বিকল্প জ্বালানিতে গাড়ি চালানোর ‘চীনা বুদ্ধি’
- আমেরিকাকে পেছনে ফেলে চীন গাড়ি উৎপাদনে শীর্ষে
- চীনে এখন চলছে প্রায় সাড়ে ৩৬ কোটি গাড়ি
- উৎপাদিত বিদ্যুতের ৪২ শতাংশ ‘গ্রিন এনার্জি’
রফিকুল বাহার, চীন থেকে ফিরে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
১৩ বছর আগে প্রথম জাপানের রাজধানী টোকিও বিমানবন্দরে নামলাম। লাগেজ নিয়ে বের হয়েই সুন্দর ছিমছাম সড়কে খুঁজতে লাগলাম রঙবেরঙের অত্যাধুনিক গাড়ি। কিন্তু হায়! তখন পৃথিবীর শীর্ষ পর্যায়ে চারটি গাড়ি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের দেশ জাপানের রাস্তায় তেমন গাড়ি চোখে পড়ল না। হতাশ মন। একই সঙ্গে কৌতূহলও। কোথায় তাদের গাড়ি? বিমানবন্দর থেকে হোটেলে যাওয়ার ৪০ মিনিটের ড্রাইভে রাস্তায় খুব কমসংখ্যক গাড়ি দেখলাম। সন্ধ্যায় যখন হোটেলে ঢুকলাম তখন রুম
থেকে
দেখা
যাচ্ছে
রেললাইন।
চোখের
পলকেই
একেকটি
রেল
ছুটছে
গন্তব্যে।
আর
তার
ভেতরে
উপচে
পড়া
মানুষের
ভিড়।
সেকি
!
জাপানিরা
তাহলে
গাড়ি
বানায়
আর
চড়ে
রেলে।
টয়োটা
,
মিৎসুবিশি
,
সুজুকি
ও
হোন্ডা
—
আরও
কত
কী
ব্র্যান্ড।
এই
বাংলাদেশের
রাস্তায়
জাপানের
টয়োটা
ব্র্যান্ড
তো
অঘোষিত
‘
গাড়ির
রাজা
’
।
এশিয়া-ইউরোপ-আমেরিকার রাস্তায় জাপানের গাড়ির রাজত্ব। একচেটিয়া বাজারও। বিশ্ববাণিজ্য ব্যবস্থায় নিজেদের গাড়ির এতটা মনোপলি জাপানিদের অহংবোধের জগতে আভিজাত্যের ছোঁয়া লাগায়, জাগায়ও। কিন্তু আর কত বছর? খুব বেশি দিন নেই এই অহংবোধের জগতে বড় ধাক্কা লাগতে যাচ্ছে। কথাটা শুনতে একটু বেখাপ্পা লাগতেই পারে। কিন্তু তথ্য-পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বের শীর্ষ গাড়ি উৎপাদনকারী ও ব্যবহারকারীর তালিকায় এখন সাদা-লাল পতাকার জয়ধ্বনি। এই পতাকা চীনের। তারা গৌরবের পথেই হাঁটছে এখন। উদ্ভাবনী কৌশল-সর্বাধুনিক প্রযুক্তি-নজরকাড়া ডিজাইন-সাশ্রয়ী দাম-টেকসই-মজবুত-সৌন্দর্যে ক্লাসিক গানের বিটের মতোই। উচ্চ লয়-তাল গাড়ির আরোহীকে প্রাণময় উপভোগ্য সুখস্মৃতি উপহার দেবে। বেশি উপমা ব্যবহার করা হচ্ছে? একদম না। ১১ বছর পর চীন গিয়ে অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ জুড়ে সাংহাই, গুয়াংজু, হাংজো ও সৌজো শহরে গাড়ির স্বপ্নরাজ্যে বিভোর হওয়া স্মৃতির দুয়েকটা শুনুন তাহলে।
