কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস থেকে হারিয়ে গেল নিউ সুইডেন

যুক্তরাষ্ট্রের অন্য সব ইউরোপীয় উপনিবেশের বিপরীতে স্থানীয় আদিবাসীদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল নিউ সুইডেন। ছবি: বিবিসি
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস ঘাটলে সবার আগে সামনে আসে ব্রিটিশ উপনিবেশের কথা। কিন্তু খুব কম মানুষই জানেন, দেশটির জন্মের বহু আগে সেখানে ছিল সুইডেনের একটি ছোট উপনিবেশ। এটি টিকে ছিল মাত্র ১৭ বছর। এই অল্প সময়েও নিউ সুইডেন রেখে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যে স্থায়ী ছাপ।
যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ছোট, সবচেয়ে কম জনবসতিপূর্ণ এবং সবচেয়ে স্বল্পস্থায়ী ইউরোপীয় উপনিবেশ ছিল এটি। বিস্মৃত হলেও ২৫০ বছর আগে দেশটির জন্ম ও বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল এই উপনিবেশ।
ফিলাডেলফিয়ার সিটি হলের ৫০০ ফুট উঁচু পর্যবেক্ষণ ডেকে দাঁড়িয়ে নিচের শহরের দিকে তাকালে দেখা যায় ইতিহাসের একের পর এক স্মৃতিচিহ্ন। সিটি ট্যাভার্ন, যেখানে স্বাধীনতা বিপ্লবের পরিকল্পনা করেছিলেন আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতারা। কার্পেন্টার্স হল, যেখানে প্রথম কন্টিনেন্টাল কংগ্রেসে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল উপনিবেশগুলো। কাছেই ইনডিপেনডেন্স হল, যেখানে স্বাক্ষরিত হয় ১৭৮৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান।
কিন্তু খুব কম মানুষই জানেন, এই ঐতিহাসিক এলাকাই একসময় ছিল সুইডেনের একটি ছোট উপনিবেশের অংশ।
বেশির ভাগ আমেরিকান মনে করেন, ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র স্বাক্ষরের মধ্য দিয়েই যাত্রা শুরু যুক্তরাষ্ট্রের। এ বছর দেশটির স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশাল আয়োজন করা হয়েছে ফিলাডেলফিয়ায়। আশা করা হচ্ছে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের সমাগমের।
তবে এই উৎসবে অংশ নেওয়া অধিকাংশ মানুষই জানেন না, আমেরিকার রাজনৈতিক ও আদর্শিক সূতিকাগার একসময় ছিল নয়া সুইরিয়ে বা নিউ সুইডেন নামে পরিচিত একটি সুইডিশ উপনিবেশ।
১৬৩৮ থেকে ১৬৫৫ সাল পর্যন্ত নিউ সুইডেন বিস্তৃত ছিল বর্তমান নিউ জার্সি, পেনসিলভানিয়া, ডেলাওয়্যার ও মেরিল্যান্ডের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে। এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ছোট, সবচেয়ে কম জনবসতিপূর্ণ এবং সবচেয়ে স্বল্পস্থায়ী ইউরোপীয় উপনিবেশ। একই সঙ্গে এটি ছিল সবচেয়ে গোপনীয় উপনিবেশগুলোর একটি।
ডেলাওয়্যার ভ্যালির ঔপনিবেশিক ইতিহাস নিয়ে কাজ করেন নিউ সুইডেন সেন্টারের বোর্ড সদস্য ডেবোরাহ জিন হফম্যান। তার ভাষ্য, ফরাসি বা স্প্যানিশদের মতো প্রকাশ্যে পতাকা গেড়ে উপনিবেশ স্থাপন করেনি সুইডিশরা। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ডাচদের চোখ এড়িয়ে গোপনে একটি উপনিবেশ গড়ে তোলা।
মাত্র ১৭ বছর টিকে থাকলেও নিউ সুইডেন পরবর্তী সময়ে গভীর প্রভাব ফেলে যুক্তরাষ্ট্রের সংস্কৃতি ও সমাজে। প্রথম আমেরিকায় কাঠের গোলাঘর বা লগ কেবিন নির্মাণের প্রচলন করেন সুইডিশ বসতির মানুষই। যা পরে প্রতীক হয়ে ওঠে সীমান্ত অঞ্চলের। তারাই লুথেরান খ্রিস্টধর্ম নিয়ে আসেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের উপনিবেশগুলোতে সূচনা করেন অন্যতম প্রাচীন বেসামরিক রাজনৈতিক আন্দোলনেরও।
প্রতিশোধের পরিকল্পনা থেকে উপনিবেশ
১৬৩৭ সালে সুইডিশ রাজদরবারের কাছে একটি নতুন উপনিবেশ স্থাপনের প্রস্তাব দেন নিউ নেদারল্যান্ডের সাবেক গভর্নর পিটার মিনুইট। তিনি আগে ডাচদের হয়ে কিনেছিলেন ম্যানহাটন দ্বীপ। পরে চাকরি হারানোর পর ডাচদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে সহযোগিতা চান সুইডেনের।
