যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল নির্বাচন আজ!
- ১২ বিলিয়ন ডলারের লড়াইয়ে মাস্ক-সরোস-ব্লুমবার্গ
- রেকর্ড অর্থ ব্যয়ে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণের লড়াই

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে আজ মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর)। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নির্ধারণে দেশ জুড়ে ভোট দিচ্ছেন লাখো ভোটার। তবে এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি হলো অর্থের বিশাল প্রতিযোগিতা। নির্বাচনী প্রচার, রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন, প্রার্থীদের প্রচার তহবিল এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যয় মিলিয়ে এবারের নির্বাচনী ব্যয় প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা।
এই নির্বাচনে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট— দুই দলই বড় ব্যবসায়ী, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী এবং ধনকুবেরদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ পেয়েছে। ইলন মাস্ক, জর্জ সরোস, মাইকেল ব্লুমবার্গ, জেফ ইয়াসসহ বিশ্বের অন্যতম ধনী ব্যক্তিরা সরাসরি কিংবা বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের মাধ্যমে নির্বাচনী অর্থায়নে যুক্ত হয়েছেন।
এবারের নির্বাচন তাই শুধু ভোটের প্রতিযোগিতা নয়, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক প্রভাবেরও বড় পরীক্ষা।
মাস্ক একাই দিয়েছেন ৪৪৬ মিলিয়ন ডলার
নির্বাচনী অর্থায়নে সবচেয়ে আলোচিত নাম বিশ্বের শীর্ষ ধনকুবের ও টেসলা-স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক। এবারের নির্বাচনী চক্রে রিপাবলিকানপন্থী রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকে প্রায় ৪৪৬ মিলিয়ন ডলার দিয়েছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে কোনো ব্যক্তির একক নির্বাচনী অর্থায়নের ক্ষেত্রে এটি অন্যতম বড় অঙ্ক।
মাস্কের অর্থের বড় অংশ গেছে আমেরিকা পিএসি, সিনেট লিডারশিপ ফান্ড এবং কংগ্রেশনাল লিডারশিপ ফান্ডের মতো সংগঠনে। এসব সংগঠন রিপাবলিকানদের কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার প্রচারে কাজ করছে। টেক্সাসের সিনেট নির্বাচনেও রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে মাস্কের বড় অঙ্কের অর্থায়ন আলোচনায় এসেছে।
রিপাবলিকানদের পক্ষে অর্থ দেওয়া অন্য শীর্ষ ধনীদের মধ্যে রয়েছেন ইউলাইনের প্রতিষ্ঠাতা এলিজাবেথ ও রিচার্ড ইউহলিন। এ দম্পতি দিয়েছেন প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ডলার। বিনিয়োগকারী জেফ ইয়াস ও তার স্ত্রী জ্যানিন ইয়াসের অবদান প্রায় ১১০ মিলিয়ন ডলার।
এ ছাড়া প্রযুক্তি বিনিয়োগকারী বেন হরোউইটজ ও মার্ক অ্যান্ড্রিসেনের সম্মিলিত অবদান প্রায় ৯২ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার। ক্যাসিনো ব্যবসায়ী ও চিকিৎসক মিরিয়াম অ্যাডেলসনের অবদান প্রায় ৬৭ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার। রিপাবলিকানপন্থী সংগঠন ওয়ান নেশানের অর্থায়ন প্রায় ১৩৩ মিলিয়ন ডলার এবং আমেরিকান অ্যাকশন নেটওয়ার্কের অবদান প্রায় ৬৪ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার।
ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে সরোস-ব্লুমবার্গের অর্থায়ন
ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী অর্থায়নে অন্যতম প্রধান ব্যক্তি বিনিয়োগকারী জর্জ সরোস। তার পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক তহবিল থেকে প্রায় ১০২ মিলিয়ন ডলার এসেছে ডেমোক্র্যাটপন্থী সংগঠনগুলোর জন্য।