বিমানবন্দর থেকে আমাদের নেওয়ার জন্য যে মাইক্রোবাস এসেছিল, সেটি টয়োটা ব্র্যান্ডের সবচেয়ে দামি আলফ্রাডের মতো, বাংলাদেশে যাকে বলা হয় বিমানের বিজনেস ক্লাসসম। চীনারা তাদের এই মাইক্রোবাসকে বলে ‘লং কার’। আলফ্রাডের মতোই বড়সড়। বাইরে এবং ভেতরে দুটোরই লুক অনন্য। ড্রাইভারের সামনে ড্যাশবোর্ড বলতে কিছু নেই। পুরোটাই এলইডি স্ক্রিন। এর ভেতরে ফ্রন্ট-ব্যাক ক্যামেরায় রাস্তার সামনে-পেছনে সব দেখা যায়। গতির মোড স্ক্রিনে ভেসে উঠছে। প্রশস্ত সিট। লেদারের আরামদায়ক ডিজাইন। সাউন্ড সিস্টেম ক্লাউড অ্যান্ড ক্লিয়ার। ওয়াইফাই নেট সবই যুক্ত রয়েছে এতে। পাশে ড্রাইভার লিও। জিজ্ঞেস করলাম কত দাম? সাড়ে তিন লাখ আরএমবি (চীনা মুদ্রা)। বাংলাদেশি টাকায় ৭০ লাখ। দাম শুনে গাড়িতে থাকা বাংলাদেশি ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম বলেই ফেললেন, ‘এত সুন্দর! বাংলাদেশে ট্যাক্স কেমন পড়বে জানি না। তবে আমি একটি কিনতে চাই।’
গুয়াংজু থেকে বাংলাদেশে আসার দিন ভোরে বিমানবন্দরে ড্রপ করতে আসা গাড়ি দেখে চোখ ছানাবড়া। চীনা ড্রাইভার গাড়ির চাবি অন করতেই দুই পাশের দরজা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওপরে উঠে গেল। পেছনের লাগেজ স্পটও একইভাবে খুলে গেল। সব লাগেজ তোলা হলো। আমরাও বসলাম। আবার চাবিতে এক চাপ দিল ড্রাইভার। সঙ্গে সঙ্গেই সব বন্ধ হয়ে গেল। হলিউডের সিনেমায় আর বর্তমান এআই জমানায় গাড়ির এরকম কেরামতি দেখা গেলেও আমরা স্বয়ং সেই গাড়িরই যাত্রী। ভেবে ভালোই লাগল। বাংলাদেশি সংবাদকর্মীর এও এক সুখস্মৃতি।
চীন এখন বিশ্বের দ্রুত বর্ধমান অর্থনীতির দেশ। বিশ্ব অর্থনীতির মোড়ল হিসেবে পরিচিত আমেরিকাকে পেছনে ফেলে চীন এখন গাড়ি উৎপাদনেও শীর্ষে। ২০২৫-২৬ সালে আমেরিকা যেখানে ১ কোটি ২ লাখ গাড়ি উৎপাদন করেছে, সেখানে চীনের উৎপাদন ৩ কোটি ৪৫ লাখ। জাপান উৎপাদন করেছে ৮৪ লাখ। শুধু উৎপাদন নয়, ব্যবহারেও চীন সবার ওপরে। গত ১০ বছরে চীনের ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির কারণে গাড়ি বিক্রির পরিমাণ বছরে তিন থেকে সাড়ে তিন কোটি ইউনিটে পৌঁছেছে। চীনে এখন চলছে প্রায় সাড়ে ৩৬ কোটি গাড়ি। বাংলাদেশের ১৮ কোটি জনসংখ্যার প্রায় দ্বিগুণ। চীন জোর দিচ্ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক গাড়ির দিকে। পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে নতুন যেসব গাড়ি বিক্রি হচ্ছে তার প্রায় ৬০ থেকে ৬৬ শতাংশই হাইব্রিড গাড়ি। ঐতিহ্যবাহী জ্বালানিচালিত অর্থাৎ পেট্রল, অকটেনে চালিত গাড়ি বিক্রির বাজার ৩৩ থেকে ৪০ শতাংশে নেমে এসেছে। চীনের রাস্তায় সাড়ে চার কোটির বেশি বৈদ্যুতিক গাড়ি। ফলে পেট্রল, অকটেন, ডিজেলের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাচ্ছে। চাপ কমে যাচ্ছে জ্বালানির ওপর। আমেরিকা-ইরান সাম্প্রতিক যুদ্ধ সারা বিশ্বে জ্বালানি সংকটের ইঙ্গিত দিলেও চীন এ সংকটময় মুহূর্তে নির্ভার। কারণ তার যে বিপুল জ্বালানি প্রয়োজন, সেটি তারা প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী