ইউরোপের অভিবাসন সংকটের শিকড় কোথায়?

সমুদ্রপথে সেউতায় প্রবেশের চেষ্টা করা মরক্কোর এক অভিবাসীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন স্প্যানিশ সেনারা- রয়টার্স
স্পেনের সেউতা থেকে ইতালির লাম্পেদুসা কিংবা ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ; সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক আলোচনা কেন্দ্রবিন্দুতে। অভিবাসীদের ঢল এবং একের পর এক মানবিক বিপর্যয় দৃষ্টি কেড়েছে বিশ্ববাসীর। কাঁটাতারের সীমান্ত উপেক্ষার চেষ্টা, ছোট নৌকায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে মৃত্যুফাঁদে পড়া কিংবা সীমান্তে আটকে পড়া হাজারো মানুষের ছবি এখন বিশ্বগণমাধ্যমে দেখা যায় প্রায় নিয়মিতই। ইউরোপের সীমান্তের এই সংকট এখন একটি বৈশ্বিক চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে ইউরোপ সীমান্তের এই দৃশ্যমান সংকটের জন্ম কী সীমান্তেই? উত্তর- না। এর শিকড় বিস্তৃত অনেক গভীরে। আফ্রিকার দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জলবায়ুগত সংকট রয়েছে এর মূলে।
কেন ঘর ছাড়ছে মানুষ?
আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল, সুদান, সোমালিয়া, ইরিত্রিয়া বা কঙ্গোর মতো দেশগুলোতে বছরের পর বছর ধরে চলছে সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সংকট। কোথাও গৃহযুদ্ধ, কোথাও সশস্ত্র গোষ্ঠীর সহিংসতা, আবার কোথাও রাষ্ট্রীয় দুর্বলতা বিপর্যস্ত করেছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে। এর সঙ্গে আবার নতুন করে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের কড়াঘাতও। খরা, মরুকরণ, কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়া এবং খাদ্যসংকট জীবিকার সন্ধানে দেশ ছাড়তে বাধ্য করছে লাখো মানুষকে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস অনেকবার বলেছেন, অভিবাসনের মূল কারণ মোকাবিলা না করলে সংকটের সমাধান হবে না।
২০১৯ সালে তিনি বলেছিলেন, ‘অভিবাসনের গভীর অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও রাজনৈতিক কারণ রয়েছে।’
তার বক্তব্যের মূল বার্তা হলো, অভিবাসনকে শুধু সীমান্ত নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে দেখলে চলবে না; মানুষ কেন ঘর ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে, সেই কারণগুলোকেও দিতে হবে সমান গুরুত্ব।
যদিও ইউরোপের এই অভিবাসন ঝড়ের একমাত্র উৎস কেবল আফ্রিকা নয়। ইরান, সিরিয়া, আফগানিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার কিছু দেশ থেকে নানাবিধ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করেন ইউরোপে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেউতা কিংবা ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের মতো পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় রুট ঘিরে যে মানবিক বিপর্যয় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে মূলত আফ্রিকার দেশগুলো।
ইউরোপের জবাব
অভিবাসীদের এই ঝড় রুখতে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার বাড়িয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ইইউয়ের সীমান্তরক্ষী এজেন্সি ফ্রন্টেক্সের সক্ষমতা বৃদ্ধি, নজরদারি প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন বেড়েছে, তেমনি মরক্কো, তিউনিসিয়া ও লিবিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে অভিবাসীদের ঠেকানোর চেষ্টা চলছে ইউরোপে পৌঁছানোর আগেই। এসব পদক্ষেপে অবশ্য সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ কিছুটা সহজ হচ্ছে। তবে ধরা ছোঁয়ার বাইরে অভিবাসনের মূল কারণ।
বাস্তবিক দৃষ্টিতে দেখতে গেলে, যুদ্ধ, ক্ষুধা, জলবায়ু বিপর্যয় বা চরম দারিদ্র্য থেকে পালিয়ে আসা মানুষের কাছে কাঁটাতার চূড়ান্ত বাধা হয়ে দাঁড়ায় না কখনোই। বরঞ্চ, কাঁটাতার এড়াতে আরও বিপজ্জনক পথ বেছে নেয় তারা, পরিণতি আরও বেশি প্রাণহানি।
মানবিক সংকট নাকি রাজনৈতিক ইস্যু?
বর্তমান সময়ে ইউরোপের অন্যতম রাজনৈতিক ইস্যুই হলো অভিবাসন। বিভিন্ন দেশে ডানপন্থী দলগুলো এটিকে তুলে ধরছে নিরাপত্তা ও জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্ন হিসেবে। যার ফলে সীমান্ত সুরক্ষায় বিপুল বিনিয়োগ হলেও, অভিবাসনের উৎসদেশগুলোর সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা তুলনামূলকভাবে সীমিত।
প্রয়াত পোপ ফ্রান্সিস সতর্ক করেছিলেন, সীমান্তের সামরিকীকরণে অভিবাসন সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। তার মতে, মানুষের মর্যাদা রক্ষা, নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনের পথ তৈরি এবং যেসব কারণ মানুষকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করছে, প্রয়োজন সেগুলো মোকাবিলায় বৈশ্বিক উদ্যোগ।
সমাধান সীমান্তে নয়, সংকটের উৎসে
আফ্রিকায় বর্তমানে প্রায় ৩১ কোটি মানুষ ক্ষুধার শিকার। মহাদেশটির ৫৬.৬ শতাংশ মানুষ মাঝারি বা গুরুতর খাদ্য অনিরাপত্তায় ভুগছে।
জাতিসংঘের হিসাবে, সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক সংকট ও বাস্তুচ্যুতি—এই চারটি কারণ আফ্রিকার খাদ্য সংকটকে সবচেয়ে বেশি তীব্র করে তুলেছে।
সাম্প্রতিক ইতিহাস ঘাঁটলে নজরে আসে, দ্রুত বেড়েছে আফ্রিকায় সহিংসতার মাত্রা। ২০২৫ সালে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৮ হাজার ৩৭৫টি সহিংস ঘটনা ঘটে। এসব সহিংসতায় ২৩ হাজার ৯৬৮ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। তবে এর আগের বছর যা আগের বছর যা ছিল ২৪ শতাংশ কম। গত এক দশকে আফ্রিকায় সশস্ত্র সংঘাতে নিহত হয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ। পাশাপাশি বাস্তুচ্যুত হয়ে জীবন কাটাচ্ছে ৪ কোটি ৫৭ লাখেরও বেশি মানুষ।
এসবই মূলত অভিবাসী পথকে বেছে নেওয়ার কারণ।
তাই ইউরোপের অভিবাসন সংকটকে শুধু সীমান্ত ব্যবস্থাপনার সমস্যা হিসেবে দেখলে এর পূর্ণ চিত্র ধরা পড়ে না। এটি উন্নয়ন বৈষম্য, সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক নীতিগত ব্যর্থতারও প্রতিফলন। এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে শুধু ইউরোপের সীমান্ত আরও কঠোর করলেই চলবে না; আফ্রিকার সংঘাত কমানো, জলবায়ু অভিযোজন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং টেকসই উন্নয়নে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
সেউতার কাঁটাতার কিংবা ভূমধ্যসাগরের নৌকাগুলো কেবল অভিবাসনের গল্প নয়। তারা মনে করিয়ে দেয়, ইউরোপের সীমান্তে যে মানবিক সংকট দৃশ্যমান, তার শিকড় বহু দূরে—আফ্রিকার যুদ্ধবিধ্বস্ত জনপদ, খরাপীড়িত গ্রাম কিংবা সম্ভাবনাহীন তরুণদের হতাশায়।