নিউ ইয়র্কের সাবেক মেয়র ও ব্লুমবার্গের প্রতিষ্ঠাতা মাইকেল ব্লুমবার্গ দিয়েছেন প্রায় ৮৪ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলার। লিংকডইনের সহপ্রতিষ্ঠাতা রিড হফম্যান ও তার স্ত্রী মিশেল ইয়ের সম্মিলিত অবদান প্রায় ৪১ মিলিয়ন ডলার।
এ ছাড়া ডেমোক্র্যাটপন্থী সংগঠন মেজরিটি ফরোয়ার্ড প্রায় ১০২ মিলিয়ন ডলার এবং হাউজ মেজরিটি ফরোয়ার্ড প্রায় ৯৩ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার পেয়েছে। ইকোনমিক অপরচুনিটি ফান্ডও বড় অঙ্কের অর্থায়ন করেছে।
ক্রিপ্টো কোম্পানি ও প্রযুক্তি খাতের শত শত মিলিয়ন ডলার
এবারের নির্বাচনে ক্রিপ্টোকারেন্সি শিল্পও বড় অর্থদাতা হিসেবে সামনে এসেছে। কয়েনবেইস প্রায় ৫৭ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলার এবং রিপল প্রায় ৬৯ মিলিয়ন ডলার দিয়েছে বলে নির্বাচনী অর্থায়নের বিভিন্ন হিসাবে উঠে এসেছে। এ ছাড়া ক্রিপ্টো উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারী ক্যামেরন ও টাইলার উইঙ্কলভসের সম্মিলিত অবদান প্রায় ৫৫ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার।
প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ খাতের বড় অর্থদাতাদের মধ্যে রয়েছেন বেন হরোউইটজ, মার্ক অ্যান্ড্রিসেন এবং জেফ ইয়াস। এসব অর্থের একটি বড় অংশ বিভিন্ন সুপার পিএসি ও রাজনৈতিক সংগঠনের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারে ব্যবহৃত হচ্ছে।
কেন ১২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে?
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ব্যবস্থায় সুপার পিএসি বড় অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করেছে। সাধারণ প্রার্থীকে সরাসরি অনুদানের ক্ষেত্রে আইনি সীমা থাকলেও সুপার পিএসি নির্দিষ্ট শর্তে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সীমাহীন অর্থ সংগ্রহ করতে পারে।
এসব সংগঠন প্রার্থীর প্রচার কমিটির সঙ্গে সমন্বয় না করে স্বাধীনভাবে টেলিভিশন বিজ্ঞাপন, ডিজিটাল প্রচার, প্রচারপত্র ও ভোটারদের কাছে বার্তা পৌঁছানোর কাজে অর্থ ব্যয় করতে পারে।
২০২৬ সালের নির্বাচনী চক্রে মোট ব্যয় প্রায় ১১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এর মধ্যে শুধু রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনের ব্যয়ই প্রায় ১১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। ফলে এবারের নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরিণত হয়েছে।
অর্থের লড়াইয়ে কোন দল কতটা এগিয়ে?
নির্বাচনের শীর্ষ ৫০ ব্যক্তি ও সংগঠনের সম্মিলিত অবদান প্রায় ২ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে রিপাবলিকানপন্থী অর্থদাতাদের অবদান ১ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার। ডেমোক্র্যাটপন্থীরা পেয়েছে ৮৩২ মিলিয়ন ডলার। বাকি অর্থ এসেছে দুই দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বা বিশেষ স্বার্থসংশ্লিষ্ট অর্থদাতাদের কাছ থেকে।
এই বিপুল অর্থের ব্যবহার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক বিতর্কও রয়েছে। সমালোচকদের মতে, অল্পসংখ্যক ধনকুবেরের বিপুল অর্থায়ন নির্বাচনী প্রচার ও নীতিনির্ধারণে তাদের প্রভাব বাড়াতে পারে। অন্যদিকে বড় রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর যুক্তি, নির্বাচনী প্রচার চালানো, ভোটারদের কাছে তথ্য পৌঁছানো এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে অর্থ প্রয়োজন।
আজকের নির্বাচনে ভোটাররা ঠিক করবেন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে। কিন্তু নির্বাচনের আগে অর্থের যে বিশাল প্রতিযোগিতা হয়েছে, তা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ধনকুবের, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।