কৌশল দিয়ে সামলে ফেলছে। চীনের প্রতিটি কারখানার ছাদে সোলার বসানো। জ্বালানি চীনের কাছে কোনো সংকট নয়; বরং একে শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত করেছে তারা। তাদের সরকারের নীতি-কৌশল এমন ধ্রুপদি পর্যায়ে যাওয়ার আরও এক বড় কারণ তার বিপুল জনসংখ্যা। সস্তা শ্রম। নিরাপদ কর্মসংস্থান। ১৪০ কোটি মানুষের জীবনমানের কথা তাদের মাথায় রাখতে হয় সবার আগে। চীনের প্রচুর ছাত্রছাত্রী ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে যায়। পড়া শেষে অন্য দেশের শিক্ষার্থীরা সেখানে স্থায়ী বসবাসের চিন্তা করলেও চীনারা পরীক্ষার ফল বের হওয়ার আগেই দেশে ফিরে আসে। পণ্য বেচাকেনায়, সেলসম্যানশিপ, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ— এসব ক্ষেত্রে চীনের যে ভাষাগত সমস্যা সেটি কাটছে দ্রুত। চীনের বিমানে উঠলে এয়ার হোস্টেসদের সাবলীল ইংরেজি চমকে দেয়। কয়েক বছর আগেও এমন দক্ষতা ছিল না তাদের।
ভাষাগত উৎকর্ষ সম্পর্কে বলতে গিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের ইউনিভার্সিটি অব মোনাসের বাংলাদেশি ছাত্র ইবতেসাম ইফাজ বললেন, ‘আমাদের এখানে বিদেশি ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে চীনারাই বেশি। তারা দলবেঁধে চলে। অন্য দেশিদের সঙ্গে খুব একটা ভাব করে না। পরীক্ষা শেষ হলেই দেশে ফিরে যায়। লন্ডনে পড়ার সময়ও দেখেছি একই অবস্থা তাদের। কর্মসংস্থানের কোনো সুযোগ তারা বিদেশে নিতে চায় না।’
চীন বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে ৩৩৭৭ মিলিয়ন কিলোওয়াট। ইউএস এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের দ্বিতীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশ আমেরিকা। তাও চীনের অর্ধেকের কম ১২৮৪ মিলিয়ন কিলোওয়াট। তৃতীয় হলো ভারত ৫৩১ মিলিয়ন কিলোওয়াট। চীন সারা বিশ্বের ৩৩ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। তার শক্তির উৎসগুলো হলো কয়লা, গ্যাস, জলবিদ্যুৎ, সৌর, বায়ু ও পারমাণবিক। এর মধ্যে ৪২ শতাংশ আসে পরিচ্ছন্ন উৎস থেকে, যাকে বলা হয় ‘গ্রিন এনার্জি’। সাড়ে ৩৬ কোটি গাড়ি যে চলবে তার ঐতিহ্যবাহী জ্বালানি লাগবে কত? সেটি যদি ভাবা হয় তাহলে অর্থনীতির জটিল সমীকরণও প্যাঁচে পড়ে যাবে। কিন্তু আধুনিক চীন রাষ্ট্রের চিন্তকরা (থিংক ট্যাংকার) এমনভাবে ডিজাইন করেছেন, বিদ্যুৎ দিয়েই সে পৃথিবী শাসন করবে। না হলে গাড়ির নাম কেন রাখা হবে ‘বিওয়াইডি’। যার সারকথা হলো, বিল্ড ইউর ড্রিমস (তোমার স্বপ্নকে সত্যি রূপ দাও)।
