এল নিনোর প্রভাবে রেকর্ড তাপমাত্রার শঙ্কা

ফাইল— রয়টার্স
চলতি বছরের শেষ দিকে শক্তিশালী এল নিনো তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে থাকায় বিজ্ঞানীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। তাদের আশঙ্কা, এই জলবায়ুগত ঘটনা বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে আরও তীব্র করতে পারে এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, শক্তিশালী এল নিনো এবং মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের যৌথ প্রভাবে তৈরি হতে পারে রেকর্ড তাপমাত্রা, দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, বন্যা ও ভয়াবহ খরার মতো পরিস্থিতি।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, ২০২৬ সালের জুন থেকে আগস্টের মধ্যে এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ৮০ শতাংশ। সংস্থাটি মনে করছে, এই পরিস্থিতি অন্তত নভেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে এবং তখন এর সম্ভাবনা ৯০ শতাংশ বা তারও বেশি হবে।
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ও মে-জুলাই সময়ে এল নিনো পরিস্থিতি তৈরির সম্ভাবনা ৯৮ শতাংশ বলে পূর্বাভাস দিয়েছে।
আনাদোলুকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইস্তাম্বুল টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির জলবায়ুবিজ্ঞান ও আবহাওয়া প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষক ইউরদানুর উনাল বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সঙ্গে যদি শক্তিশালী এল নিনো যুক্ত হয়, তাহলে জলবায়ু ব্যবস্থায় দেখা দিতে পারে বড় ধরনের অস্থিরতা।
তিনি বললেন, ‘গ্রিনহাউস গ্যাসজনিত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবী ইতোমধ্যেই প্রতি বছর সামান্য করে উষ্ণ হচ্ছে। এর ওপর যদি শক্তিশালী এল নিনো যুক্ত হয়, তাহলে জলবায়ু ব্যবস্থা যেন অতিরিক্ত ধাক্কা পায় এবং একের পর এক তাপমাত্রার রেকর্ড ভাঙতে পারে।’
সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা গড়ের তুলনায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি বেড়ে গেলে বিজ্ঞানীরা সেটিকে ‘খুব শক্তিশালী এল নিনো’ বা ‘সুপার এল নিনো’ হিসেবে চিহ্নিত করেন।
১৯৮২-১৯৮৩, ১৯৯৭-১৯৯৮ এবং ২০১৫-২০১৬ সালের সুপার এল নিনো বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের জলবায়ুগত বিপর্যয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিল। সেসব সময়ে প্রাণঘাতী বন্যা, খরা ও তীব্র তাপপ্রবাহ দেখা গিয়েছিল।
২০২৩-২০২৪ সালের সর্বশেষ এল নিনো ঘটনাও বৈশ্বিক রেকর্ড তাপমাত্রার সঙ্গে মিলে যায়।
উনাল ব্যাখ্যা করেন, মধ্য ও পূর্ব ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে গেলে এল নিনো তৈরি হয়। সাধারণ অবস্থায় বাণিজ্যিক বায়ু উষ্ণ পানি পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু এল নিনোর সময় সেই বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে, ফলে উষ্ণ পানি পূর্বদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং স্বাভাবিক সামুদ্রিক ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রবাহে বিঘ্ন ঘটায়।
তিনি বলেছেন, ‘এটি শুধু সমুদ্রের তাপমাত্রাই বদলায় না। এল নিনো বৈশ্বিক বায়ুমণ্ডলীয় প্রবাহও পরিবর্তন করতে পারে, যার ফলে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি তৈরি হয়।’
উনাল জানান, সাধারণত এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে এল নিনো তৈরি হয়, অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে এর তীব্রতা সর্বোচ্চ থাকে এবং দুই থেকে সাত বছর পরপর ফিরে আসে এটি।
তিনি যোগ করেন, ‘শক্তিশালী এল নিনো সব সময় ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি তৈরি করে না। তবে খরা, অতিবৃষ্টি, বন্যা ও তাপপ্রবাহের সম্ভাবনা অনেক বাড়িয়ে দেয় এটি।’
উনাল জোর দিয়ে জানান, এল নিনো সাময়িকভাবে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়াতে পারে ঠিকই, তবে বর্তমান তাপমাত্রার রেকর্ড বৃদ্ধির প্রধান কারণ মানবসৃষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ।
তিনি উল্লেখ করেন, ‘বর্তমানে তাপমাত্রার রেকর্ড ভাঙার প্রধান চালক হলো গ্রিনহাউস গ্যাসজনিত বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন।’




