ট্রাম্পের কলমের এক খোঁচায় জনশূন্য হয়ে পড়লো শহর

ফ্লোরিডার হাইতিয়ান ইমিগ্রান্ট অধ্যুষিত শহর এখন পরিণত হয়েছে এক ভূতুরে নগরীতে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইমিগ্রেশন বিরোধী কলমের এক খোঁচায় (নির্বাহী আদেশ) আমেরিকার একটি শহর জনশূন্য হয়ে পড়লো। উধাও হয়ে গেলো ইমিগ্রেশন কমিউনিটি। জনশূন্য হয়ে পড়লো দক্ষিন ফ্লোরিডার হাইতিয়ান ইমিগ্রান্ট অধ্যুষিত শহর। পরিণত হলো ভূতুরে নগরীতে। ক্যারিবিয়ান দেশটিতে রাজনৈতিক সহিংসতা ও মানবতাবিরোধী হত্যাযজ্ঞের কারনে লাখ লাখ হাইতিয়ান আশ্রয় নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে। পেয়েছিল ‘টেম্পোরারি প্রোটেক্টেড স্ট্যাটাস’ (টিপিএস) বা সাময়িক সুরক্ষা মর্যাদা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ৫ আগষ্ট এক কলমের খোঁচায় তা বাতিল করে দেয়। এতে ইমিগ্রান্ট হাইতিয়ান নাগরিকদের জীবনে নেমে আসে অন্ধকার। মানবাধিকার গ্রুপগুলো সোচ্চার প্রতিবাদ জানালেও কাজ হয়নি। আদালেতে ট্রাম্পের এই আদেশের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে।
মায়ামির 'লিটল হাইতি' এলাকা হা্ইতি ইমিগ্রান্ট অধ্যুষিত একটি শহর বা এলাকা। এটি দক্ষিণ ফ্লোরিডার বৃহত্তর হাইতিয়ান সম্প্রদায়ের অংশ, যারা সাময়িক সুরক্ষা সুবিধা (টিপিএস) বাতিলের ফলে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। গ্রেফতার কিংবা ডিপোর্টেশনের ভয়ে অধিকাংশ গা ঢাকা দিয়েছে।
ডেনিস, যিনি মায়ামির 'লিটল হাইতি' এলাকার এক অবিচ্ছেদ্য ব্যক্তিত্ব। তিনি ইউএসএ টুডে—কে বলেছেন, ১৯৭০—এর দশক থেকে স্বৈরশাসক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার হাত থেকে পালিয়ে আসা হাইতিয়ানদের জন্য এই এলাকাটি একটি আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে। ২০১০ সালের হাইতির ভূমিকম্প, ২০২১ সালে রাষ্ট্রপতির হত্যাকাণ্ড এবং গ্যাং এর লড়াইয়ের মুখে হাইতি সরকারের পতনের পর লাখো মানুষ এখানে চলে আসে। এলাকাটি আমেরিকার বৃহত্তম হাইতিয়ান প্রবাসীদের ঐতিহাসিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠে।
কিন্তু ৫ আগস্ট ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রে হাইতিয়ান অভিবাসীদের জন্য সাময়িক সুরক্ষা সুবিধা (টিপিএস) বাতিল করার পর থেকে এলাকাটিতে এক ভুতুড়ে নীরবতা নেমে এসেছে। যারা একসময় এখানে আশ্রয় খুঁজেছিলেন, তারা এখন ডিপোর্টেশনের আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। অন্যত্র চলে যাচ্ছেন গ্রেফতার কিংবা ডিপোর্টেশনের আশংকায়।
টিপিএস বাতিলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে ফ্লোরিডায়। যুক্তরাষ্ট্রে টিপিএস সুবিধা পাওয়া প্রায় সাড়ে ৩ লাখ হাইতিয়ানের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই ফ্লোরিডায় বসবাস করেন এবং তাদের বড় একটি অংশ দক্ষিণ ফ্লোরিডায় থাকেন।
কমিউনিটি বা সমাজকর্মীদের মতে, 'লিটল হাইতি'—র মতো এলাকাগুলোতে এই পরিবর্তন মানুষের জীবনের প্রতিটি স্তরেই বিপর্যয় ডেকে এনেছে। এর ফলে অনেকেই বৈধভাবে কাজ করার সুযোগ হারিয়েছেন। ব্যবসা—প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মী ও ক্রেতা সংকটে ধুঁকছে। অনেকে ভয়ে ডাক্তার দেখাতে বা ক্লাসের প্রথম দিনে (মায়ামি—ডে কাউন্টিতে যা ১৩ আগস্ট শুরু হয়েছিল) সন্তানদের স্কুলে নিয়ে যেতেও বের হতে পারছেন না। ডিপোর্টেশন ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা হাইতিয়ান—আমেরিকান সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক মিলনস্থলগুলো এখন জনশূন্য হয়ে পড়েছে।
‘ব্যবসা—প্রতিষ্ঠানগুলো ফাঁকা। গির্জাগুলো ফাঁকা। রাস্তাঘাটও জনশূন্য। মানুষ পুরোপুরি আত্মগোপনে চলে গেছে।’ ইউএসএ টুডে—কে বলেছেন হাইতিয়ান আমেরিকান প্রফেশনালস কোয়ালিশন'—এর সদস্য সান্ত্রা ডেনিস। "পরিস্থিতিটা সত্যিই বিপর্যয়কর।"
ডিপার্টমেন্ট অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সম্প্রতি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। টিপিএস বা 'অস্থায়ী সুরক্ষিত মর্যাদা' হারানো হাইতিয়ানদের আইস পুলিশ (ইমিগ্রেশন পুলিশ) এজেন্টরা লক্ষ্যবস্তুতে পরিনত করছে। তবে তারা জানিয়েছে, যারা স্বেচ্ছায় ফিরে যাবেন, তারা ২,৬০০ ডলার অর্থ সহায়তা এবং ফিরে যাওয়ার জন্য বিমানভাড়া পাবেন। বিভাগটির মতে, এই কর্মসূচিটি কার্যত একটি 'সাধারণ ক্ষমা' (অ্যামনেস্টি) কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছিল। অথচ কংগ্রেস কখনোই এটির স্থায়ী সমাধান দেয়নি।






