ইরান চুক্তিতে ট্রাম্পের দুই শর্ত

সংগৃহীত ছবি
ইরানের সঙ্গে প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি সম্প্রসারণ চুক্তি নিয়ে শিগগিরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালিতে অবাধ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা ত্যাগ না করলে কোনো চুক্তি সম্ভব নয়।
গতকাল শুক্রবার ট্রাম্প জানান, হোয়াইট হাউসের নিরাপদ ‘সিচুয়েশন রুমে’ বৈঠক করে তিনি ইরান সম্পর্কিত প্রস্তাবিত চুক্তির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।
ওই প্রস্তাব অনুযায়ী, এপ্রিলের শুরুতে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানো হতে পারে। যাতে উভয় পক্ষ স্থায়ী সমঝোতার জন্য আলোচনা চালিয়ে যেতে পারে।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এ বিষয়ে প্রায় দুই ঘণ্টার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে বৈঠকের পর ট্রাম্প কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কি না, সে বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি।
ওই কর্মকর্তা বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এমন কোনো চুক্তিতেই সম্মত হবেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করবে এবং তার নির্ধারিত সীমারেখা মেনে চলবে। ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না।’
রয়টার্সকে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে, তবে এখনো আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়া হয়নি।
তবে ট্রাম্প নতুন করে দুটি শর্ত সামনে এনেছেন। তিনি বলেছেন, ‘ইরানকে অবশ্যই হরমুজ প্রণালিতে আরোপিত নিয়ন্ত্রণ তুলে নিতে হবে এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা পুরোপুরি বিলুপ্ত করতে হবে।’
ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘ইরানকে নিশ্চিত করতে হবে যে তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র বা বোমা তৈরি করবে না। হরমুজ প্রণালি অবিলম্বে খুলে দিতে হবে, কোনো মাশুল ছাড়াই উভয় দিকের জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ অবাধ হতে হবে।’
তবে ইরান এসব শর্তের সঙ্গে একমত নয় বলে ইঙ্গিত দিয়েছে। দেশটির আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজ ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘কৃত্রিম বিজয় তুলে ধরার চেষ্টা’ বলে মন্তব্য করেছে।
সংস্থাটি দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানি জাহাজের ওপর আরোপিত অবরোধ প্রত্যাহার করলে তেহরানের শর্ত অনুযায়ী হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হতে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেছেন, ‘হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার ইরান ও ওমানের।
এদিকে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, ‘অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়টি হলেও তা ধীরে ধীরে কার্যকর করা হবে।’
ফার্স নিউজের দাবি, আলোচনায় ইরানের জব্দ হওয়া ১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের সম্পদ মুক্ত করার বিষয়ে নীতিগত সমঝোতা হয়েছে। তবে ট্রাম্প বলেছেন, ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত’ কোনো অর্থ লেনদেন হবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে ট্রাম্প সম্ভবত হরমুজে সম্ভাব্য মাশুল আদায়, যুদ্ধক্ষতির ক্ষতিপূরণ কিংবা ইরানের জব্দ সম্পদ ফেরতের মতো দাবির প্রতি ইঙ্গিত করেছেন।
নভেম্বরে কংগ্রেস নির্বাচন সামনে রেখে ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে। হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনার কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন ভোক্তাদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। একই সঙ্গে ইরানের প্রতি কোনো ধরনের ছাড় দিলে নিজ দলের কঠোরপন্থী মহলের সমালোচনার মুখেও পড়তে পারেন তিনি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতের ফলে মূলত ইরান ও লেবাননে হাজারো মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি হয়েছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি জানিয়েছেন, সম্ভাব্য চুক্তি হলে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত গ্রহণে কাজাখস্তান আগ্রহ দেখিয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের দাবি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা উপস্থিতি কমানো এবং লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান বন্ধ করাও যেকোনো চূড়ান্ত সমঝোতার অংশ হতে হবে।
ফলে সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়ে আশাবাদ তৈরি হলেও পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান এখনো অনেক দূরে রয়ে গেছে।






