দুই চিরশত্রুর লড়াইয়ে বিরতি, কূটনীতিতে সেরা সাফল্য পাকিস্তানের?

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ, সেনা প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি
হুংকার, হুমকি, আলটিমেটাম, আলোচনায় যখন টলল না ইরান, তখন বোমাকেই হাতিয়ার বানিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে আঘাত হানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র।
ওমানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরমাণু আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ঘটে এই হামলার ঘটনা।
প্রাথমিক পর্যায়েই নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা।
সর্বোচ্চ নেতাকে হারিয়ে শোকের আবহেই ইরান পাল্টা হামলা শুরু করে। একে একে ইসরায়েলসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটি এবং দেশটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলা চালাতে শুরু করে তেহরান।
পাশাপাশি ঘরের উঠানে থাকা হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়। এই জলপথ হয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে জ্বালানি সংকট দেখা দেওয়ার পাশাপাশি বাড়ে দামও।
একদিকে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বন্ধ, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটি, দূতাবাসে নিয়মিত ইরানের হামলা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফেলে দেয় মহাদুশ্চিন্তায়।
এরমধ্যে ইরান তাদের নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করে আয়াতুল্লাহ খামেনির মেজো ছেলে মোজতবা খামেনিকে, যা ইরানে ট্রাম্পের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের স্বপ্ন মিশিয়ে দেয় ধুলোয়।
পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন জ্বালানি অবকাঠামোতে তেহরানের লাগাতার ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করে দেওয়ার যে কথা বুক ফুলিয়ে ট্রাম্প দাবি করতেন তাকে ভুল প্রমাণিত করে।
ফলে চারদিক থেকে ট্রাম্প যে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে তা। পাশাপাশি নাজুক হয়ে পড়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের পরিস্থিতি। এছাড়া হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোও পড়ে যায় জ্বালানি সংকটে।
এমন পরিস্থিতিতে যুদ্ধ থামাতে এগিয়ে আসে পাকিস্তান। দেশটি এমন সময় শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়, যখন নিজেই আফগানিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত।
তবে দেশটি দুঃসাহসিক এই কাজে নামার সুযোগ পায়, কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ের সঙ্গে রয়েছে সুসম্পর্ক।
ইসলামাবাদের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি মধ্যপ্রাচ্যের কোনো পক্ষ নয়। এছাড়া দেশটিতে কোনো মার্কিন সামরিক ঘাঁটিও নেই।
দেশটি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়ার অংশ হিসেবে প্রথমে তেহরানকে ওয়াশিংটনের ১৫ দফা প্রস্তাব পৌঁছে দেয়। আলোচনা আয়োজনের প্রস্তাবও দেয়, যা প্রত্যাখ্যান করে তেহরান।
পাশাপাশি ইসলামাবাদে তুরস্ক, মিশর ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করেন পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার।
বৈঠক শেষে ছুটে যান চীনে। সেখানে বৈঠক করেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর সঙ্গে। পরবর্তী সময়ে যৌথ বিবৃতিতে ইরানে চলমান যুদ্ধের অবসানে জানানো হয় তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি এবং শান্তি আলোচনার আহ্বান।
এ প্রক্রিয়ার মধ্যেই বৃদ্ধি পায় যুদ্ধের তীব্রতা। পাকিস্তানের শান্তি উদ্যোগ সফল হবে কিনা তা নিয়ে দেখা দেয় প্রশ্ন।
এ শঙ্কার মধ্যে পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফা প্রস্তাবের জবাবও দেয় তেহরান। সেখানে জোর দেওয়া হয় যুদ্ধের স্থায়ী সমাধানের ওপর।
এরপর ট্রাম্প শুরু করেন উন্মত্তের মতো আচরণ। ইরানের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংসের হুমকি দিয়ে আলটিমেটাম দেন। সর্বশেষ ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে যুদ্ধবিরতি না করলে ইরানের সভ্যতা ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দেন।
