জাতিসংঘে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের পর কিউবান কূটনীতিককে বহিষ্কার যুক্তরাষ্ট্রের

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ ও কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ পারিয়্যার মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়— ভিডিও থেকে নেওয়া ছবি
ওয়াশিংটন ও হাভানার মধ্যে উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কিউবার এক কূটনীতিককে বহিষ্কার করছে ট্রাম্প প্রশাসন। জাতিসংঘে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ জানিয়েছেন এ কথা।
কিউবার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা নিয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এক অধিবেশনে ওয়াল্টজ ও কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ পারিয়্যার মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের পর এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হলো। একই সময়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা কিউবায় যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়েও আবার জোরালোভাবে কথা বলছেন।
ওয়াল্টজ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ‘কিউবার প্রতিনিধিদলের প্রথম সচিবকে বহিষ্কারের কাগজপত্রে সই করেছেন’।
ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ওয়াল্টজ বললেন, ‘তাকে চলে যেতে হচ্ছে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তিনি বিমানে করে হাভানা পৌঁছাবেন।’ ওই কূটনীতিকের বিরুদ্ধে এক মার্কিন কূটনীতিককে ধাক্কা দেওয়া এবং ‘হামলা করার চেষ্টা’র অভিযোগ করেন তিনি। বুধবার ফক্স নিউজের আরেকটি সাক্ষাৎকারে ওয়াল্টজ আবারও বলেছেন, কিউবার ওই কূটনীতিক ‘আজই বিমানে করে হাভানায় ফিরে যাবেন এবং এই দেশ ছেড়ে চলে যাবেন’।
ওয়াল্টজ বলছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে কেউ কোনো মার্কিন নাগরিকের গায়ে হাত তুললে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও ও আমি তা মেনে নেব না। এর পরিণতি ভোগ করতে হবে।’
সিএনএনকে বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেছেন, ‘কিউবা মিশনকে আমরা স্পষ্ট করে জানিয়েছি, এই ব্যক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রে স্বাগত জানানো হচ্ছে না। এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি দেশ ছেড়েছেন।’
ওই মুখপাত্র আরও বললেন, ‘অযোগ্য কমিউনিস্ট কিউবা সরকারের সদস্যরা ভয় দেখানো ও দমন-পীড়নের কৌশলের মাধ্যমে নিজেদের প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করেছেন। এসব কৌশল কাজে আসবে না, আর এগুলো সহ্যও করা হবে না।’
মঙ্গলবারের ভিডিওতে দেখা যায়, ওয়াল্টজ বক্তব্য দেওয়ার সময় কিউবার প্রতিনিধিদলের সদস্যরা টেবিলে আঘাত করছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী রদ্রিগেজ পারিয়্যাকে অধিবেশনে বক্তব্যের নিয়মসংক্রান্ত আপত্তি জানাতে শোনা যায়। পরে তিনি মঞ্চের দিকে এগিয়ে যান। এরপর দুজন একে অপরের সঙ্গে চিৎকার করে কথা বলতে থাকেন।
মঞ্চ থেকে ওয়াল্টজ চিৎকার করে বললেন, ‘এই ব্যক্তিকে মঞ্চ থেকে দূরে সরে যেতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রে দাঁড়িয়ে তিনি আমাকে ভয় দেখাতে পারবেন না, যেমনটা তিনি রাজনৈতিক বন্দীদের ভয় দেখানোর চেষ্টা করেন। আমি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি। পিছিয়ে যান!’
এ সময় ওয়াল্টজকে মিথ্যাবাদী বলে চিৎকার শোনা যায়। ওয়াল্টজের এক্স অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক কিউবান কূটনীতিক ভিডিও ধারণ করা ফোনটি সরিয়ে দিচ্ছেন। ওই কূটনীতিক বলেছেন, ভিডিও ধারণকারী ব্যক্তি তার ব্যক্তিগত পরিসরে হস্তক্ষেপ করছেন।
মঙ্গলবার পরে জাতিসংঘে কিউবার মিশন মহাসচিবের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে ওই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। চিঠিতে কিউবার মিশন অভিযোগ করে, এক মার্কিন কূটনীতিক ভিডিও ধারণের জন্য কিউবার ওই কূটনীতিকের ব্যক্তিগত পরিসরে প্রবেশ করেন। পরে তার সুনাম ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে ভিডিওগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বুধবার কিউবার ওপর দীর্ঘদিনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞার নিন্দা জানিয়ে একটি প্রস্তাব বিপুল ভোটে পাস হয়। প্রস্তাবের পক্ষে ভোট পড়ে ১৩০টি, বিপক্ষে ১৭টি। ভোটদানে বিরত ছিল ২৫টি দেশ।
কাস্ত্রো সরকারের নীতিতে পরিবর্তন আনতে গত কয়েক মাসে কিউবার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। তবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হাভানার দীর্ঘদিনের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ নিয়েও প্রশাসনের কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে আরও জোরালো বক্তব্য দিচ্ছেন।
এক্সে শুক্রবার রুবিও লেখেন, ‘কিউবায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে যারা চান, তাদের জন্য এখনই সময়।’
তিনি আরও লেখেন, ‘ব্যর্থ প্রতিশ্রুতির হতাশা, দুর্নীতি এবং মাত্র কয়েকজনের বিশেষ সুবিধাভোগী জীবন—সিআইএর সঙ্গে গোপন অংশীদারত্বের মাধ্যমে নিজেদের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনার এই সুযোগ কাজে লাগান।’
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, দ্বীপটিতে বিভিন্ন প্রকল্পে যুক্ত অন্তত কয়েকজন মার্কিন নাগরিকের সঙ্গে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর যোগাযোগ হয়েছে। তবে এসব আলোচনা মূলত প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং রুবিওর ওই পোস্টের আগেই শুরু হয়েছিল।
রুবিওর এই জোরালো বার্তার পর আরও কিউবান নাগরিক দ্বীপটির কমিউনিস্ট সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রচেষ্টায় সিআইএর সঙ্গে যোগাযোগ করবেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। তবে রুবিওর পোস্টের কয়েক মুহূর্ত পরই সংস্থাটি স্প্যানিশ ভাষায় একটি ভিডিও প্রকাশ করে। এতে নিরাপদে কীভাবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাটির সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে, সে বিষয়ে ধাপে ধাপে নির্দেশনা দেওয়া হয়।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারে অংশ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরান থেকে ‘ফিরে আসার পথে’ যুক্তরাষ্ট্র কিউবার বিষয়টি সামলাবে।
দক্ষিণ ফ্লোরিডায় মধ্যবর্তী নির্বাচনের এক সমাবেশে ট্রাম্প বললেন, ‘ইরান থেকে ফেরার পথে আমরা কিউবার বিষয়টি সামলাব। পথে একটু থামব।’ এ সময় তিনি আগেও কয়েকবার করা একই ধরনের মন্তব্যের পুনরাবৃত্তি করেন।
ট্রাম্প আরও বলেছেন, ‘আসলে কিউবার সঙ্গে আমরা যা করব, তা হলো ইরান থেকে ফেরার পথে সেখানে যাব। ওই সুন্দর জাহাজগুলো নিয়ে আমরা কিউবার পাশ দিয়ে যাব। একটি জাহাজ উপকূল থেকে প্রায় ৫০ গজ দূরে থামাব। তারা হাত তুলে আত্মসমর্পণ করবে। এরপর খেলার শেষটা করতে আমরা মার্কো রুবিওকে পাঠাব।’
সূত্র: সিএনএন



