আড়ালের কবি অ্যান কারসন পেলেন সাহিত্যে নোবেল

কানাডীয় কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও ধ্রুপদী সাহিত্যের পণ্ডিত অ্যান কারসন। ছবি: সংগৃহীত
সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কানাডীয় কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও ধ্রুপদী সাহিত্যের পণ্ডিত অ্যান কারসন। সাহসী ও উদ্ভাবনী সাহিত্যকর্মের জন্য তাকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। তার লেখায় ধ্রুপদী ঐতিহ্যের সঙ্গে কৌতুকপূর্ণ ও সৃজনশীল কথোপকথনের মাধ্যমে সমসাময়িক সাহিত্যের নতুন আঙ্গিক তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে সুইডিশ একাডেমি।
বৃহস্পতিবার সুইডিশ একাডেমির স্থায়ী সচিব ইনগ্রিড কার্লবার্গ কারসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তখন তিনি আইসল্যান্ডে ছিলেন এবং ‘বাতাসের শব্দ শুনছিলেন’। কার্লবার্গ বলেন, ‘তিনি কিছুটা অবাক হয়েছিলেন, তবে অত্যন্ত আনন্দিত ছিলেন। তার কণ্ঠস্বরেই আমি সেই আনন্দ বুঝতে পারছিলাম।’
অবাক করার মতো বিষয় হলো, হয়তো অনেক পাঠক এরই মধ্যে কারসনের লেখা পড়েছেন, অথচ তা জানেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টাম্বলার যখন জনপ্রিয় ছিল, তখন কবিতা ও সাহিত্যের বিভিন্ন সম্প্রদায়ে প্রাচীন গ্রিক কবি স্যাফোর কবিতার কারসনের অনুবাদ করা খণ্ডাংশ ‘ইফ নট, উইন্টার’ বেশ পরিচিত ছিল।
টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনটি ডিগ্রি অর্জনকারী কারসন দ্বিতীয় কানাডীয় নারী হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পেলেন। একই সঙ্গে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রথম প্রাক্তন শিক্ষার্থী, যিনি সাহিত্যের এই সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক সম্মান অর্জন করলেন। ধ্রুপদী সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে দক্ষ কারসন প্রাচীন গ্রিক ও লাতিন সাহিত্যকে সমসাময়িক বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত করে অনন্য এক লেখনশৈলী তৈরি করেছেন। পদ্য ও গদ্য, অনুবাদ ও সৃজনশীল পুনর্নির্মাণ, সব ক্ষেত্রেই তার সাবলীল বিচরণ রয়েছে।
নোবেল কমিটির প্রধান অ্যান্ডার্স ওলসন বলেন, ‘তার প্রায় সমস্ত সাহিত্যকর্মই আবর্তিত হয়েছে ভাষাবিদের শব্দের প্রতি গভীর অনুরাগ এবং কবির নতুন অর্থ খোঁজার আকাঙ্ক্ষার এক মিলনস্থলে।’
কবি হিসেবে কারসন প্রথাগত সাহিত্যিক রীতিকে ভেঙে নতুন পথ তৈরি করেছেন। কবিতা, প্রবন্ধ, নাটক, অপেরার গীতিনাট্য ও প্রাচীন গ্রিক পাঠ্যের অনুবাদসহ ২০টির বেশি বই লিখেছেন তিনি। তার সাহিত্যকর্মে ব্রন্টি বোনদের সাহিত্য থেকে শুরু করে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীর গ্রিক কবি স্টেসিকোরাসের মতো নানা উৎস ও প্রভাব রয়েছে।
১৯৯৮ সালে প্রকাশিত তার পদ্য-উপন্যাস ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড: আ নভেল ইন ভার্স’ তাকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। এতে হারকিউলিসের কিংবদন্তিকে আধুনিক সময়ের এক ত্রিকোণ প্রেমের গল্পের আদলে নতুন করে উপস্থাপন করা হয়। ২০০১ সালে ‘ম্যান ইন দ্য অফ আওয়ার্স’ কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি প্রথম কানাডীয় হিসেবে গ্রিফিন কবিতা পুরস্কার পান। একই বছর ‘দ্য বিউটি অফ দ্য হাজব্যান্ড’ বইয়ের জন্য ইংল্যান্ডের টি. এস. এলিয়ট পুরস্কারও অর্জন করেন।
২০১৪ সালে ‘অটোবায়োগ্রাফি অফ রেড’-এর আংশিক অনুবর্তী রচনা বা কোয়াজি-সিক্যুয়েল হিসেবে লেখা ‘রেড ডক’-এর জন্য দ্বিতীয়বার গ্রিফিন কবিতা পুরস্কার পান কারসন। ২০২০ সালে ‘নর্মা জিন বেকার অফ ট্রয়’ বইয়ের জন্য গভর্নর জেনারেলের সাহিত্য পুরস্কারের কবিতা বিভাগে বিজয়ী হন তিনি। বইটিতে ট্রয়ের হেলেনের গল্পের সঙ্গে মেরিলিন মনরোর জীবনের নানা উপাদান মিলিয়েছেন কারসন। ইউরিপিডিসের গ্রিক ট্র্যাজেডি ও ‘হেরাক্লেসের পুনরুত্থান’ অবলম্বনে লেখা ‘এইচ অফ এইচ প্লেবুক’-এর জন্য দুই বছর পরও তিনি সংক্ষিপ্ত তালিকায় ছিলেন।
কারসনের সাম্প্রতিক বইগুলোর মধ্যে ২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘রঙ নর্মা’ রয়েছে। ২০১৬ সালের পর এটি ছিল তার প্রথম মৌলিক সাহিত্যকর্ম। কাব্যিক গদ্যের এই বইয়ে তার নিজের আঁকা চিত্রও যুক্ত ছিল।
টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এলিজাবেথ হার্ভে বলেন, কারসন সাহিত্যের ‘আঙ্গিক বা গঠনশৈলী উদ্ভাবন ও পুনঃউদ্ভাবন’ করেন। তার কাব্যিক প্রবন্ধের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তিনি এমন সব বিষয়কে, যেমন কোনো বক্তৃতা বা প্রবন্ধ, কবিতায় রূপান্তর করেন, যা সাধারণত কবিতার মতো মনে হয় না। এগুলোকে গদ্যের মতো মনে হলেও, এদের ভাব-সংবেদনশীলতা আসলে গভীর কাব্যিক।’
চার দশক ধরে কারসনের পরিচিতি ও খ্যাতি বাড়লেও ব্যক্তিগত জীবন বরাবরই আড়ালে রেখেছেন তিনি। বইয়ের মলাটে নিজের পরিচয়ও সংক্ষেপে দেন, ‘কানাডীয় কবি, প্রাবন্ধিক এবং গ্রিক পুরাণের অনুবাদক।’
১৯৫০ সালে টরন্টোতে জন্ম নেওয়া কারসন টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে ধ্রুপদী সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে পড়াশোনা করেন। পরে ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়, মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। ১৯৮১ সালে পিএইচডি গবেষণাপত্র সম্পন্ন করার পর ১৯৮৬ সালে প্রেমবিষয়ক গবেষণাধর্মী প্রবন্ধের সংকলন ‘ইরোস দ্য বিটারসুইট’ প্রকাশের মধ্য দিয়ে তার সাহিত্যজগতে আনুষ্ঠানিক অভিষেক হয়।
ট্রেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কনসেটা প্রিন্সিপে কারসনকে নিয়ে একটি বই লিখেছেন। কারসনের সংক্ষিপ্ত আত্মপরিচয়ের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘সেখানে মাত্র দুটি বাক্য ছিল। বিষয়টি বেশ ব্যতিক্রমী। আমার কাছে এটি তার বিনয়ের বহিঃপ্রকাশ বলে মনে হয়েছিল এবং এখনও তার ক্ষেত্রে বিষয়টি তেমনই মনে করি।’
তবে নিজের পরিচয় গোপন রাখার এই প্রবণতা শুধু বিনয়ের প্রকাশ নয়, লেখক হিসেবে তার অবস্থানেরও ইঙ্গিত বহন করে বলে মনে করেন প্রিন্সিপে। তার ভাষায়, ‘আমরা বইয়ের পাতায় যা পড়ি, তার সঙ্গে লেখকের সংযোগ খুঁজি। আমরা ভাবি যে আমরা লেখকেরই জীবনের গল্প পড়ছি এবং এর ফলে লেখকের সঙ্গে আমাদের এক ধরনের নৈকট্য তৈরি হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার মনে হয়, নিজের কথা প্রকাশে তার এই অনীহা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এমনকি আমরা যদি মনে করি তাকে খুঁজে পেয়েছি বা তার জীবনের সব তথ্যও আমাদের জানা থাকে, তবুও লেখার মধ্যে ঠিক কোথায় তিনি অবস্থান করছেন বা তার জীবনের কোন অংশটুকু সেখানে আসলে উপস্থিত, তা আমরা পুরোপুরি ধরতে পারব না।’
কারসনের নোবেলজয়ে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও অভিনন্দন জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি এ জয়কে ‘কানাডার জন্য গর্বের মুহূর্ত’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি লেখেন, ‘বুদ্ধিদীপ্ততা, কল্পনাশক্তি এবং সম্পূর্ণ নিজস্ব এক শৈলীর মাধ্যমে কানাডীয় কবি অ্যান কারসন ধ্রুপদী সাহিত্যকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি প্রাচীন কাহিনীগুলোকে নতুন প্রজন্মের পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন এবং সাহিত্য সম্পর্কে আমাদের চিন্তাধারাকে বদলে দিয়েছেন।’
কারসন সাহিত্যে নোবেল পাওয়া দ্বিতীয় কানাডীয় নারী। এর আগে ২০১৩ সালে ছোটগল্পের লেখক অ্যালিস মুনরো এই পুরস্কার পেয়েছিলেন। কানাডায় জন্ম নেওয়া মার্কিন লেখক সল বেলো ১৯৭৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পান।
নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্য ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা, যা প্রায় ১৭ লাখ মার্কিন ডলারের সমান। কারসনকে প্রথম অভিনন্দন জানায় তার কানাডীয় প্রকাশক পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউস কানাডা। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী ক্রিস্টিন কোচরান এক বিবৃতিতে বলেন, ‘পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউস কানাডায় আমাদের সকলের জন্য তার যুগান্তকারী কাজ কানাডীয়দের কাছে নিয়ে আসা এবং কাজটি যেভাবে বিশ্বব্যাপী পাঠকদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করেছে, তার জন্য এই স্বীকৃতির জন্য তাকে অভিনন্দন জানানো একটি সত্যিকারের সম্মান।’
সূত্র: কানাডিয়ান প্রেস ও টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়




