বিশ্ব গাধা দিবস আজ
অবহেলা আর উপহাসের আড়ালে এক বুদ্ধিমান প্রাণীর গল্প

মানবসমাজে ‘গাধা’ শব্দটি কাউকে বোকা বোঝাতে উপহাসের সুরে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু বাস্তবে কি আসলেই প্রাণীটি বোকা? তবে যাই হোক— চতুষ্পদ প্রাণীটির জন্য রয়েছে একটি গোটা দিবস। মজার মনে হলেও এদিনের আছে বিশেষ গুরুত্ব। গাধার জীবনযাপন নিয়ে জানার জন্যই পালন করা হয় দিনটি।
একটি ফেসবুক গ্রুপ বানিয়ে প্রথম বিশ্ব গাধা দিবস শুরু করেন আর্ক রাজিক নামের এক প্রাণিবিজ্ঞানী। মরুভূমির প্রাণিজগৎ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে অনুভব করেন গাধাদের কষ্ট। অবলা এ প্রজাতিটি যথাযথ স্বীকৃতি তো পাচ্ছেই না, বরং সবখানে উপহাসের পাত্র হিসেবেই পরিচিত। তখন থেকেই প্রতিবছর ৮ মে পালিত হচ্ছে দিবসটি।
গাধা ঝুঁকি চিনতে পারে এবং বিপজ্জনক কাজ করতে চায় না। বিপদ বুঝলে কোনোভাবেই ঝুঁকি নেয় না। যেমন গভীর পানি বা খাড়া ঢাল দেখলে নির্বোধের মতো ঝাঁপ না দিয়ে থেমে যায়
গাধা কি আসলে ‘গাধা’?
গাধাকে জেদ বা একগুঁয়েমির কারণেই আসলে ‘বোকা প্রাণী’ ডাকা হয়। গবাদিপশুর ভেতরে এরাই স্বেচ্ছায় মানুষের অবাধ্য হতে পারে। অন্ধভাবে অনুকরণ করতে চায় না বলেই মানুষ তাকে নির্বোধ ভাবে। যদিও গাধা অত্যন্ত বুদ্ধিমান একটি প্রাণী।
গাধা ঝুঁকি চিনতে পারে এবং বিপজ্জনক কাজ করতে চায় না। বিপদ বুঝলে কোনোভাবেই ঝুঁকি নেয় না। যেমন- গভীর পানি বা খাড়া ঢাল দেখলে নির্বোধের মতো ঝাঁপ না দিয়ে থেমে যায়। অতিরিক্ত বোঝা চাপালে বা বিপজ্জনক পথে যেতে বললে গাধা নড়েও না। তাছাড়া প্রাণীটির স্মৃতিশক্তি অসাধারণ। কোনো পরিচিত এলাকা মনে রাখতে পারে প্রায় ২৫ বছর পর্যন্ত। স্বভাব কৌতূহলী। কোনো জায়গা বা বস্তুর ওপর আগ্রহ চাপলে ছুটে যায় সেদিকে। এদের গলার স্বর কর্কশ। হেঁড়ে গলায় ডাকাডাকি করে বলে মানুষ বিরক্ত হয়।
কৃষিকাজ ও বোঝাবাহী কাজে গাধা ব্যবহার করত প্রাচীন মিসর ও লিবিয়ার মানুষ। রোমান যুগে গাধার দাম ছিল প্রায় ৪০০ সেস্টারসেস, যা আজকের দিনে হাজার ইউরোর সমান
ইতিহাস ও বিবর্তন
গাধাকে প্রায় ৭ হাজার বছর আগে পূর্ব আফ্রিকায় প্রথম পোষ মানানো হয়। আধুনিক গাধার পূর্বপুরুষ সোমালিয়ান বন্য গাধা। ফ্রান্সের বোয়েঁভিল-আঁ-উভর নামের এক রোমান ভিলার প্রত্নতাত্ত্বিক সাইটে পাওয়া গেছে গাধার পূর্বপুরুষের ফসিল।
ডিএনএ সিকোয়েন্স বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই ফসিলগুলোর সঙ্গে আফ্রিকার সোমালিয়ান বন্য গাধার জিনগত মিল আছে। কৃষিকাজ ও বোঝাবাহী কাজে গাধা ব্যবহার করত প্রাচীন মিসর ও লিবিয়ার মানুষ। রোমান যুগে গাধার দাম ছিল প্রায় ৪০০ সেস্টারসেস, যা আজকের দিনে হাজার ইউরোর সমান। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, আধুনিক গাধার চেয়ে রোমান যুগের গাধা ছিল অনেক বড়। প্রায় ১৫৫ সেন্টিমিটার।
রোমান সাম্রাজ্যের সময়ে ‘গাধা’ শব্দটি ছিল অপমানসূচক। যারা পড়তে বা লিখতে পারত না তাদের গাধা বলে খেপানো হতো। আজও আমরা কাউকে তুচ্ছার্থে গাধা বলি। অথচ গাধা এসবের কিছুই চায়নি
মানবজাতির প্রতি গাধার অবদান
গাধা মানবসভ্যতার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও অন্যান্য পাহাড়ি এলাকার রুক্ষ পথে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টানাগাড়ি বা বোঝা বহন করানোর কাজে ব্যবহার হয়ে আসছে গাধা। মাঠের কাজ, টানাগাড়ি, ইট-পাথর বহনের কাজ করেছে এরা। রোমে সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনে গাধা ও খচ্চর ব্যবহৃত হতো। চীনে গাধার চামড়ার নিচের আঠা থেকে ওষুধ তৈরি হয়, যা প্রয়োজন হয় অ্যাজমা ও ইনসোমনিয়ার চিকিৎসায়।
ওষুধশিল্পে অবদানের জন্য ক্রমেই কমছে প্রাণীটির সংখ্যা। একরোখা বৈশিষ্টের জন্য পোষ মানা গাধার মূল্য ও কদর ছিল অন্যরকম। অথচ সেই গাধার আজ কোনো দামই যেন নেই মানুষের কাছে। রোমানরা ঘোড়া ও গাধার ক্রসব্রিডিং করে খচ্চর তৈরি করে, যা সামরিক ও পরিবহন কাজে ব্যবহৃত হতো।
রোমান সাম্রাজ্যের সময়ে ‘গাধা’ শব্দটি ছিল অপমানসূচক। যারা পড়তে বা লিখতে পারত না, তাদের গাধা বলে খেপানো হতো। আজও আমরা কাউকে তুচ্ছার্থে গাধা বলি। অথচ গাধা এসবের কিছুই চায়নি। মানুষই তাদের ধরে যখন প্রয়োজন খাটিয়েছে, আর প্রয়োজন ফুরোলেই দূরে ঠেলে দিয়েছে। ‘অলস’ গাধাদের এখনকার অলসতার পেছনেও দায় মানুষের, কারণ মানুষ কৃত্রিমভাবে গাধাকে নিজের সুবিধামতো বংশবৃদ্ধি করেছে। যেমন কুকুরকে করেছে বন্ধুত্বের জন্য। অথচ সব দোষ চাপানো হয়েছে গাধার ঘাড়ে।




