যুক্তরাষ্ট্রে কেন চালু হয়েছিল মধ্যবর্তী নির্বাচন
- অধিকাংশ সময় কেন প্রেসিডেন্টের দল হেরে যায়

ভোটকেন্দ্রে ব্যালট পূরণ করছেন কয়েকজন তরুণ। ফাইল ছবি/ রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় মধ্যবর্তী নির্বাচন বা ‘মিডটার্ম ইলেকশন’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। প্রতি চার বছর পরপর দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও তার ঠিক দুই বছর পর হয় মধ্যবর্তী নির্বাচন।
এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ভোটাররা শুধু কংগ্রেসের প্রতিনিধি নির্বাচন করেন না, বরং প্রেসিডেন্টের প্রথম দুই বছরের শাসন, নীতি, জনপ্রিয়তা এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেরও এক ধরনের মূল্যায়ন করেন। ফলে মার্কিন রাজনীতিতে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনেক সময় প্রেসিডেন্টের জন্য জনপ্রিয়তার পরীক্ষা এবং বিরোধী দলের জন্য ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেওয়ার বড় সুযোগ হয়ে ওঠে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের ধারণার শিকড় যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান প্রণয়নের সময়েই নিহিত। ১৭৮৭ সালে ফিলাডেলফিয়ায় সংবিধান প্রণেতারা এমন একটি শাসনব্যবস্থা তৈরি করতে চেয়েছিলেন, যেখানে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা কোনো এক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হতে না পারে।
এ লক্ষ্যেই তাঁরা নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগকে পৃথক করেন এবং প্রতিটি বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য ও জবাবদিহির ব্যবস্থা রাখেন। কংগ্রেসের দুই কক্ষের সদস্যদের মেয়াদও নির্ধারণ করা হয় ভিন্নভাবে। প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যদের মেয়াদ রাখা হয় দুই বছর এবং সিনেটরদের ছয় বছর।
অন্যদিকে, প্রেসিডেন্টের মেয়াদ নির্ধারিত হয় চার বছর। এই মেয়াদগত পার্থক্যের কারণেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাঝামাঝি সময়ে কংগ্রেসের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি হয়। ১৭৯২ সালে জর্জ ওয়াশিংটনের প্রথম প্রেসিডেন্সির মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে প্রথম মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
প্রতিনিধি পরিষদের সব সদস্যকে প্রতি দুই বছর পরপর নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল জনপ্রতিনিধিদের জনগণের মতামত ও চাহিদার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত রাখা। অন্যদিকে, সিনেটকে তুলনামূলক স্থিতিশীল ও অভিজ্ঞতানির্ভর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। সে কারণে সিনেটরদের মেয়াদ ছয় বছর নির্ধারণ করা হয় এবং তাদের তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়।
ফলে প্রতি দুই বছর পরপর সিনেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে পুরো সিনেট একসঙ্গে পরিবর্তিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে না এবং আইন প্রণয়নে ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। প্রথমদিকে সিনেটরদের সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত করার বিধান ছিল না; অঙ্গরাজ্যের আইনসভাগুলো তাদের নির্বাচন করত। ১৯১৩ সালে সংবিধানের সপ্তদশ সংশোধনী অনুমোদনের পর জনগণের সরাসরি ভোটে সিনেটর নির্বাচনের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়।
মধ্যবর্তী নির্বাচন প্রেসিডেন্টকে সরাসরি ক্ষমতাচ্যুত করার নির্বাচন নয়। বরং এর মাধ্যমে ভোটাররা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলে দিয়ে প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক ও আইন প্রণয়নের ক্ষমতার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারেন।
প্রেসিডেন্টের দল যদি প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়, তাহলে বাজেট, আইন প্রণয়ন, নিয়োগ অনুমোদন এবং বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তাকে বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতা করতে হয়। ফলে মধ্যবর্তী নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার একটি কার্যকর রাজনৈতিক হাতিয়ার।
তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত বৈশিষ্ট্য হলো, অধিকাংশ সময় এতে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল কংগ্রেসে আসন হারায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৬ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ২০টি মধ্যবর্তী নির্বাচনের মধ্যে ১৮টিতেই প্রেসিডেন্টের দল প্রতিনিধি পরিষদে আসন হারিয়েছে।
অর্থাৎ, ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের আসন কমেছে। এই সময়ের নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের দল গড়ে প্রতিনিধি পরিষদে ২৬টি এবং সিনেটে চারটি আসন হারিয়েছে। পরিসংখ্যানটি স্পষ্ট করে যে, মধ্যবর্তী নির্বাচন মার্কিন রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন দলের জন্য সাধারণত কঠিন এক রাজনৈতিক পরীক্ষা।
এর পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করে। প্রথমত, ভোটাররা মধ্যবর্তী নির্বাচনকে প্রেসিডেন্টের দুই বছরের শাসনামলের মূল্যায়নের সুযোগ হিসেবে দেখেন। অর্থনীতি, দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান, পররাষ্ট্রনীতি, যুদ্ধ, অভিবাসন কিংবা সরকারের জনপ্রিয়তা—সবকিছুই নির্বাচনে প্রভাব ফেলে। দ্বিতীয়ত, ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকদের মধ্যে অনেক সময় আত্মতুষ্টি তৈরি হয়, অন্যদিকে বিরোধী দলের সমর্থকেরা সরকারবিরোধী মনোভাব থেকে বেশি উৎসাহ নিয়ে ভোট দিতে আসেন।
