ফ্লোরিডায় নতুন নির্বাচনী লড়াই
রিপাবলিকানদের ঘরেই কিউবান ভোট?

কিউবান-আমেরিকানদের রিপাবলিকান সমর্থনের পেছনে রয়েছে কয়েক দশকের রাজনৈতিক ইতিহাস।
এক কাপ মিষ্টি কিউবান কফি, দরজায় কড়া নাড়া আর সঙ্গে ভোটের বার্তা—দক্ষিণ ফ্লোরিডায় শুরু হয়েছে মধ্যবর্তী নির্বাচনের নতুন রাজনৈতিক যুদ্ধ। প্রায় ১৯ লাখ কিউবান-আমেরিকান ভোটারের রাজ্য ফ্লোরিডায় রিপাবলিকানদের বহু বছরের শক্ত ঘাঁটি এখন ডেমোক্র্যাটদেরও টার্গেট। তবে অভিবাসন নিয়ে অসন্তোষ ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের আলোচনা থাকলেও কিউবান-আমেরিকান ভোট এখনই রিপাবলিকান শিবির ছাড়ছে না—এমনটাই বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
মিয়ামি-ডেড কাউন্টিতে একাই প্রায় ৯ লাখ কিউবান-আমেরিকান বসবাস করেন। কয়েক দশক ধরে তাদের বড় অংশ রিপাবলিকানদের সমর্থন করে আসছেন। কিন্তু গত ডিসেম্বরে প্রায় ২৮ বছর পর মিয়ামিতে একজন ডেমোক্র্যাট মেয়র নির্বাচিত হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—ফ্লোরিডার কিউবান ভোটব্যাংকেও কি পরিবর্তনের ঢেউ আসছে?
বিশ্লেষকদের মতে, এখনই সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় আসেনি।
রিগ্যান থেকে ট্রাম্প—দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্ক
কিউবান-আমেরিকানদের রিপাবলিকান সমর্থনের পেছনে রয়েছে কয়েক দশকের রাজনৈতিক ইতিহাস। ১৯৫০-এর দশকে কিউবান বিপ্লবের পর বিভিন্ন সময়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসেন। রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, অর্থনৈতিক সংকট ও অস্থিরতা থেকে পালিয়ে আসা অনেক পরিবার কিউবার সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার কঠোর সমালোচকে পরিণত হয়।
ফ্লোরিডা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানী গিলের্মো গ্রেনিয়ের মনে করেন, কিউবান-আমেরিকানরা স্বাভাবিকভাবেই রিপাবলিকান হয়ে যায়নি। বরং ১৯৮০-এর দশকে রোনাল্ড রিগ্যানের সময় রিপাবলিকানরা কিউবান ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়িয়ে শক্ত রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করে।
তার বিশ্লেষণে, কিউবা বিষয়ে কঠোর কমিউনিজমবিরোধী অবস্থান এবং কিউবান-আমেরিকানদের রাজনৈতিক উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়াই রিপাবলিকানদের দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা এনে দেয়।
‘কিউবানদের দল’—ধারণাটাই কি সবচেয়ে বড় শক্তি?
গ্রেনিয়েরের ভাষায়, মিয়ামি-ডেডে একটি দীর্ঘ সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে রিপাবলিকান পরিচয় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে। নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রে আসা কিউবানদের মধ্যেও অনেকেই শুনতে পান—রিপাবলিকান পার্টিই কিউবানদের দল।
এ কারণেই ডেমোক্র্যাটদের জন্য এই ভোটব্যাংকে বড় পরিবর্তন আনা কঠিন হয়ে উঠেছে।
এলিয়ান গনজালেসের ঘটনা এখনো রাজনৈতিক স্মৃতিতে
কিউবান-আমেরিকানদের সঙ্গে ডেমোক্র্যাটদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ১৯৯৯ সালের এলিয়ান গনজালেস ঘটনা একটি বড় বাঁক হিসেবে বিবেচিত হয়।
পাঁচ বছর বয়সী এলিয়ানকে ফ্লোরিডার উপকূল থেকে উদ্ধারের পর তাকে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা আত্মীয়দের কাছ থেকে সরিয়ে বাবার কাছে কিউবায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত কিউবান-আমেরিকানদের একটি বড় অংশের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের প্রতি ক্ষোভ তৈরি করে।
এর দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রভাব ২০০০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময়ও আলোচনায় আসে। ফ্লোরিডার মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটলগ্রাউন্ড রাজ্যে কিউবান ভোটের গুরুত্ব তখন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ডেমোক্র্যাটদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ
গ্রেনিয়েরের মতে, ডেমোক্র্যাটদের অন্যতম সমস্যা হলো—তারা কিউবান-আমেরিকানদের জন্য রিপাবলিকানদের বাইরে যথেষ্ট আকর্ষণীয় রাজনৈতিক বিকল্প তৈরি করতে পারেনি।
অন্যদিকে মিয়ামি-ডেড রিপাবলিকান পার্টির চেয়ারম্যান কেভিন কুপার মনে করেন, প্রতিটি নির্বাচনের আগে কিউবান ভোটাররা রিপাবলিকানদের ছেড়ে যাচ্ছে—এমন আলোচনা তৈরি হয়। কিন্তু ভোটের দিন ফলাফল ভিন্ন চিত্র দেখায়।
কফির কাপেও ভোটের হিসাব
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে রিপাবলিকান প্রার্থীরা মিয়ামি-ডেডে ঘরে ঘরে প্রচারণা চালাচ্ছেন। ভোটারদের দরজায় গিয়ে প্রচারপত্রের পাশাপাশি দেওয়া হচ্ছে কিউবানদের জনপ্রিয় মিষ্টি এসপ্রেসোর ছোট কাপ।
রাজনীতির ভাষায় এটি শুধু কফি নয়—সম্পর্ক তৈরির কৌশল। দরজায় কফির কাপ পৌঁছালে শুরু হচ্ছে কথোপকথন, সেখানেই প্রার্থী তুলে ধরছেন তার নীতি, কাজ ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি।
কুপারের বক্তব্য, কিউবান-আমেরিকান ভোট কোনো দলের ‘স্থায়ী সম্পত্তি’ নয়; প্রতিটি নির্বাচনে তাদের আস্থা অর্জন করতে হয়। নীতি, কাজ, ফলাফল এবং ভোটারদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমেই সেই আস্থা ধরে রাখতে চায় রিপাবলিকানরা।
সামনে বড় পরীক্ষা
ফ্লোরিডার ১৮ আগস্টের প্রাইমারি এবং নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচন তাই কেবল প্রার্থী বাছাইয়ের লড়াই নয়—দক্ষিণ ফ্লোরিডার কিউবান-আমেরিকান ভোটব্যাংকের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশও অনেকটা স্পষ্ট করতে পারে।
অভিবাসন, মূল্যস্ফীতি, আবাসন ব্যয় ও নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক চিন্তা—সবকিছু মিলিয়ে ভোটারদের মনোভাব বদলানোর সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে এখন পর্যন্ত রিপাবলিকানদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পর্কই সবচেয়ে বড় সুবিধা।
মিয়ামির কিউবান ভোটব্যাংক তাই ২০২৬-এর নির্বাচনে শুধু একটি ভোটগোষ্ঠী নয়—ফ্লোরিডার ক্ষমতার সমীকরণে সম্ভাব্য ‘গেমচেঞ্জার’।






