যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে আগাম ভোটের নতুন রেকর্ড
- ৫ কোটি ৩৬ লাখের বেশি ভোট
- ডেমোক্র্যাটদের অংশগ্রহণে এগিয়ে থাকার চিত্র

যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের ক্লিভল্যান্ডে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে আগাম ভোট দিচ্ছেন ভোটাররা।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের চূড়ান্ত লড়াইয়ের আগেই ভোটের মাঠে তৈরি হয়েছে নতুন ইতিহাস। আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনের দুই দিন আগে পর্যন্ত দেশজুড়ে ৫ কোটি ৩৬ লাখের বেশি ভোটার আগাম ভোট দিয়েছেন। ২০২২ সালের পুরো মধ্যবর্তী নির্বাচনে আগাম ভোটের সংখ্যা ছিল ৪ কোটি ৫৯ লাখ। অর্থাৎ এবার নির্বাচনের দিন আসার আগেই আগের মধ্যবর্তী নির্বাচনের তুলনায় প্রায় ৭৭ লাখ বেশি ভোট পড়েছে।
ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকশন ল্যাবের ১ নভেম্বর দুপুরের তথ্য অনুযায়ী, এবার আগাম ভোটের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২ কোটি ৯৮ লাখ ভোটার সরাসরি ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিয়েছেন। ডাকযোগে ব্যালট পাঠিয়েছেন ২ কোটি ৩৯ লাখের বেশি ভোটার। নির্বাচনের আগে এমন ব্যাপক অংশগ্রহণ দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রচারণায় নতুন হিসাব তৈরি করেছে।
আগাম ভোটে ডেমোক্র্যাটদের অংশগ্রহণ বেশি
এবারের আগাম ভোটের দলভিত্তিক পরিসংখ্যানে ডেমোক্র্যাটদের অংশগ্রহণ বেশি দেখা যাচ্ছে। যেসব ২৭টি অঙ্গরাজ্য ভোটারের দলীয় নিবন্ধনের তথ্য প্রকাশ করেছে, সেখানে প্রায় ৪৩ শতাংশ আগাম ভোটার নিবন্ধিত ডেমোক্র্যাট। রিপাবলিকান ভোটার ৩১ দশমিক ৭ শতাংশ। বাকি প্রায় ২৫ শতাংশ স্বতন্ত্র ও অন্যান্য দলের ভোটার।
সংখ্যার হিসাবে নিবন্ধিত ডেমোক্র্যাট ভোটার প্রায় ১ কোটি ১২ লাখ। অন্যদিকে রিপাবলিকান ভোটার ৮২ লাখের কিছু বেশি। এই ব্যবধান নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে দুই দলের প্রচারণায় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
তবে দলীয় নিবন্ধন মানেই কোনো নির্দিষ্ট দলের প্রার্থীকে ভোট দেওয়া নয়। একজন নিবন্ধিত ডেমোক্র্যাট রিপাবলিকান প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন। একইভাবে রিপাবলিকান নিবন্ধিত ভোটারও ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে সমর্থন করতে পারেন। ফলে আগাম ভোটের এই হিসাবকে নির্বাচনের ফলাফলের পূর্বাভাস হিসেবে দেখা যাচ্ছে না।
জরিপে ডেমোক্র্যাটদের ব্যবধান ৯ পয়েন্ট
আগাম ভোটের পাশাপাশি জাতীয় জনমত জরিপেও ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ব্যবধান দেখা যাচ্ছে।
২৬ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্স/ইপসোস জরিপে সম্ভাব্য ভোটারদের ৫৩ শতাংশ জানিয়েছেন, প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনে তারা ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে ভোট দিতে চান। রিপাবলিকান প্রার্থীর পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন ৪৪ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যবধান ৯ শতাংশ পয়েন্ট।
একই জরিপে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামগ্রিক জনসমর্থন ছিল ৩২ শতাংশ। অর্থনীতি পরিচালনায় তার প্রতি সমর্থন ২৫ শতাংশ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সমর্থন মাত্র ২০ শতাংশ।
জরিপে আরও দেখা গেছে, অর্থনীতি পরিচালনায় কোন দল বেশি সক্ষম—এমন প্রশ্নে ৩৪ শতাংশ ডেমোক্র্যাটদের এবং ২৮ শতাংশ রিপাবলিকানদের ওপর আস্থা প্রকাশ করেছেন। অর্থনৈতিক চাপ এবারের নির্বাচনে ভোটারদের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
