রুশ অধিকৃত ইউক্রেনের শহরে যুদ্ধবিরতি, আগাছা খেয়ে বাঁচছেন বাসিন্দারা

ওলেশকি থেকে ইউক্রেনীয় বেসামরিক নাগরিকদের সরিয়ে নেওয়ার জন্য একটি মানবিক করিডোর প্রতিষ্ঠার দাবিতে ৬ অক্টোবর ইউক্রেনের কিয়েভে সমাবেশ হয়— রয়টার্স
রুশ অধিকৃত ইউক্রেনের ওলেশকি শহরে যুদ্ধবিরতি শুরু হয়েছে। শহরটিতে খাবার, পানি ও বিদ্যুৎ ছাড়াই আটকে রয়েছেন বাসিন্দারা।
ইউক্রেনের কর্মকর্তারা ও রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সীমিত পরিসরের এই যুদ্ধবিরতি মেনে চলা হচ্ছে। হোয়াইট হাউসের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের উদ্যোগে যুদ্ধবিরতিটি কার্যকর হয়েছে। এর লক্ষ্য শুক্রবার ত্রাণ পৌঁছানো এবং বেসামরিক মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা।
খেরসন অঞ্চলের সম্মুখসারির কাছে অবস্থিত ওলেশকি শহরের এক পাশে দিনিপ্রো নদী, যা শহরটিকে ইউক্রেনীয় সেনাদের অবস্থান থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। অন্য পাশে রয়েছে রুশ বাহিনী।
বেঁচে থাকার তাগিদে অনেক বাসিন্দা এখন বাগানের আগাছা রান্না করে খাচ্ছেন। বিবিসিকে তারা জানিয়েছেন, চরম ক্ষুধার মধ্যে দিন কাটছে তাদের। তারা শহর ছেড়ে চলে যেতে চান।
তবে যুদ্ধবিরতি টিকবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। শহরের এক বাসিন্দা বললেন, ‘রাশিয়ার মানবিকতায় আমার বিশ্বাস নেই।’
কিয়েভের ধারণা, ওলেশকি ও আশপাশের এলাকায় এখনো ৬ হাজার পর্যন্ত মানুষ আটকে রয়েছে। তাদের মধ্যে ২০০ জন শিশু। শহরটির ভেতরে বসবাস করছেন মাত্র ১ হাজার ৭০০ জন।
যুদ্ধের আগে ওলেশকির জনসংখ্যা ছিল ২৪ হাজার। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর প্রথম দিকেই শহরটি দখল করে নেয় রাশিয়া।
পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠেছে যে শহরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন। অন্যদিকে, শহর থেকে বের হওয়ার পথগুলোতে মাইন পুঁতে রাখা হয়েছে এবং ড্রোন হামলার ঝুঁকি থাকায় পালিয়ে যাওয়াও অত্যন্ত বিপজ্জনক।
শহরটির কোনো দোকান খোলা নেই। গত তিন বছর ধরে সেখানে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
চলতি মাসের শুরুতে পোপ চতুর্দশ লিও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি ওলেশকিতে খাবার ও চিকিৎসাসামগ্রী প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার পাশাপাশি নিরাপদে বেসামরিক মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে যুদ্ধবিরতির বিষয়ে মস্কোর সঙ্গে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান তিনি।
বর্তমান যুদ্ধবিরতির উদ্দেশ্য শহরে ত্রাণ পৌঁছানো এবং শুক্রবারের পরিকল্পিত উদ্ধার অভিযানের আগে বের হওয়ার সড়কগুলো থেকে মাইন অপসারণ করা, যাতে বাসিন্দারা নিরাপদে চলে যেতে পারেন।
এক নারী বিবিসিকে জানান, তিনি একটি স্থলমাইনের ওপর পা দিয়েছিলেন। বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন এবং তার দুটি অস্ত্রোপচার হয়েছে।
তিনি বললেন, ‘আমাকে সেখানে কত দিন থাকতে হবে, জানি না।’ উদ্ধার অভিযানে অংশ নিতে না পারার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন ওই নারী।
গত মাসে বিবিসিকে অনেকে জানিয়েছিলেন, শহরে মাত্র একটি হাসপাতাল আংশিকভাবে চালু রয়েছে। সেটিও সপ্তাহে কয়েক দিন খোলে এবং গুরুতর রোগীদের অঙ্গচ্ছেদের অস্ত্রোপচার করে।
যোগাযোগব্যবস্থা অনিয়মিত হওয়ায় ওলেশকির বাসিন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা কঠিন। রুশ বাহিনীর প্রতিশোধের আশঙ্কায় অনেকে পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতেও চান না। ফলে যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, তা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
উদ্ধার অভিযানের পরিকল্পনা নিয়েও অনেক বিষয় অস্পষ্ট। শুরুতে মানুষকে কোথায় ও কীভাবে নাম নিবন্ধন করতে হবে, সেটিও পরিষ্কার ছিল না। কেউ কেউ জানতে চাইছেন, পোষা প্রাণী সঙ্গে নেওয়া যাবে কি না। আবার কেউ কেউ বাড়িঘর ছেড়ে চলে গেলে ভবিষ্যতে তাদের কী হবে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন।
জেলেনস্কির কার্যালয়ের প্রধান কিরিলো বুদানভ মঙ্গলবার বলেছেন, ‘আমাদের মানুষকে উদ্ধার করার এই অভিযান সফলভাবে ও নিরাপদে সম্পন্ন হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির সেনাবাহিনীর দিনিপ্রো গ্রুপের সদস্যরা গ্রামে প্রবেশের প্রধান সড়কগুলোতে ‘প্রকৌশলগত অনুসন্ধান’ চালাচ্ছেন এবং বিস্ফোরক ও পেতে রাখা ফাঁদ অপসারণ করছেন।
