জ্বলন্ত আলকাতরার পিপে নিয়ে রাস্তায় হাজারো মানুষ

এই আয়োজনের প্রচলন ১৬০৫ সালের ‘গানপাউডার প্লট’-এর সময় থেকে শুরু হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ছবি: বিবিসি
ইংল্যান্ডের ডেভন কাউন্টির ওটারি সেন্ট মেরি শহরে জ্বলন্ত আলকাতরার পিপে কাঁধে নিয়ে রাস্তায় দৌড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। শতাব্দীপ্রাচীন এই উৎসব দেখতে শহরটিতে ভিড় করেন হাজারো মানুষ। প্রতি বছর ৫ নভেম্বর আতশবাজি ও আগুন জ্বালানোর উৎসবের রাতে আয়োজন করা হয় ব্যতিক্রমী এই অনুষ্ঠান।
আয়োজকদের ধারণা, এবার উৎসবে প্রায় ২০ হাজার দর্শনার্থী আসবেন। এতে শহরের জনসংখ্যা সাময়িকভাবে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ার কথা। খারাপ আবহাওয়ার কারণে গাড়ি রাখার জায়গাগুলো দ্রুত ভরে যাওয়ায় একপর্যায়ে দর্শনার্থীদের প্রবেশ বন্ধ করে দিতে হয়।
শিশুদের পিপে বহনের মধ্য দিয়ে সন্ধ্যায় শুরু হয় উৎসব। এরপর নারীদের, পুরুষদের এবং মধ্যবর্তী বয়সীদের পালা আসে। পুরো সন্ধ্যায় মোট ২৭টি জ্বলন্ত পিপে বহনের আয়োজন ছিল।
এই উৎসবের ইতিহাস ১৬০৫ সালের গানপাউডার ষড়যন্ত্রের সময় পর্যন্ত বিস্তৃত বলে দাবি স্থানীয়দের। ওই বছর ইংল্যান্ডের একদল ক্যাথলিক ধর্মাবলম্বী, যাঁদের মধ্যে গাই ফকসও ছিলেন, স্কটল্যান্ডের রাজা ষষ্ঠ জেমস ও ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম জেমসকে হত্যার চেষ্টা করেন। তবে তাদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। সেই ঘটনার স্মরণে আগুন জ্বালানো ও কুশপুত্তলিকা পোড়ানোর প্রচলন শুরু হয় বলে ধারণা করা হয়।
উৎসব কমিটির সভাপতি অ্যান্ড্রু ওয়েড জানান, উৎসবটির শুরু নিয়ে নানা মত রয়েছে। তবে ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এর বেশির ভাগই ১৬০৫ সালের ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত। সে সময় আগুন জ্বালানো ও কুশপুত্তলিকা পোড়ানোর প্রচলন ছিল। পিপেও সহজে পাওয়া যেত। আগে পিপেগুলো গড়িয়ে নেওয়া হতো। এ কারণেই অংশগ্রহণকারীদের ‘পিপে গড়ানো ব্যক্তি’ বলা হয়।
এই উৎসবে অংশ নেওয়ার জন্য রয়েছে বিশেষ নিয়ম। প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে জ্বলন্ত পিপে বহন করতে হলে শৈশবে এই আয়োজনে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। এ ছাড়া অংশগ্রহণকারীকে অবশ্যই ওই শহরে জন্ম নেওয়া ও বেড়ে ওঠা মানুষ হতে হবে।
এবারের উৎসবে অংশ নিতে হাওয়াই থেকে এসেছেন শহরটিতে জন্ম নেওয়া ড্যারিন অ্যাবট। তিনি বলেন, ‘এটা আমাদের কাছে বড়দিনের মতো। এই আয়োজন আমি কোনোভাবেই বাদ দিতে চাই না।’
হ্যাটি নামের এক নারী জানান, তিনি ১২ বছর বয়সে প্রথম পিপে বহন শুরু করেন। তার মতে, ‘শিশু বয়সে অংশ নিতে হয়। তাহলেই প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা পাওয়া যায়।’ তার ভাই, খালা, চাচি, চাচাতো-মামাতো ভাইবোন এবং দুই দাদাও অতীতে এই উৎসবে অংশ নিয়েছেন।
এবার টানা ১১ বছর ধরে উৎসবে অংশ নিয়েছেন ম্যাডি স্মল। তিনি বলেন, ‘এটি একটি সাধারণ শহর। এখানকার সবারই স্বাভাবিক পেশা রয়েছে। কিন্তু আজকের রাতেই আমরা সবাই একসঙ্গে হই।’
উৎসব ঘিরে শহরের দোকানপাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও বিশেষ প্রস্তুতি নেয়। বছরের সবচেয়ে ব্যস্ত সময়গুলোর একটি হওয়ায় কয়েকজন নাপিত ও ট্যাটুশিল্পীও প্রস্তুত ছিলেন। নিরাপত্তার জন্য অনেক দোকানের সামনের অংশ কাঠের তক্তা দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়। শহরের গ্রন্থাগারকে জরুরি নিরাপত্তাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
ডেভন ও কর্নওয়াল পুলিশের কর্মকর্তা জো ম্যাথিউস জানান, দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ স্থানীয় পরিষদ, দমকল ও অ্যাম্বুলেন্স বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করেছে। আয়োজক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অ্যাশ ফ্র্যাঙ্কস বলেন, সেন্ট জন অ্যাম্বুলেন্স সেবার পাশাপাশি তাদের নিজস্ব চিকিৎসক দলও দায়িত্ব পালন করেছে।
উৎসবের অভিজ্ঞ অংশগ্রহণকারী ড্যারিন অ্যাবট বলেন, ‘সবকিছুই পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে থাকে। আয়োজন শেষ হলে আমরা পর্যালোচনা বৈঠক করি। কী করেছি, কোন কাজ ভালো হয়েছে, তা ঠান্ডা মাথায় খতিয়ে দেখি।’
আয়োজক কমিটির সভাপতি ওয়েড জানান, এ উৎসবে বিশেষ সুরক্ষাব্যবস্থা বলতে মোটা চটের তৈরি দস্তানাই প্রধান। তবে কেউ কেউ বাড়তি সুরক্ষার জন্য হাতে কাপড় পেঁচিয়ে নেন এবং মুখে পেট্রোলিয়াম জেলি মাখেন।
ডেভন ও সমারসেট দমকল ও উদ্ধার বিভাগের কর্মকর্তা টিম হোয়াইটওক বলেন, আশ্চর্যজনকভাবে উৎসবটি বেশ নিরাপদ। এখানে দুর্ঘটনার সংখ্যা খুবই কম। আলকাতরার পিপে থেকে সৃষ্ট কোনো দুর্ঘটনাও প্রায় ঘটেনি। তার মতে, এটি আয়োজকদের পরিকল্পনা এবং জরুরি সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের ফল।
প্রধান স্বেচ্ছাসেবক পল গিবনস বলেন, স্বেচ্ছাসেবকেরাই পুরো আয়োজনের চোখ-কান হিসেবে কাজ করেন। ‘আমরা এই আয়োজন উপভোগ করি। তবে দলের প্রত্যেকে নিজের দায়িত্ব পালন না করলে উৎসবটি আয়োজন করা সম্ভব হতো না’, বলেন তিনি।
মধ্যরাতে ‘গার্ট বিগ আন’ বা সবচেয়ে বড় পিপে বহনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের উৎসব।