৩০ অক্টোবর প্রকাশিত এনবিসি নিউজের সর্বশেষ জাতীয় জরিপেও ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ৫২ শতাংশ এবং রিপাবলিকানদের পক্ষে ৪৫ শতাংশ সমর্থন পাওয়া গেছে। অন্যদিকে রিয়েলক্লিয়ারপলিটিকসের ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত জাতীয় জরিপের গড়ে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন ৫১ দশমিক ৮ শতাংশ এবং রিপাবলিকানদের ৪৩ দশমিক ৩ শতাংশ।
টেক্সাস, ক্যালিফোর্নিয়া ও পেনসিলভানিয়ায় আগাম ভোটের চিত্র
এবারের আগাম ভোটে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যের অংশগ্রহণ বিশেষভাবে নজর কাড়ছে।
টেক্সাসে ৬৮ লাখের বেশি আগাম ভোট পড়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ায় এই সংখ্যা ৫৫ লাখের বেশি। ফ্লোরিডায় ৫৩ লাখের বেশি এবং নর্থ ক্যারোলাইনায় ২৮ লাখের বেশি ভোটার আগাম ভোট দিয়েছেন।
জর্জিয়ায় ২৫ লাখের বেশি আগাম ভোট পড়েছে। নির্বাচনী লড়াইয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পেনসিলভানিয়ায় ১০ লাখের বেশি ভোটার আগাম ভোট দিয়েছেন। নিউ জার্সিতে এই সংখ্যা ৮ লাখ ৫৫ হাজারের বেশি।
বিশেষ করে টেক্সাস, নর্থ ক্যারোলাইনা ও জর্জিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে ভোটারদের অংশগ্রহণ এবারের নির্বাচনী সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বয়স্ক ভোটারদের অংশগ্রহণ বেশি
বয়সভিত্তিক আগাম ভোটের তথ্যেও একটি উল্লেখযোগ্য চিত্র পাওয়া গেছে। যেসব ১৪টি অঙ্গরাজ্য ভোটারের বয়সের তথ্য প্রকাশ করেছে, সেখানে আগাম ভোটারদের ৪৩ দশমিক ২ শতাংশের বয়স ৬৫ বছরের বেশি। ৪১ থেকে ৬৫ বছর বয়সীদের অংশগ্রহণ ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ। ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সীদের হার ১৩ দশমিক ২ শতাংশ। ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সীদের অংশগ্রহণ ৬ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান বলছে, আগাম ভোটে বয়স্ক ভোটারদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। তবে এটি পুরো যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের বয়সভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব নয়। কারণ তথ্যটি কেবল ১৪টি অঙ্গরাজ্য থেকে পাওয়া গেছে।
ভোটের রেকর্ড কি ট্রাম্পের জন্য নতুন চাপ?
এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা অন্তত একটি কক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থনৈতিক নীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, অভিবাসন এবং ইরান যুদ্ধের প্রভাব এবারের নির্বাচনে আলোচিত ইস্যু। ডেমোক্র্যাটরা এসব বিষয় সামনে রেখে ভোটারদের সমর্থন চাইছেন। রিপাবলিকানরা ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতি, করছাড় ও জ্বালানি উৎপাদন বৃদ্ধির পদক্ষেপকে প্রচারণার কেন্দ্রে রেখেছেন।
তবে আগাম ভোটে ডেমোক্র্যাটদের দলীয় নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা বেশি থাকলেও নির্বাচনের দিন রিপাবলিকান ভোটারদের অংশগ্রহণ, স্বতন্ত্র ভোটারদের সিদ্ধান্ত এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোর ফলাফলই শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করবে।
আগামী মঙ্গলবার ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ভোটাররা প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি এবং সিনেটের ৩৫টি আসনে নিজেদের রায় দেবেন। এই নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ করবে ট্রাম্প প্রশাসনের বাকি দুই বছরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং কংগ্রেসে ক্ষমতার ভারসাম্য।



