ইরান যুদ্ধে ট্রাম্প যে ‘একটি’ ভুল করেননি

ছবি: রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান নিয়ে বর্তমান সংকট থেকে বের হওয়ার কোনো পথ খুঁজে না পেলে, ইতিহাস একসময় এই যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্তকে তার প্রেসিডেন্সির সবচেয়ে বড় ভুল হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত তিনি একটি সম্ভাব্য ভয়াবহ ভুল করেননি। আর সেটি হলো, সংঘাতকে এমনভাবে ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে তোলা, যা শেষ পর্যন্ত তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
ইতিহাস দেখায়, প্রেসিডেন্টরা যখন যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজতে, নিজেদের রাজনৈতিক মর্যাদা রক্ষা করতে কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখতে সংঘাত বাড়ান, তখন তারা ধীরে ধীরে এমন এক পথে চলে যান, যেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন।
ভিয়েতনাম, ইরাক ও আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে তারা অনেক সময় অনিচ্ছা সত্ত্বেও সেই পথে এগিয়েছিলেন— এমন যুদ্ধে, যেগুলো শেষ পর্যন্ত আর জেতা সম্ভব ছিল না।
এবারও ট্রাম্প নিজেকে এমন এক তিনমুখী মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখছেন। ইরান আত্মসমর্পণ বা অর্থবহ আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানানোয় যুদ্ধের গতিপথ এখন তার হাতেও পুরোপুরি নেই।
একদিকে, কূটনীতি বারবার ব্যর্থ হলে কি তিনি বিমান হামলা, ভঙুর যুদ্ধবিরতি এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামুদ্রিক অবরোধের এই অনিশ্চিত অভিযান অনির্দিষ্টকাল চালিয়ে যাবেন?
অন্যদিকে, তিনি কি নিজের আরোপ করা সীমা তুলে নিয়ে অভিযান আরও বাড়াবেন? শুধু সামরিক লক্ষ্য নয়, ইরানের বেসামরিক স্থাপনা ও অবকাঠামোতেও হামলা চালাবেন? এমনকি সীমিত আকারে স্থলসেনা পাঠানোর মতো ঝুঁকিও নেবেন?
তৃতীয় পথটি আরও বেদনাদায়ক— ক্ষয়ক্ষতি মেনে নিয়ে সংঘাত থেকে সরে আসা এবং বড় লক্ষ্যগুলো পূরণ না করেই যুদ্ধ শেষ করা।
প্রতিটি পথই রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে অস্বস্তিকর। আর এ কারণেই ট্রাম্প এমন এক যুদ্ধে আটকে আছেন, যা তিনি জিততে পারবেন না, আবার হারতেও পারবেন না।
পরিস্থিতির গভীরতা বোঝা যায় এ ঘটনা থেকে যে, ইরানকে কীভাবে শাস্তি দেওয়া যায়— এ নিয়ে নতুন কৌশল চেয়ে পেন্টাগন একদল সামরিক বিশ্লেষকের কাছে মতামত চেয়েছে বলে জানিয়েছে সিএনএন।
ইরানকে ‘শিরশ্ছেদের’ হুমকি ট্রাম্পের
ইরান তার সর্বশেষ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পর সোমবার ট্রাম্পের হতাশা প্রকাশ পেয়েছে তার ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টে। সপ্তাহান্তে তিনি ইরানে ভয়াবহ হামলার ঘোষণা স্থগিত করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি আবারও বলেছিলেন, একটি চুক্তি খুব শিগগিরই হতে পারে।
‘ইরানের নেতৃত্ব অবিশ্বাস্যভাবে প্রতারণাপূর্ণ!’—লিখেছেন ট্রাম্প। বিকালের দিকে আবারও হুমকির সুরে বলেন, ‘এটি তাদের জন্য ভালো একটি নথিতে সই করার শেষ সুযোগ।’
তবে ইরানের নেতৃত্বকে ‘শিরশ্ছেদ’ করার যে হুমকি তিনি দিয়েছেন, তা নতুন প্রশ্নও তৈরি করেছে।
ইরান আবারও তাকে উপেক্ষা করলে ট্রাম্প কী করবেন?
বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ট্রাম্পের জন্য বড় ঝুঁকি হবে। কারণ, ইরানকে বোমা মেরে আলোচনায় ফিরিয়ে আনার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
ইরানের সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অন্যান্য অবকাঠামোয় হামলা হলে তেহরান পাল্টা যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্রদের ভূখণ্ডে একই ধরনের স্থাপনায় হামলা চালাতে পারে। এতে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ক্ষতি আরও গভীর হবে।
সপ্তাহান্তে আঞ্চলিক নেতারা ট্রাম্পের কাছে এমন পরিস্থিতির আশঙ্কাই তুলে ধরেছেন বলে মনে হচ্ছে। ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমরা হামলার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ছিলাম। এরপর তারা ফোন করল। সৌদি আরবও ফোন করল। সংযুক্ত আরব আমিরাত ফোন করল। কাতারও ফোন করল।’
তাত্ত্বিকভাবে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ব্যবহার করে জোরপূর্বক হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে পারেন। কিন্তু এতে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়বে।
ইরানের তেল রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র খার্গ দ্বীপে স্থল অভিযান চালানো কিংবা হরমুজ প্রণালি থেকে ইরানি বাহিনীকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা রক্তক্ষয়ী হতে পারে।
গত ৬০ বছরের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, বিমান যুদ্ধ যখন স্থলযুদ্ধে রূপ নেয়, তখন ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে বসে থাকা মানুষের কাছেও তখন যুদ্ধের চিত্র বদলে যায়। হতাহতের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক মূল্যও বাড়ে। আর নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ আগে ট্রাম্পের জন্য এটি বড় ঝুঁকি।
যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজতে গিয়ে মার্কিন সেনারা মারা গেলে সেই আত্মত্যাগকে ব্যর্থ হিসেবে দেখানো রাজনৈতিকভাবে কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে উল্টো তাদের মৃত্যুই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এর আগে অনেক মার্কিন প্রেসিডেন্টই ট্রাম্পের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। ভিয়েতনাম, ইরাক, আফগানিস্তান কিংবা ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ— প্রতিটির শুরু ভিন্ন হলেও শেষ পর্যন্ত তাদের সামনে একই প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে: খারাপ পরিস্থিতি মেনে নেওয়া, যুদ্ধ বাড়ানো, নাকি সরে যাওয়া। আর কোনো প্রেসিডেন্টই এমন যুদ্ধ হারার দায় নিয়ে ইতিহাসে স্মরণীয় হতে চান না।
জনসন ও বুশ কীভাবে সেই ফাঁদে পড়েছিলেন
১৯৬৫ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি. জনসন তার পূর্বসূরি জন এফ. কেনেডির কাছ থেকে পাওয়া ভিয়েতনাম যুদ্ধ আরও বাড়াবেন কি না, তা নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন।
তখন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্ট ম্যাকনামারাকে তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা তাদের ওপর বোমা হামলা শুরু করতে যাচ্ছি; সেই বাধা আমরা পার হয়ে যাচ্ছি।’ একই সঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘হারার চেয়ে খারাপ কিছু হবে বলে মনে হয় না। আর জেতার কোনো পথও আমি দেখছি না।’
তারপরও জনসন ‘অপারেশন রোলিং থান্ডার’ শুরু করেন। উত্তর ভিয়েতনামে বোমা হামলা বাড়ানো হয় এবং আরও হাজার হাজার তরুণ মার্কিন সেনাকে যুদ্ধে পাঠানো হয়।
তখন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব জর্জ বল সতর্ক করেছিলেন। এক স্মারকলিপিতে তিনি লিখেছিলেন, মার্কিন সেনাদের হতাহত শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র এমন এক ‘প্রায় অপরিবর্তনীয় প্রক্রিয়ায়’ আটকে পড়বে, যেখান থেকে লক্ষ্য অর্জন না করে সরে এলে ‘জাতীয় অপমান’ হবে।
যে পরিণতির আশঙ্কা তিনি করেছিলেন, তা এড়ানোর পথ হিসেবে বল যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্বকে আরও বড় ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে একটি সমঝোতার পথ তৈরির পরামর্শ দিয়েছিলেন।
ভিয়েতনাম যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত জনসনের দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ার আশা নষ্ট করে দেয়। ১৯৬৮ সালের নির্বাচনে জিতে রিচার্ড নিক্সন যুদ্ধের দায়িত্ব নেন।
