ইরানের ডানা ছাঁটার রাজনীতি আমেরিকার
- মিত্র দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়িয়ে আকাশপথে তেহরানকে বিচ্ছিন্ন করছে ওয়াশিংটন
- ‘ইরানকে বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টায় সাফল্য’ দাবি মার্কিন অর্থমন্ত্রীর

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
যুদ্ধের ধোঁয়া পুরোপুরি কাটেনি। আকাশে এখনো অনিশ্চয়তার মেঘ। কিন্তু এরই মধ্যে নতুন লড়াইয়ের মুখে পড়েছে ইরান। মাটিতে নয়, আকাশপথে। রণক্ষেত্রে বিপর্যস্ত হয়ে এখন ইরানের ডানা ছাঁটার রাজনীতিতে নেমেছে আমেরিকা। মিত্র দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়িয়ে সংকুচিত করে দিচ্ছে ইরানের একের পর এক আন্তর্জাতিক যোগাযোগের দরজা। এই কৌশলের প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে আকাশপথে। আকাশেই শেষ নয়, ব্যাংকিং ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের ওপর চাপ বাড়িয়ে তেহরানকে বিশ্বের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক নেটওয়ার্ক থেকে দূরে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন।
গতকাল রবিবার দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন অর্থ দপ্তরের এক শীর্ষ কর্মকর্তা চলতি মাসে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের একাধিক দেশে গোপন সফর করেছেন। তার বার্তা ছিল স্পষ্ট, ‘আপনারা হয় তেহরানের সঙ্গে ব্যবসা করবেন, নয়তো ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখবেন।’
অন্যদিকে শনিবার আরব নিউজ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট দাবি করেছেন, ইরানকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন ‘সাফল্য’ পাচ্ছে। তিনি জানালেন, ইরানের ওপর আর্থিক চাপ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞার পরিধি আরও বিস্তৃত করছে।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার নতুন ধাপ কার্যকর হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটনের নির্ধারিত সময়সীমা পেরোনোর পর ইরানি বিমান সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক পরিষেবা আরও চাপে পড়ে। বিশেষ করে, দুবাইসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপসাগরীয় রুটে ফ্লাইট বাতিলের ঘটনা সামনে আসে। মার্কিন কর্তৃপক্ষ বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করেছে, ইরানি বিমান সংস্থাকে জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ বা অন্যান্য পরিষেবা দিলে তারাও নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়তে পারে।
ওয়াশিংটনের অভিযোগ, কিছু ইরানি বিমান সংস্থা শুধু বেসামরিক যাত্রী পরিবহনের জন্য নয়, সামরিক সরঞ্জাম ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্থানান্তরেও ব্যবহৃত হয়েছে। তবে তেহরান এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে এবং মার্কিন পদক্ষেপকে অর্থনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল হিসেবে দেখছে। যুদ্ধের পর কিছু রুট আবার চালু হলেও ইরানের বিমান যোগাযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। ইউরোপীয় বিমান নিরাপত্তা সংস্থাও তেহরানের আকাশসীমাকে উচ্চঝুঁকির এলাকা হিসেবে বিবেচনা করে সতর্কতা জারি রেখেছে, যার মেয়াদ ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
গত ৮ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিমান চলাচল খাতের সঙ্গে যুক্ত ৩৬ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর মধ্যে ছিল আগে নিষেধাজ্ঞার আওতায় না থাকা ২৭টি ইরানি বিমান সংস্থা।