শহর ছাড়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় বাসিন্দাদের মধ্যে আশাবাদ দেখা দিলেও উদ্বেগ রয়েছে। রাশিয়া তাদের ইউক্রেনে ফিরে যেতে বাধা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে। এ ছাড়া তাদের ফোন ও অনলাইন কার্যক্রম পরীক্ষা করে ইউক্রেনের প্রতি সমর্থনের প্রমাণ খোঁজা হতে পারে। এমন কিছু পাওয়া গেলে তাদের আটক করে নির্যাতন করা হতে পারে বলেও ভয় রয়েছে।
ওলেশকিতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, উদ্ধার অভিযানের সময় আবার গুলি শুরু হতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন। এ ছাড়া যুদ্ধবিরতি মেনে চলতে ব্যর্থ হওয়ার দায় কোনোভাবে ইউক্রেনের ওপর চাপানো হতে পারে বলেও তাদের ভয়।
মেলানিয়া ট্রাম্পের হস্তক্ষেপে ওলেশকি নিয়ে যুদ্ধবিরতি চুক্তি রাশিয়া-ইউক্রেনের
২৩ অক্টোবর ২০২৬
গত মাসে ক্রেমলিন স্বীকার করেছিল, ওলেশকিতে ‘সংকটজনক পরিস্থিতি’ তৈরি হয়েছে এবং খাবার ও ওষুধ সরবরাহে সমস্যা দেখা দিয়েছে। তবে একই সঙ্গে তারা দাবি করে, পরিস্থিতি সমাধানে রুশ সেনাবাহিনী কাজ করছে। সংকটের জন্য কিয়েভকেও দায়ী করে মস্কো।
এই পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে গত সপ্তাহে হোয়াইট হাউস জানায়, মেলানিয়া ট্রাম্পের উদ্যোগে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় টেলিগ্রামে জানিয়েছে, মানবিক অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে মস্কোর স্থানীয় সময় ভোর ৪টায় (ইউক্রেনের সময় ভোর ৩টা) দিনিপ্রো নদীর ওপারে অবস্থিত ইউক্রেনের খেরসন শহর লক্ষ্য করে গোলাবর্ষণ বন্ধ করেছে রুশ বাহিনী।
ইউক্রেনের সংসদ সদস্য ও পার্লামেন্টে জেলেনস্কির দলের নেতা দাভিদ আরাখামিয়া জানিয়েছেন, স্থানীয় সময় ১ নভেম্বর রাত ১১টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার কথা।
ইউক্রেনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মানবাধিকারবিষয়ক সংসদীয় কমিশনার দিমিত্রো লুবিনেৎস অভিযান সমন্বয় করতে ওই এলাকায় গেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লুবিনেৎস লেখেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের মধ্যস্থতা ও সমন্বয়ে এবং রাশিয়ার মানবাধিকার কমিশনার ইয়ানা লান্ত্রাতোভার সহযোগিতায় পরিচালিত মানবিক অভিযানের অংশ এটি।’ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর জেনারেল স্টাফ জানিয়েছে, মানবিক কারণে অভিযানটি সম্পর্কে নীরবতা বজায় রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে যাচাই না করা তথ্যে বিশ্বাস না করতে এবং ‘মানুষ ও ত্রাণ বহরের চলাচলের পথ, সময় ও স্থান’ নিয়ে গুজব না ছড়াতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে তারা।
জেলেনস্কি সতর্ক করে বলেছেন, রাশিয়া যে পথগুলো থেকে মাইন সরাচ্ছে, সেগুলো দিয়ে ওলেশকি ছেড়ে যাওয়া বেসামরিক মানুষকে ‘রাশিয়ার দিকে যেতে হবে এবং সেখানেই থাকতে হবে’—এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
তবে তিনি বলেছেন, কিছু মানুষ ‘যেকোনো উপায়ে’ ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় পৌঁছাতে পারবেন। তার মতে, আটকে পড়া প্রত্যেকেরই নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানো এবং ইউক্রেনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত।
গত সপ্তাহে হোয়াইট হাউস জানিয়েছিল, ‘দুই দেশের সামরিক নয়, এমন বেসামরিক নেতারা একসঙ্গে ওলেশকির বাসিন্দাদের বাড়িতে গিয়ে তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তার মাত্রা নির্ধারণ করবেন।’
যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প তার পূর্বসূরিদের অনেকের তুলনায় জনসমক্ষে কম উপস্থিত থাকেন। হোয়াইট হাউসের অনুষ্ঠানেও তাকে মাঝেমধ্যে দেখা যায়। তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট মানবিক সংকট মোকাবিলায় তিনি যুক্ত হয়েছেন।
২০২৫ সালের আগস্টে পুতিনের উদ্দেশে একটি চিঠি লিখেছিলেন মেলানিয়া। তাতে তিনি বলেছিলেন, ‘বিশ্ব জুড়ে শিশু ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত করার এখনই সময়।’
ওলেশকিতে যুদ্ধবিরতি চললেও ইউক্রেনের অন্যান্য এলাকায় হামলা অব্যাহত রয়েছে।
ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে সোমবার সন্ধ্যায় হামলায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় ও একটি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে একজন নিহত এবং ১৪ জন আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে, রাশিয়ার ব্রিয়ানস্ক শহরে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় একজন নিহত ও ছয়জন আহত হয়েছেন।
সূত্র : বিবিসি