অনেক ইতিহাসবিদের মতে, নিক্সন ও তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার তখনই বুঝে গিয়েছিলেন যে যুদ্ধ জেতা সম্ভব নয়। কিন্তু তারা যুদ্ধ চালিয়ে যান—প্রত্যাহারের শর্ত নিজেদের মতো করে তৈরি করা, কমিউনিস্টবিরোধী দক্ষিণ ভিয়েতনামকে শক্তিশালী করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয়ের ধারণা এড়ানোর আশায়।
১৯৭০ সালে নিক্সন কম্বোডিয়ায় যুদ্ধ সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্র যদি ‘অসহায় দৈত্যের’ মতো আচরণ করে, তাহলে বিশ্ব জুড়ে স্বৈরতন্ত্র ও নৈরাজ্যের শক্তি মুক্ত দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে হুমকির মুখে ফেলবে।
নিক্সনের প্রেসিডেন্সির সময় ভিয়েতনামে ২০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা নিহত হন। ১৯৭৩ সালে শেষ মার্কিন যুদ্ধসেনা ভিয়েতনাম ছাড়ে। ১৯৭৫ সালে প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডের সময় সাইগন পতনের মধ্যে দিয়ে শেষ মার্কিন কর্মীদেরও সরিয়ে নেওয়া হয়।
এর ৩০ বছরেরও বেশি সময় পর প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশও একই ধরনের সিদ্ধান্তের মুখে পড়েন। ২০০৭ সালে তিনি ইরাকে যুদ্ধের ভুলের দায় স্বীকার করলেও সতর্ক করে বলেছিলেন, ইরাকে ব্যর্থতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘বিপর্যয়’ হবে। তিনি ইরাকি বাহিনীকে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহায়তা করতে আরও হাজার হাজার সেনা পাঠানোর ঘোষণা দেন।
সেই অভিযান নিয়ে ইতিহাস এখনো চূড়ান্ত রায় দেয়নি। কিছু এলাকায় বিদ্রোহ দমনে অভিযান কার্যকর হয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের প্রাণহানি শেষ পর্যন্ত সার্থক ছিল কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই গেছে। কারণ শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইরাক থেকে পুরোপুরি সেনা প্রত্যাহার করে।
প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আমেরিকার দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধগুলো শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন। কিন্তু ৯/১১ হামলার আট বছর পর, যা যুক্তরাষ্ট্রকে আফগানিস্তানে যুদ্ধে জড়িয়েছিল, তিনি তালেবানের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে এবং আল-কায়েদাকে পরাজিত করতে আরও সেনা পাঠানোর ঘোষণা দেন।
জনসন, নিক্সন ও বুশকে যে উত্তেজনা বাড়ানোর ফাঁদে পড়তে হয়েছিল, সেটি মাথায় রেখে ওবামা ২০১১ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে সেনা প্রত্যাহার শুরুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সমালোচকদের মতে, নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুরা শুধু অপেক্ষা করে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল।
যে যুদ্ধের সমালোচনা করেই ক্ষমতায় এসেছিলেন ট্রাম্প
আমেরিকার আধুনিক সময়ের দীর্ঘ ও জটিল যুদ্ধগুলোই ট্রাম্পের কঠোর সমালোচনার অন্যতম ভিত্তি ছিল। ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার চার দিন আগে তিনি ‘যে যুদ্ধ কখনো শেষ হয় না, যে যুদ্ধ আমরা কখনো জিতি না’— এমন যুদ্ধের সমালোচনা করেছিলেন।
কিন্তু প্রথম মেয়াদেই ট্রাম্প আফগানিস্তানে আরও সেনা পাঠিয়েছিলেন, যুদ্ধ শেষ করার আশায়।
তখন তিনি বলেছিলেন, ‘আমার প্রথম প্রবৃত্তি ছিল সরে আসা—আর ঐতিহাসিকভাবেই আমি নিজের প্রবৃত্তি অনুসরণ করতে পছন্দ করি।’
তিন বছরেরও কম সময় পর তিনি তার প্রথম প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিসকে সেই সিদ্ধান্তের জন্য দায়ী করেন। ট্রাম্প বলেন, ‘আমি তাকে অল্প সময়ের জন্য আরও লোক দিয়েছিলাম, কিন্তু সেটি কাজ করেনি।’
এখন ট্রাম্প আবারও সেই নিঃসঙ্গ সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হয়েছেন, যার কথা তিনি ২০১৭ সালে আফগানিস্তান নিয়ে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বলেছিলেন: ‘সারা জীবন আমি শুনেছি, ওভাল অফিসের ডেস্কের পেছনে বসলে সিদ্ধান্তগুলো কতটা ভিন্ন হয়ে যায়।’
ইরান যুদ্ধ বুশের যুদ্ধ নয়। এটি ট্রাম্পের নিজের যুদ্ধ। আর এই যুদ্ধই শুধু তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নয়, হোয়াইট হাউজের বাইরের অসংখ্য মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎও নির্ধারণ করতে পারে।
সূত্র : সিএনএন









