডেন্টের দল প্রতিনিধি পরিষদে আসন হারিয়েছে। অর্থাৎ, মাত্র তিনবার ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল আসন বাড়াতে পেরেছে।
তবে অভিশাপ সব সময় অমোঘ নয়। ১৯৩৪ সালে ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের ডেমোক্রেটিক পার্টি প্রতিনিধি পরিষদে নয়টি আসন বাড়ায়। মহামন্দার পর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে তার ‘নিউ ডিল’ কর্মসূচি তখন ব্যাপক জনসমর্থন পাচ্ছিল। ১৯৯৮ সালেও ব্যতিক্রম দেখা যায়।
প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের ডেমোক্রেটিক পার্টি চারটি আসন বাড়ায়। সে সময় ক্লিনটনকে অভিশংসনের জন্য রিপাবলিকানদের উদ্যোগ জনমতের বড় অংশের সমর্থন পায়নি। আর ২০০২ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশের রিপাবলিকান পার্টি আটটি আসন বাড়ায়। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসী হামলার পর বুশের প্রতি জনসমর্থন বৃদ্ধি এই ফলের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
সব মিলিয়ে ১৮৬২ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ৪১টি মধ্যবর্তী নির্বাচনের মধ্যে ৩৭টিতেই প্রেসিডেন্টের দল প্রতিনিধি পরিষদে আসন হারিয়েছে। অর্থাৎ, প্রায় দেড় শতাব্দীর ইতিহাসে মাত্র চারবার তাদের আসন বেড়েছে। তবে সিনেটের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা কিছুটা আলাদা। কারণ, প্রতি দুই বছর পর সিনেটের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন হয়।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের চেয়ার অবশ্য টলে না, কিন্তু টান পড়ে তার জনপ্রিয়তা ও ক্ষমতায়। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বিরোধীদের হাতে চলে গেলে বাজেট পাস থেকে শুরু করে আইন প্রণয়ন- সবকিছুতেই বাধার মুখে পড়তে হয় তাকে। তাই হোয়াইট হাউসের বাসিন্দার জন্য এই নির্বাচন যেন দুই বছরের মাথায় আরেক দফা জনপ্রিয়তার পরীক্ষা। আর ইতিহাসের এই পুনরাবৃত্তিই জন্ম দিয়েছে ‘মিডটার্ম অভিশাপ’ কথাটির।
সূত্র: দ্য আমেরিকান প্রেসিডেন্সি প্রজেক্ট, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া সান্তা বারবারা, দ্য কনস্টিটিউশন সেন্টার, এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, হোয়াইট হাউস হিস্টোরিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন










