যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশিদের সামনে নতুন বাস্তবতা!
- ভিসায় স্বস্তি, অভিবাসনে শঙ্কা, চাকরি ও অর্থনীতিতে বাড়ছে চাপ

ছবি: রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশিদের জন্য সময়টা এখন একসঙ্গে স্বস্তি ও শঙ্কার। একদিকে বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের অভিবাসী ভিসা স্থগিতের নীতিতে আদালতের ধাক্কা পরিবার পুনর্মিলন ও বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে আসতে অপেক্ষমাণ বাংলাদেশিদের জন্য নতুন আশার সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে আশ্রয়প্রার্থীদের ভিসা প্রত্যাহারের উদ্যোগ, এইচ-১বি নিয়ে অস্বাভাবিক উচ্চ ফি, কঠোর অভিবাসন নীতি, বাড়ির ঋণের চাপ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে বাড়তি খরচ প্রবাসীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।
নিউইয়র্ক, নিউ জার্সি, পেনসিলভানিয়া থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশিদের কাছে এখন ওয়াশিংটনের প্রতিটি অভিবাসন ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের আলাদা গুরুত্ব। কারণ এসব সিদ্ধান্ত শুধু নতুন অভিবাসীদের নয়, বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা পরিবারগুলোর জীবন, চাকরি, ব্যবসা, বাড়ি কেনা এবং দেশে থাকা স্বজনদের ভবিষ্যতের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে।
আশ্রয় চাইলেই কি এবার ভিসা হারানোর ভয়?
সবচেয়ে বড় নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে পর্যটন ও ব্যবসায়িক ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশকারীদের ঘিরে।
ট্রাম্প প্রশাসন ২০১৬ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ইস্যু করা বি-১ ও বি-২ ভিসা পর্যালোচনা করে এমন বিদেশিদের ভিসা বাতিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যারা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর আশ্রয়ের আবেদন করেছেন বা বর্তমানে আশ্রয় চাইছেন।
সোমবার ওয়াশিংটন থেকে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এ পরিকল্পনার বিষয়টি নিশ্চিত করে। দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট জানান, মার্কিন অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে এমন বিদেশিদের শনাক্ত করা হচ্ছে, যারা স্বল্পমেয়াদি ভ্রমণকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে এসে পরে স্থায়ীভাবে থাকার উদ্দেশ্যে আশ্রয়ের আবেদন করেছেন।
মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, এই উদ্যোগের আওতায় ২ লাখ পর্যন্ত ভিসা আসতে পারে। তবে চূড়ান্ত সংখ্যা এখনো নির্ধারিত হয়নি।
অর্থাৎ বৈধ ভিসা হাতে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করলেও পরবর্তী সময়ে আশ্রয়ের আবেদন করা ব্যক্তিদের জন্য এখন তৈরি হচ্ছে নতুন এক অনিশ্চয়তা।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—ভিসা বাতিল হওয়া মানেই সঙ্গে সঙ্গে আশ্রয়ের আবেদন বাতিল বা যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার নয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আশ্রয় মামলা, অভিবাসনগত অবস্থান এবং অন্যান্য আইনি বিষয়ের ওপর পরবর্তী ব্যবস্থা নির্ভর করবে।
বাংলাদেশিদের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য এই উদ্যোগ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ থেকে অনেক মানুষ পর্যটন বা ব্যবসায়িক ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছেন। তাদের কেউ কেউ পরে আশ্রয়ের আবেদন করেছেন।
নতুন নীতি কার্যকর হলে এই ব্যক্তিদের অভিবাসন পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশিদের জন্য আলাদা কোনো নিষেধাজ্ঞা বা নির্দিষ্ট সংখ্যা ঘোষণা করা হয়নি।
তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা তথ্যের ভিত্তিতে আতঙ্কিত হওয়ার পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিজেদের অভিবাসন নথি, মামলার অবস্থা ও আইনগত অবস্থান সম্পর্কে অভিবাসন আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
অভিবাসী ভিসায় আদালতের রায়, বাংলাদেশিদের জন্য স্বস্তি
আশ্রয়প্রার্থীদের নিয়ে উদ্বেগের বিপরীতে বাংলাদেশি পরিবারগুলোর জন্য ইতিবাচক খবর এসেছে অভিবাসী ভিসা নিয়ে।
বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের নাগরিকদের অভিবাসী ভিসা ইস্যু স্থগিত রাখার ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিতে ফেডারেল আদালতের আইনি বাধা তৈরি হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বাংলাদেশিদের অনেক পরিবার নতুন করে আশার আলো দেখছে।
দীর্ঘদিন ধরে স্বামী-স্ত্রী, সন্তান, বাবা-মা কিংবা অন্যান্য যোগ্য পরিবারের সদস্যকে বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে আনার অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর কাছে আদালতের সিদ্ধান্ত স্বস্তির খবর হয়ে এসেছে।
তবে এখানেও অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি। প্রশাসনের পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের ওপর পরিস্থিতি আবার পরিবর্তিত হতে পারে।
এইচ-১বি নিয়ে বাংলাদেশি পেশাজীবীদের বড় দুশ্চিন্তা
উচ্চশিক্ষিত বাংলাদেশি তরুণ ও পেশাজীবীদের জন্যও যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন নতুন এইচ-১বি আবেদনের জন্য ১ লাখ ৩ হাজার ২৬৫ ডলার পর্যন্ত ফি প্রস্তাব করেছে। এটি এখনো প্রস্তাবিত ব্যবস্থা; চূড়ান্ত নিয়মে পরিণত হওয়ার আগে আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া রয়েছে।
তবুও সম্ভাব্য এই বিশাল ব্যয় প্রযুক্তি, প্রকৌশল, গবেষণা, চিকিৎসা এবং অন্যান্য উচ্চ দক্ষতার পেশায় বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য বড় বাধা তৈরি করতে পারে।
একই সঙ্গে যেসব মার্কিন প্রতিষ্ঠান বিদেশি দক্ষ কর্মী নিয়োগ করে, তাদের খরচও বাড়তে পারে। ফলে বাংলাদেশি পেশাজীবীদের জন্য শুধু চাকরি পাওয়াই নয়, ভবিষ্যতে সেই চাকরির মাধ্যমে অভিবাসন প্রক্রিয়ায় যাওয়াও আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।
শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন প্রশ্ন
যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা শেষ করে চাকরি এবং পরবর্তীতে স্থায়ীভাবে থাকার পরিকল্পনা করা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্যও পরিস্থিতি বদলাচ্ছে।
অভিবাসন নীতির পরিবর্তন, চাকরির বাজারে অনিশ্চয়তা এবং বিদেশি দক্ষ কর্মীদের নিয়োগ নিয়ে নতুন বিধিনিষেধ—সবকিছু মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা আগের তুলনায় কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
একসময় যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা মানেই ভালো চাকরি ও দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ারের সম্ভাবনা—এমন ধারণা ছিল অনেকের। এখন সেই হিসাবের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অভিবাসন নীতির ঝুঁকি ও বাড়তি ব্যয়ের হিসাব।
চাকরির বাজারেও বাড়ছে চাপ
কঠোর অভিবাসন নীতির ফলে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন অভিবাসীর সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হলে শ্রমবাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য এর প্রভাব দুই ধরনের হতে পারে। একদিকে নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রে আসা কঠিন হলে বিদেশ থেকে কর্মী প্রবেশের সুযোগ কমবে। অন্যদিকে ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা কর্মীদের জন্য কিছু খাতে প্রতিযোগিতার চিত্রও পরিবর্তিত হতে পারে।
তবে কমিউনিটির বড় উদ্বেগ হলো—নীতির দ্রুত পরিবর্তনের কারণে চাকরি, পেশা পরিবর্তন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
বাড়ি কেনার স্বপ্নেও বাড়তি চাপ
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য আরেকটি বড় চাপ আবাসন ব্যয়।
৩০ বছরের বাড়ির ঋণের সুদ কিছুটা কমলেও নিউইয়র্ক ও নিউ জার্সির মতো ব্যয়বহুল এলাকায় বাড়ি কেনা এখনো অনেক পরিবারের জন্য বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত।
মাসিক ঋণের কিস্তির সঙ্গে সম্পত্তি কর, বাড়ির বীমা, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য ব্যয় যোগ হওয়ায় অনেক বাংলাদেশি পরিবার বাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছে।
প্রথম প্রজন্মের অভিবাসীদের জন্য চাপ আরও বেশি। একই সঙ্গে সন্তানদের শিক্ষা, যুক্তরাষ্ট্রের জীবনযাত্রার ব্যয় এবং বাংলাদেশে থাকা বাবা-মা ও স্বজনদের সহায়তার দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে অনেক পরিবারকে।
ব্যবসায়ীদের সামনে নতুন হিসাব
বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের জন্যও পরিস্থিতি সহজ নয়।
বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক, বস্ত্র ও অন্যান্য পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে শুল্কের প্রভাব রপ্তানিকারকদের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের ওপরও পড়তে পারে।
আমদানির ব্যয় বাড়লে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে পণ্যের দাম বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। এতে বাংলাদেশি দোকান, পোশাক ব্যবসা, পাইকারি প্রতিষ্ঠান এবং ছোট ব্যবসাগুলোর লাভের পরিমাণ কমে যেতে পারে।
অর্থাৎ ওয়াশিংটনের বাণিজ্যনীতি শুধু বড় কোম্পানির হিসাব বদলায় না; এর প্রভাব পৌঁছে যেতে পারে স্থানীয় বাংলাদেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পর্যন্ত।
দেশে টাকা পাঠানোও বড় অর্থনৈতিক সংযোগ
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশিদের সঙ্গে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পর্কগুলোর একটি হলো রেমিট্যান্স।
প্রবাসীরা নিয়মিত বাংলাদেশে অর্থ পাঠিয়ে পরিবার, বাড়ি নির্মাণ, শিক্ষা, চিকিৎসা ও ব্যবসায় সহায়তা করেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে আয়, কর ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের পরিবর্তনের সঙ্গে দেশের পরিবারগুলোর আর্থিক নিরাপত্তাও জড়িয়ে আছে।
প্রবাসীদের কাছে তাই শুধু কত আয় হচ্ছে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ নয়; সেই আয়ের কতটা নিরাপদে দেশে পাঠানো যাচ্ছে, সেটিও বড় বিষয়।
একদিকে দরজা খুলছে, অন্যদিকে বন্ধ হচ্ছে
সবকিছু মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি কমিউনিটির বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটা এক হাতে স্বস্তি, অন্য হাতে শঙ্কার মতো।
অভিবাসী ভিসা নিয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত পরিবার পুনর্মিলনের অপেক্ষায় থাকা বাংলাদেশিদের আশাবাদী করেছে। কিন্তু একই সময়ে আশ্রয়প্রার্থীদের ভিসা প্রত্যাহারের উদ্যোগ, কঠোর অভিবাসন নীতি, এইচ-১বি আবেদনের সম্ভাব্য বিশাল ব্যয় এবং চাকরির অনিশ্চয়তা নতুন চাপ তৈরি করছে।
এর সঙ্গে বাড়ির উচ্চ খরচ, ব্যবসায় বাড়তি ব্যয় এবং দেশে অর্থ পাঠানোর দায়িত্ব যোগ হওয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের সামনে তৈরি হয়েছে একেবারে নতুন অর্থনৈতিক ও অভিবাসন বাস্তবতা।
বাংলাদেশি কমিউনিটির সামনে এখন বড় প্রশ্ন
যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বাংলাদেশিরা কতটা নিরাপদে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে পারবেন? নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রে আসতে চাওয়া বাংলাদেশিদের জন্য পথ কতটা কঠিন হয়ে উঠবে? আর যারা ইতোমধ্যে এখানে আছেন, তাদের চাকরি, বাড়ি, ব্যবসা ও পরিবারের ওপর নতুন নীতিগুলোর প্রভাব কতটা পড়বে?
যারা বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়ায় রয়েছেন, তাদের জন্য আদালতের সিদ্ধান্ত কিছুটা আশার আলো দেখিয়েছে। যারা আশ্রয়ের ওপর নির্ভর করছেন, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও সতর্কতার। আর যারা উচ্চশিক্ষা শেষে চাকরি কিংবা এইচ-১বি ভিসার মাধ্যমে ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের সামনে বাড়ছে ব্যয় ও নীতিগত অনিশ্চয়তা।
অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশিদের গল্প এখন আর শুধু অভিবাসনের গল্প নয়।
এটি পরিবারের গল্প, চাকরির গল্প, বাড়ির গল্প, ব্যবসার গল্প, শিক্ষার গল্প এবং অর্থনীতির গল্প।
ওয়াশিংটনের প্রতিটি নতুন সিদ্ধান্ত তাই এখন শুধু একটি সরকারি নীতি নয়—তার প্রভাব পৌঁছে যাচ্ছে নিউইয়র্কের একটি বাংলাদেশি পরিবারের বসার ঘরে, পেনসিলভানিয়ার একজন কর্মজীবীর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায়, নিউ জার্সির একজন ব্যবসায়ীর হিসাবের খাতায় এবং বাংলাদেশের একটি পরিবারের মাসিক বাজেটে।
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশিদের সামনে তাই এখন সবচেয়ে বড় বাস্তবতা—কোথাও নতুন আশার দরজা খুলছে, আবার অন্য কোথাও তৈরি হচ্ছে নতুন অনিশ্চয়তার দেয়াল।






