যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন
৩৬ অঙ্গরাজ্যে গভর্নর লড়াই, পাল্টে যেতে পারে মার্কিন রাজনীতির মানচিত্র

ছবি: রয়টার্স
রাত পোহালেই যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন। ৩ নভেম্বরের এ নির্বাচন মানেই শুধু কংগ্রেসের (পার্লামেন্ট) নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই নয়। একই দিনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে দেশটির ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচনও। ভোটযুদ্ধের এ ফলই নির্ধারণ করবে আগামী চার বছর কোন দলের হাতে থাকবে রাজ্যগুলোর নির্বাহী ক্ষমতা। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অভিবাসন, করনীতি, জ্বালানি, নির্বাচন পরিচালনা ও গর্ভপাতের অধিকারসহ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে গভর্নরদের ভূমিকা রয়েছে। ফলে এবারের নির্বাচনে গভর্নর পদগুলোর লড়াইও জাতীয় রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
এবারের নির্বাচনে দুদলের মধ্যে গভর্নর পদ বণ্টনের হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ২৬টিতে রিপাবলিকান এবং ২৪টিতে ডেমোক্র্যাট গভর্নর। ৩৬টি নির্বাচনী আসনের মধ্যে দুদলেরই ১৮টি করে আসন রয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা অন্তত দুটি আসন বাড়াতে পারলে ২০১০ সালের পর প্রথমবারের মতো গভর্নর পদে জাতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ অর্জন করবে।
এবারের নির্বাচনে ১৯ জন বর্তমান গভর্নর আর দায়িত্বে ফিরছেন না। ফলে একাধিক রাজ্যে নতুন নেতৃত্ব আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে। দুদলই এসব রাজ্যে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে।
প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নয় রাজ্যের দিকে নজর
নির্বাচনের আগে ২৯ অক্টোবর প্রকাশিত নির্দলীয় কুক পলিটিক্যাল রিপোর্টের মূল্যায়নে ৯টি রাজ্যের গভর্নর নির্বাচনকে বিশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে আলাস্কা, জর্জিয়া, আইওয়া, কানসাস, মিশিগান, নেভাদা, ওহাইও ও উইসকনসিনের পাশাপাশি অ্যারিজোনাও রয়েছে।
জর্জিয়ায় ডেমোক্র্যাট কেইশা ল্যান্স বটমসের মুখোমুখি রিপাবলিকান ব্যবসায়ী রিক জ্যাকসন। বর্তমান রিপাবলিকান গভর্নর ব্রায়ান কেম্প মেয়াদসীমার কারণে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন না। বটমস জয়ী হলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে নির্বাচিত প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর হবেন। অন্যদিকে জ্যাকসনের ব্যবসায়িক পরিচিতি ও নির্বাচনী প্রচারণায় বিপুল অর্থ ব্যয় তাকে আলোচনায় রেখেছে।
নেভাদায় রিপাবলিকান গভর্নর জো লম্বার্ডোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ডেমোক্র্যাট অ্যারন ফোর্ড। রাজ্যটির পর্যটননির্ভর অর্থনীতি, বাড়িভাড়া, জ্বালানি ও জীবনযাত্রার ব্যয় ভোটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আইওয়ায় ডেমোক্র্যাট রব স্যান্ডের প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান জ্যাক লাহন। বর্তমান গভর্নর কিম রেনল্ডস পুনর্নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন না। শিক্ষা, কৃষি, পরিবেশদূষণ, স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনযাত্রার ব্যয় সেখানে নির্বাচনী আলোচনায় রয়েছে।
কানসাসেও নতুন গভর্নর নির্বাচিত হবেন। ডেমোক্র্যাট সিন্ডি হলশার ও রিপাবলিকান টাই মাস্টারসনের মধ্যে লড়াই হচ্ছে। বর্তমান গভর্নর লরা কেলি মেয়াদসীমার কারণে আর নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন না।
মিশিগান ও ওহাইওতে নতুন নেতৃত্বের লড়াই
মিশিগানে ডেমোক্র্যাট জোসেলিন বেনসন এবং রিপাবলিকান জন জেমসের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে। বর্তমান গভর্নর গ্রেচেন হুইটমার মেয়াদসীমার কারণে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন না। শিল্প ও উৎপাদন খাতের কর্মসংস্থান, অর্থনীতি এবং শ্রমিকদের স্বার্থ সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু।
