নাম নিয়েও মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা
ট্রাম্পের ‘লেক আমেরিকা’, কানাডার জবাব 'অন্টারিও’ই থাকবে

কানাডার শিল্পমন্ত্রী মেলানি জলি মঙ্গলবার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘লেক আমেরিকা’ নামকরণের প্রস্তাবের জবাবে কানাডা সবসময় এটিকে ‘লেক অন্টারিও’ বলবে।
একই হ্রদ। দুই দেশ। কিন্তু এখন নাম দুটি! যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লেক অন্টারিওর নাম যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ব্যবহারে ‘লেক আমেরিকা’ করার নির্দেশ দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট তিনি এ সংক্রান্ত নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন।
নাম পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্ত এসেছে এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সম্পর্ক বাণিজ্য নিয়ে আগে থেকেই বেশ উত্তপ্ত। ফলে একটি হ্রদের নাম বদলের ঘটনা এখন দুই দেশের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের নতুন প্রতীক হয়ে উঠেছে।
লেক অন্টারিও যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্য ও কানাডার অন্টারিও প্রদেশের মাঝখানে অবস্থিত। অর্থাৎ এটি কোনো এক দেশের একক জলভাগ নয়। তাই ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি নথি ও মানচিত্রে নাম পরিবর্তন করতে পারলেও কানাডাকে ‘লেক আমেরিকা’ নাম ব্যবহার করতে বাধ্য করতে পারবেন না।
কানাডার অবস্থানও পরিষ্কার—তারা এই হ্রদকে লেক অন্টারিও নামেই ডাকবে।
ফলে সামনে তৈরি হতে পারে অদ্ভুত এক পরিস্থিতি—আমেরিকার সরকারি মানচিত্রে ‘লেক আমেরিকা’, আর কানাডার মানচিত্রে ‘লেক অন্টারিও’।
শুধু একটি হ্রদের নাম বদলানোর সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা কঠিন। কারণ গত কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে বাণিজ্য নিয়ে তীব্র বিরোধ চলছে। ট্রাম্প প্রশাসন কানাডার বিভিন্ন পণ্যের ওপর বড় ধরনের শুল্ক আরোপ করেছে। জবাবে কানাডাও মার্কিন পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক দিয়েছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ট্রাম্পের বহুল আলোচিত ‘কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য’ করার মন্তব্য। কানাডা অবশ্য এই ধারণাকে বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে।
এখন সেই উত্তেজনার মধ্যেই লেক অন্টারিওর নাম পরিবর্তনের ঘোষণা। ফলে অনেকের কাছেই বিষয়টি নিছক নাম বদল নয়; বরং কানাডার প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের আরও একটি রাজনৈতিক বার্তা।
কানাডার কাছে লেক অন্টারিও শুধু একটি হ্রদ নয়। এর সঙ্গে দেশটির ইতিহাস ও পরিচয় জড়িয়ে আছে। হ্রদের নাম থেকেই কানাডার অন্টারিও প্রদেশের নাম এসেছে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি জানিয়েছেন, কানাডীয়রা হ্রদটিকে লেক অন্টারিও নামেই ডাকবে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র নাম পাল্টালেও কানাডা পুরোনো নাম ছাড়ছে না।
এখানেই তৈরি হচ্ছে নতুন কূটনৈতিক অস্বস্তি।
এটি ট্রাম্পের প্রথম এমন উদ্যোগ নয়। এর আগে মেক্সিকো উপসাগরের নাম যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ব্যবহারে ‘গালফ অব আমেরিকা’ করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি। সেই সিদ্ধান্তও আন্তর্জাতিকভাবে বিতর্ক তৈরি করেছিল।
কারণ একটি দেশের সরকার নিজের সরকারি নথিতে নাম পরিবর্তন করলেও অন্য দেশ বা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে একই নাম ব্যবহার করানো সহজ নয়। লেক অন্টারিওর ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি নথিতে নাম পরিবর্তন হতে পারে। সরকারি মানচিত্রেও নতুন নাম দেখা যেতে পারে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে বিশ্বের সবাই এখন থেকে হ্রদটিকে ‘লেক আমেরিকা’ বলবে।
কানাডা যদি ‘লেক অন্টারিও’ নাম ব্যবহার করতে থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও দুই নাম পাশাপাশি ব্যবহারের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে সীমান্ত, নৌপরিবহন, বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক নথিতে বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নাম পরিবর্তনের কারণে আগামীকাল থেকে হ্রদের পানি বদলে যাবে না, সীমান্তও বন্ধ হবে না। কিন্তু এর পেছনে থাকা যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা সম্পর্কের টানাপোড়েনের প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর পড়তে পারে।
দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও খারাপ হলে গাড়ি, কৃষি, জ্বালানি ও বিভিন্ন শিল্পপণ্যের দাম এবং সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে। সীমান্তবর্তী ব্যবসা ও কর্মসংস্থানেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
তাই ‘লেক আমেরিকা’ নামটি যতটা প্রতীকী, এর পেছনে থাকা যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা সম্পর্কের টানাপোড়েন ততটাই বাস্তব।
সবচেয়ে সম্ভাব্য চিত্র হলো—যুক্তরাষ্ট্র বলবে ‘লেক আমেরিকা’, কানাডা বলবে ‘লেক অন্টারিও’। একই হ্রদ, কিন্তু দুই দেশের সরকারি ব্যবহারে দুই নাম।
তবে এর চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো—নাম বদলের এই সিদ্ধান্ত কি শুধু মানচিত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা সম্পর্কের দূরত্ব আরও বাড়াবে?
একসময় উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী হিসেবে পরিচিত ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা। এখন শুল্কের লড়াই, রাজনৈতিক বক্তব্য আর সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সেই সম্পর্কেই তৈরি হয়েছে নতুন চাপ।
হ্রদের নাম বদলেছে—এবার কি বদলাবে দুই প্রতিবেশীর সম্পর্কের সমীকরণ?