এরপর ২১ সেপ্টেম্বর আরও বড় ধাক্কা আসে। ইরানের অন্যতম প্রধান বিমান সংস্থা মাহান এয়ার তেহরান থেকে ইস্তাম্বুল ও আঙ্কারার ফ্লাইট বন্ধ করে দেয়। ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে তেহরান-মাসকাট রুটও বন্ধ হয়েছে। জর্জিয়ার পথও স্থগিত হয়েছে। তুরস্কের তিন বড় বিমান সংস্থা টার্কিশ এয়ারলাইনস, পেগাসাস ও আজেটও ইরানের সঙ্গে ফ্লাইট স্থগিত করেছে। টার্কিশ এয়ারলাইনস ও আজেটের সূচিতে ২০২৭ সালের মার্চের আগে ইরানের কোনো ফ্লাইট দেখা যাচ্ছে না। পেগাসাসের বুকিং ব্যবস্থায়ও ইরানগামী ফ্লাইট সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
একটি পথ বন্ধ হলে মানুষ অন্য পথ খোঁজে। কিন্তু যখন একের পর এক পথ বন্ধ হয়ে যায়, তখন ভ্রমণ আর শুধু যাত্রা থাকে না, তা হয়ে ওঠে বেঁচে ফেরার হিসাব।
মাসকাট নেই। ইস্তাম্বুল নেই। আঙ্কারার পথ অনিশ্চিত। জর্জিয়ার রুটও সংকুচিত। ২২ সেপ্টেম্বর আলজাজিরা জানিয়েছে, বাগদাদ ও মাসকাটগামী কয়েকটি ইরানি ফ্লাইটও বাতিল হয়েছে। তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি একমুখী নয়। ইরানের জাতীয় বিমান সংস্থা জানিয়েছে, ইস্তাম্বুল, বাকু ও নাজাফের কয়েকটি ফ্লাইট তখনো চালু ছিল এবং সংশ্লিষ্ট দেশের বেসামরিক বিমান কর্তৃপক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক স্থগিতাদেশ পাওয়া যায়নি। তবে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতা।
২৩ সেপ্টেম্বর থেকে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করেছেন, ইরানি বিমান সংস্থাগুলোকে জ্বালানি সরবরাহ, অবতরণ সুবিধা, ভূমিসেবা কিংবা টিকিট বিক্রিতে সহায়তা করলে তারা মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি সরাসরি বিশ্বের সব দেশের আকাশসীমা বন্ধ করার পদক্ষেপ নয়। যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশের আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। কিন্তু একটি বিমান চলাচলের জন্য শুধু আকাশ খোলা থাকলেই হয় না। প্রয়োজন জ্বালানি, বিমানবন্দর পরিষেবা, রক্ষণাবেক্ষণ, আর্থিক লেনদেন ও টিকিট ব্যবস্থা। এ জায়গাতেই নিষেধাজ্ঞার চাপ সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, আকাশপথে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হলে শুধু বিমান সংস্থাই নয়, সাধারণ মানুষও সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ে।
এই সংকটের মানবিক দিকটি আরও স্পষ্ট বাংলাদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রেও।
যুদ্ধের শুরুতেই বাংলাদেশ সরকার ইরান থেকে নাগরিকদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছিল। মার্চে আজারবাইজানের মাধ্যমে ১৮৬ বাংলাদেশিকে দেশে ফেরানো হয়। তাদের মধ্যে নারী ও শিশুও ছিলেন। অনেককে ইরান থেকে সীমান্তপথে দীর্ঘ ও ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা করতে হয়েছিল।
এপ্রিলেও তেহরানে বাংলাদেশ দূতাবাস আরও ১৪ বাংলাদেশিকে দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করে। তাদের মধ্যে ইরানের বন্দর আব্বাসে আটকে পড়া মানুষ, জেনাভেহ বন্দরে থাকা নাবিক এবং চিকিৎসার জন্য গিয়ে আটকে পড়া নাগরিক ছিলেন। তাদের একটি দল আর্মেনিয়ার ইয়েরেভান হয়ে দেশে ফেরে। ইরানকে ঘিরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার এই নতুন অধ্যায় তাই শুধু কূটনৈতিক চাপের গল্প নয়। এটি আকাশপথ, অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনের ওপর পড়া এক গভীর প্রভাবের কাহিনি।
আকাশ এখনো খোলা। কিন্তু পথগুলো একে একে সংকুচিত হচ্ছে। আর সেই সংকীর্ণ আকাশপথেই এখন চলছে ওয়াশিংটন ও তেহরানের নতুন সংঘাত।