সেই ‘ধ্বংসের রাত’ নেমে আসার আগেই পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির খবর এলো।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বুধবার ভোরে লিখেন, ‘অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে আমি ঘোষণা করছি যে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র, তাদের মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে লেবাননসহ অন্যত্র সর্বত্র একটি অবিলম্বে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে, যা কার্যকর হবে অবিলম্বে।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘আমি এই বিচক্ষণ উদ্যোগকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই এবং উভয় দেশের নেতৃত্বের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।’
ইসলামাবাদে হতে যাওয়া বৈঠক সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘আমি তাদের প্রতিনিধিদলকে সব বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে আগামী শুক্রবার ইসলামাবাদে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। উভয়পক্ষই অসাধারণ প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতার লক্ষ্যে গঠনমূলকভাবে কাজ করে চলেছে।’
শাহবাজের আশা ‘ইসলামাবাদ আলোচনা’ টেকসই শান্তি অর্জনে সফল হবে। তিনি জানান, আগামী দিনগুলোতে আরও সুসংবাদ জানানোর অপেক্ষায় রয়েছেন।
এ যুদ্ধবিরতির পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান— উভয়পক্ষই বিজয় দাবি করেছে। দীর্ঘদিন ধরেই প্রকাশ্যে দেশ দুটি নিজেদের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করে আসছিল। এর আগে গত বছর ইরানে হামলা চালায় ইসরায়েল। সেসময় ইসরায়েলের হয়ে তেহরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলায় চালায় যুক্তরাষ্ট্র।
এদিকে এ যুদ্ধের কোনো পক্ষ না হয়েও পাকিস্তান নিজেকে নিয়ে গেছে ‘জয়ী’র কাতারে। দেশটির মধ্যস্থতায় লড়াই থামাতে সম্মত হয়েছে দুই চিরশত্রু দেশ।
এর ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যানের কথায়। তার মতে, নিজেদের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় আসীন করার যে ইচ্ছা পাকিস্তানের, তার পেছনে একটি বড় কারণ বৈশ্বিক কূটনীতিতে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করা। বৈশ্বিক কূটনীতিতে পাকিস্তানের কোনো প্রভাব নেই— এমন সমালোচনা ইসলামাবাদ ইতিবাচকভাবে নেয় না।
পাকিস্তানের কূটনীতিক মালিহা লোধি মনে করেন, এটি উচ্চ ঝুঁকির কূটনীতি, এ সম্পর্কে প্রশ্নের অবকাশ নেই। এর ঝুঁকি যেমন বেশি, পরবর্তীতে সফল হলে পুরস্কারের মাত্রাটাও বড়। এটি পাকিস্তানকে বিশ্ব কূটনীতির সর্বোচ্চ পর্যায়ের খেলোয়াড়দের সঙ্গে এক কাতারে নিয়ে যেতে পারে।
ঝুঁকি নিয়ে যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতা করার মাধ্যমে ইসলামাবাদ হয়তো সেই পুরস্কারটিই পেতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বৈশ্বিক কূটনৈতিক পরিসরে পাকিস্তান তৈরি করে নিয়েছে একটি জায়গা। এখন আগামী শুক্রবার যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্থায়ী কোনো সমঝোতা হয়, তাহলে পাকিস্তান নিজেকে ‘শান্তির দূত’ হিসেবে দাবি করতে পারবে অবলীলায়।
এ যুদ্ধবিরতিকে কূটনীতিতে পাকিস্তানের সেরা সাফল্য হিসেবেও দেখা যায়। এর আগে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ক্ষেত্রেও পাকিস্তানের ভূমিকা ছিল বলে গুঞ্জন ছিল। তবে এবারের সাফল্য নিশ্চিতভাবে দেশটিকে নতুন মর্যাদা এনে দেবে।
একইসঙ্গে এ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার যে শঙ্কা জেঁকে বসেছিল সেখান থেকেও মুক্তি মিলল পাকিস্তানের।
গত বছর পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়। এর শর্ত অনুযায়ী, যদি সৌদি আরব যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে পাকিস্তান তাকে সামরিক সহায়তা দিতে বাধ্য হবে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সংকটে পড়ে ইসলামাবাদ। যুদ্ধবিরতি এ সংকট এড়ানোরও বড় সুযোগ এনে দিল।
যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতা করে দক্ষিণ এশিয়ায়ও বাড়তি সুবিধা পাবে পাকিস্তান। এক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবে চাপে পড়বে ইসলামাবাদের ‘চিরশত্রু’ ভারত। এই কথা দিল্লিতেও কান পাতলেই শোনা গেছে সম্প্রতি।
ভারতের কৌশলগত বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ব্রহ্ম চেলানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘কথার লড়াইয়ে আরও চটপটে ও আক্রমণাত্মক হয়ে পাকিস্তান ভারতকে কূটনৈতিকভাবে অনেকটাই ছাড়িয়ে গেছে।’
সংঘাত, সংকট ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার উত্তাল সময় পেরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ থামাতে ভূমিকা রেখে পাকিস্তান নিজেকে এখন নতুনভাবে চেনাতে শুরু করেছে, যা নিশ্চিতভাবে ইসলামাবাদকে বৈশ্বিক রাজনীতি ও কূটনীতিতে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক করে তুলবে।
