ওহাইওতে রিপাবলিকান বিবেক রামাস্বামী ও ডেমোক্র্যাট অ্যামি অ্যাকটনের লড়াই জাতীয় পর্যায়ে আলোচিত হচ্ছে। বর্তমান রিপাবলিকান গভর্নর মাইক ডিওয়াইন মেয়াদসীমার কারণে নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন না। অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থান নিয়ে দুই প্রার্থীর প্রচারণায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে।
উইসকনসিনেও নতুন গভর্নর নির্বাচিত হবেন। ডেমোক্র্যাট ডেভিড ক্রাউলি ও রিপাবলিকান টম টিফানির মধ্যে লড়াই হচ্ছে। বর্তমান গভর্নর টনি এভার্স পুনর্নির্বাচনে দাঁড়াচ্ছেন না।
টেক্সাস ও অ্যারিজোনায় ট্রাম্পের নীতির প্রভাব
টেক্সাসে রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটের মুখোমুখি ডেমোক্র্যাট জিনা হিনোজোসা। সীমান্ত নিরাপত্তা, অভিবাসন, অর্থনীতি ও করনীতি সেখানে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী ইস্যু। রিপাবলিকানদের শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত রাজ্যটিতে ডেমোক্র্যাটদের প্রচারণা জাতীয় পর্যায়েও নজর কাড়ছে।
অ্যারিজোনায় ডেমোক্র্যাট গভর্নর কেটি হবসের প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান অ্যান্ডি বিগস। পানির সংকট, সীমান্ত নিরাপত্তা, অভিবাসন ও গর্ভপাতের অধিকার নিয়ে সেখানে দুদলের অবস্থানে পার্থক্য রয়েছে। ২০২৪ সালে রাজ্যটির ভোটাররা গর্ভপাতের অধিকার সুরক্ষায় সাংবিধানিক সংশোধনী অনুমোদন করেছিলেন। ফলে বিষয়টি এবারের নির্বাচনী আলোচনাতেও গুরুত্ব পাচ্ছে।
গভর্নরদের হাতে কেন এত ক্ষমতা
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় গভর্নররা শুধু রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান নন। রাজ্যের বাজেট, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আইনশৃঙ্খলা, পরিবেশ ও বিভিন্ন নীতিনির্ধারণে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। রাজ্য আইনসভায় পাস হওয়া বিলে অনুমোদন বা ভেটো দেওয়ার ক্ষমতাও তাদের রয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসননীতি ও ফেডারেল সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও গভর্নরদের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। রিপাবলিকান গভর্নরদের অনেকে প্রশাসনের অভিবাসন নীতির সঙ্গে সমন্বয় করছেন। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট গভর্নরদের কয়েকজন অভিবাসননীতি, ভোটার তথ্য সংগ্রহ এবং স্বাস্থ্যসেবায় ফেডারেল অর্থায়ন কমানোর উদ্যোগের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন।
ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কি ভোটে প্রভাব ফেলবে?
এবারের গভর্নর নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা এবং তার প্রশাসনের নীতি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আলোচনায় রয়েছে। মূল্যস্ফীতি, বাড়িভাড়া, জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ দুই দলের প্রচারণায় উঠে এসেছে।
ডেমোক্র্যাটরা অর্থনৈতিক চাপ ও ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তকে সামনে রেখে ভোট চাইছে। অন্যদিকে রিপাবলিকানরা সীমান্ত নিরাপত্তা, কর হ্রাস, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিষয়গুলো তুলে ধরছে।
তবে সব রাজ্যের ভোটার জাতীয় রাজনীতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেন না। রাজ্যের নিজস্ব অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রার্থীদের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতাও ফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে।
৩ নভেম্বরের নির্বাচন তাই শুধু কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণের হিসাব নয়। ৩৬টি গভর্নর পদের ফলের মধ্য দিয়ে রাজ্য পর্যায়ে দুদলের ক্ষমতার ভারসাম্যও স্পষ্ট হবে। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে কোন দল কতটা রাজনৈতিক সমর্থন ধরে রাখতে পারছে, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত মিলতে পারে।