তৃতীয়ত, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর দুই বছরের মধ্যে কিছু ভোটার তাদের আগের সিদ্ধান্ত নিয়ে হতাশ হতে পারেন। এ ছাড়া প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তার ওপর ভর করে নির্বাচিত কংগ্রেস সদস্যরা পরবর্তী নির্বাচনে সেই সুবিধা হারাতে পারেন।
ঐতিহাসিক পরিসংখ্যানেও এই প্রবণতার ব্যতিক্রম খুব বেশি নেই। ১৮৯৪ সালে প্রেসিডেন্ট গ্রোভার ক্লিভল্যান্ডের ডেমোক্রেটিক পার্টি প্রতিনিধি পরিষদে ১২৫টি আসন হারায়, যা মধ্যবর্তী নির্বাচনের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আসন-ধস। ১৮৭৪ সালে ইউলিসিস গ্রান্টের রিপাবলিকান পার্টি হারায় ৯৬টি আসন। ১৮৯০ সালে বেঞ্জামিন হ্যারিসনের দল হারায় ৯৩টি আসন।
আধুনিক সময়েও বড় বিপর্যয়ের নজির রয়েছে। ২০১০ সালে বারাক ওবামার ডেমোক্রেটিক পার্টি প্রতিনিধি পরিষদে ৬৩টি আসন হারায়। ১৯৯৪ সালে বিল ক্লিনটনের দল হারায় ৫৪টি এবং ২০০৬ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশের রিপাবলিকান পার্টি হারায় ৩০টি আসন।
তবে সব সময় যে প্রেসিডেন্টের দল পরাজিত হয়, তা নয়। ১৯৩৪ সালে মহামন্দার সময় ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের জনপ্রিয় নিউ ডিল কর্মসূচির কারণে তার ডেমোক্রেটিক পার্টি প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই কক্ষেই নয়টি করে আসন লাভ করে। ১৯৯৮ সালে বিল ক্লিনটনের অভিশংসন-সংক্রান্ত রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে তাঁর দল প্রতিনিধি পরিষদে চারটি আসন বাড়ায়।
২০০২ সালে ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর জাতীয় ঐক্য ও প্রেসিডেন্টের প্রতি জনসমর্থনের প্রভাবে জর্জ ডব্লিউ বুশের রিপাবলিকান পার্টি প্রতিনিধি পরিষদে আটটি এবং সিনেটে দুটি আসন লাভ করে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, জাতীয় সংকট, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা এবং বিরোধী দলের রাজনৈতিক কৌশল মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নির্বাচনী ফল সব সময় একই দিকে যায় না। প্রতিনিধি পরিষদের সব ৪৩৫টি আসনে নির্বাচন হওয়ায় সেখানে জাতীয় জনমতের পরিবর্তন তুলনামূলক দ্রুত প্রতিফলিত হয়। কিন্তু সিনেটে প্রতি দুই বছর পরপর সাধারণত ৩৩ বা ৩৪টি আসনে নির্বাচন হয়। কোন অঙ্গরাজ্যগুলোতে নির্বাচন হচ্ছে, সেখানকার রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং প্রার্থীদের জনপ্রিয়তার ওপর ফলাফল অনেকটাই নির্ভর করে।
২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি প্রতিনিধি পরিষদে ৪১টি আসন হারালেও সিনেটে দুটি আসন বাড়ায়। একইভাবে, ২০২২ সালে জো বাইডেনের ডেমোক্রেটিক পার্টি প্রতিনিধি পরিষদে নয়টি আসন হারালেও সিনেটে একটি আসন বাড়ায়। ফলে শুধু একটি কক্ষের ফল দিয়ে পুরো রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিচার করা যায় না।
২০২২ সালের নির্বাচন ছিল সাম্প্রতিক সময়ের উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রমগুলোর একটি। ওই নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের ডেমোক্রেটিক পার্টি প্রতিনিধি পরিষদে মাত্র নয়টি আসন হারায়, যা আগের ২০ বছরের মধ্যে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দলের সবচেয়ে কম আসন হারানোর ঘটনা।
অন্যদিকে, ২০১৮ সালে ট্রাম্পের দল প্রতিনিধি পরিষদে ৪১টি আসন হারালেও সিনেটে আসন বাড়াতে সক্ষম হয়েছিল। এই পরিসংখ্যানগুলো দেখায়, মধ্যবর্তী নির্বাচনে জাতীয় রাজনৈতিক পরিবেশের পাশাপাশি স্থানীয় নির্বাচনী সমীকরণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৬ সালের ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে আরেকটি মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ৩১ অক্টোবরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের আসন ছিল ২১৮টি এবং ডেমোক্র্যাটদের ২১৪টি; একটি স্বতন্ত্র আসন এবং দুটি আসন শূন্য ছিল। সিনেটে রিপাবলিকানদের অবস্থান ছিল ৫৩-৪৭। এ নির্বাচনে সিনেটের ৩৫টি আসনে ভোট হওয়ার কথা রয়েছে।
ফলে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখা রিপাবলিকানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষা। তবে নির্বাচনের ফলাফল সম্পর্কে আগাম সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই; ভোটারদের মনোভাব, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং নির্বাচনী প্রচারণাই শেষ পর্যন্ত ফল নির্ধারণ করবে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন কেবল নিয়মিত নির্বাচন নয়; এটি দেশটির গণতান্ত্রিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা। সংবিধান প্রণেতারা যে ক্ষমতার ভারসাম্য, জনগণের প্রতিনিধিত্ব এবং জবাবদিহির ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচন তারই বাস্তব প্রয়োগ।
আর ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান বলছে, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া যতটা কঠিন, তার দুই বছর পর কংগ্রেসে সেই রাজনৈতিক শক্তি ধরে রাখা অনেক সময় তার চেয়েও কঠিন। এ কারণেই মার্কিন রাজনীতিতে মধ্যবর্তী নির্বাচনকে প্রায়ই প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তার পরীক্ষা এবং পরবর্তী রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।