হফম্যান বলেছেন, ইউরোপের বড় শক্তিগুলোর মধ্যে একমাত্র সুইডেনেরই কোনো উপনিবেশ নেই বলে সুইডিশদের বোঝান মিনুইট। একই সঙ্গে তিনি আরও জানান, ডেলাওয়্যার নদীর আশপাশে এমন একটি এলাকা রয়েছে, যেখানে সহজেই নিজেদের অবস্থান গড়ে তুলতে পারে সুইডেন।
১৬৩৭ সালের ডিসেম্বরে মিনুইট দুটি জাহাজে ২৫ জন বসতিস্থাপনকারী নিয়ে যাত্রা করেন সুইডেনের গথেনবার্গ থেকে। চার মাস পর তারা বর্তমান ডেলাওয়্যারের উইলমিংটনের কাছে নোঙর ফেলেন এবং একটি দুর্গ নির্মাণ করেন ফোর্ট ক্রিস্টিনা নামে। এটি ছিল ডেলাওয়্যার উপত্যকার প্রথম স্থায়ী ইউরোপীয় বসতি।
আদিবাসীদের সহযোগিতায় টিকে থাকা
নিউ সুইডেন প্রতিষ্ঠার মাত্র পাঁচ মাস পরই ক্যারিবীয় অঞ্চলে এক ঘূর্ণিঝড়ে মারা যান মিনুইট। তার রেখে যাওয়া ছোট্ট বসতিটি হয়তো প্রথম শীতই পার করতে পারত না আদিবাসীদের সহযোগিতা ছাড়া।
হফম্যানের ভাষ্য, স্থানীয় আদিবাসীদের সম্মান করত এবং শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখত সুইডিশরা। এ কারণে তাদের সঙ্গে বাণিজ্য যেমন সম্ভব হয়েছিল, তেমনি টিকে থাকা সহজ হয় কঠিন সময়েও।
তিনি আরও জানান, উপনিবেশটির প্রায় ৮০ শতাংশ বাসিন্দাই ছিলেন ফরেস্ট ফিন বা ফিনল্যান্ডের বংশোদ্ভূত একটি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। সে সময় সুইডেনের অংশ ছিল ফিনল্যান্ড। বনাঞ্চলে বসবাস ও প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারে অভিজ্ঞ ছিলেন তারা।
বিদ্রোহ, পতন ও উত্তরাধিকার
১৬৪৩ সালে গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেন জোহান প্রিন্টজ। তার নেতৃত্বে উপনিবেশটি বিস্তৃত হলেও কখনো ৪০০ জনের বেশি হয়নি জনসংখ্যা। পর্যাপ্ত জনবল ও রসদের অভাবে দুর্বলই থেকে যায় উপনিবেশটি।
১৬৫৩ সালে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তুলে উপনিবেশের এক-চতুর্থাংশ পুরুষ বাসিন্দা আবেদন করেন তার বিরুদ্ধে। পরে পদত্যাগ করেন তিনি।
ইতিহাসবিদদের মতে, এটি ছিল উত্তর আমেরিকার উপনিবেশগুলোর অন্যতম প্রাচীন সফল রাজনৈতিক প্রতিবাদ।
১৬৫৫ সালে ডাচ গভর্নর পিটার স্টাইভেস্যান্ট সাতটি সশস্ত্র জাহাজ নিয়ে দখল করেন নিউ সুইডেন। কোনো যুদ্ধ ছাড়াই আত্মসমর্পণ করে সুইডিশরা। এরপর নিউ সুইডেন ডাচ উপনিবেশে অন্তর্ভুক্ত হলেও সুইডিশদের নিজস্ব প্রশাসন, মিলিশিয়া ও জমির অধিকার বহাল থাকে।
আজও রয়ে গেছে ইতিহাসের ছাপ
বর্তমানে নিউ সুইডেনের অসংখ্য স্মৃতি ছড়িয়ে আছে ডেলাওয়্যার উপত্যকার বিভিন্ন স্থানে।
এখনো সুইডিশদের প্রথম অবতরণস্থল সংরক্ষিত রয়েছে ডেলাওয়্যারের ফোর্ট ক্রিস্টিনা পার্কে। সেখানে কালমার নিকেল নামের ঐতিহাসিক জাহাজের প্রতিরূপ প্রদর্শিত হয় পর্যটকদের জন্য।
১৬৯৮ সালে নির্মিত উইলমিংটনের ওল্ড সুইডস চার্চ। এটি নতুন বিশ্বের প্রথম লুথেরান গির্জা হিসেবে পরিচিত। এখানেই সমাধিস্থ হয়েছেন নিউ সুইডেনের বহু প্রাচীন সুইডিশ ও ফিনিশ বসতি স্থাপনকারী।
ফিলাডেলফিয়ার আমেরিকান সুইডিশ হিস্টোরিক্যাল মিউজিয়ামে প্রায় ৪০০ বছরের সুইডিশ ও ফিনিশ অভিবাসনের ইতিহাস আছে সংরক্ষিত। এখানকার নির্বাহী পরিচালক ট্রেসি বেক বলেছেন, নিউ সুইডেনের বংশধর জন মর্টনই স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের পক্ষে দিয়েছিলেন পেনসিলভানিয়ার নির্ধারণী ভোট।
ইতিহাসবিদদের মতে, নিউ সুইডেন হয়তো টিকে ছিল খুব অল্প সময়ের জন্য। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সংস্কৃতি, স্থাপত্য, ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং রাজনৈতিক ইতিহাসে এর অবদান আজও গভীরভাবে বিদ্যমান। অথচ ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সম্পর্কে এখনো খুব কম মানুষই অবগত।
সূত্র: বিবিসি