সারা বিশ্বে খনিজ উৎস থেকে জ্বালানি আহরণের যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তাতে সবার ওপরে রয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার ভেনেজুয়েলা। বছরে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ব্যারেল তেল আহরণ তাদের। দ্বিতীয় অবস্থানে মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, ২৬৭ বিলিয়ন ব্যারেল। ২০২ বিলিয়ন ব্যারেল নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে ইরান। ১০টি দেশের মধ্যে চীনের নাম নেই। ৯ নম্বরে অবস্থান আমেরিকার। তাদের উৎপাদন ৭৫ বিলিয়ন ব্যারেল। উৎপাদন, আহরণে না থেকেও চীন খনিজ জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে পৃথিবীর ১০টি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে। প্রতিদিন তাদের লাগে ১৬ মিলিয়ন ব্যারেল তেল। শীর্ষে থাকা আমেরিকা ব্যবহার করে ২০ মিলিয়ন ব্যারেল। উৎপাদন না করেও ব্যবহারের দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চীনের ভাবনার এই একটি কারণ হলো— জ্বালানি। তারা জ্বালানির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার যেসব আগাম প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে, তাতে ভবিষ্যতে এ খাতে তারাই হবে ‘মার্কেট লিডার’।
বিমানবন্দরে শত শত এয়ারবাস বোয়িং। হাজার হাজার যাত্রী। সকাল-সন্ধ্যা-রাতে মানুষের ভিড়-কোলাহল। কিন্তু কোথাও কোনো ছেদ নেই। অবিরাম-অবিচল-সচল সবকিছু। বিমানযাত্রীদের পথ দেখিয়ে দিচ্ছেন প্রশিক্ষিত কর্মী। লাগেজ চেকিংয়ে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা। ইমিগ্রেশন তার চেয়েও একধাপ এগিয়ে। ইন ফ্লাইট সার্ভিস তার চেয়েও অনেক ভালো। কেউ ঘুমিয়ে পড়েছেন। তাকে ঘুম থেকে ডেকে খাবার পরিবেশন করা হয় না। সিটের ওপর একটি স্টিকার লাগিয়ে দেওয়া হয়। আর অপেক্ষা করতে থাকে কখন আপনার ঘুম ভাঙবে। তারপর এয়ার হোস্টেস হেসে জিজ্ঞেস করবে, আপনার খাবার রেডি। খাবারের প্যাকেট বুঝিয়ে দিয়ে সিটে সাঁটানো স্টিকার তুলে নিয়ে যাবে। স্টিকার পড়ে দেখলাম— দুঃখিত আপনি রেস্ট নিচ্ছিলেন। বিরক্ত করিনি।
শেষ করব ছোট্ট একটি উদাহরণ দিয়ে। হাংজো থেকে সড়কপথে সৌজো যাচ্ছিলাম। এক ঘণ্টার ড্রাইভে একটা জিনিস খুব স্পষ্টই ভাবনার জগৎকে জাগিয়ে তুলল। রাস্তার দুপাশে মাইলের পর মাইল বিদ্যুতের ট্রান্সমিশন লাইন। সেই ট্রান্সমিশন লাইনের একেকটি টাওয়ার যেন একেকটি জায়ান্ট। ২০২৬ সালের অক্টোবরে সর্বশেষ প্রকাশিত বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, রপ্তানি বাণিজ্যে আমেরিকা থেকে ১৫৯১ বিলিয়ন ডলার এগিয়ে চীন, তাদের রপ্তানি ৩ হাজার ৭৭১ বিলিয়ন ডলার। আমদানি বাণিজ্যে শীর্ষে থাকা আমেরিকার পরই চীনের অবস্থান। ৯১৭ বিলিয়ন ডলারের কম আমদানি করেছে চীন, তাদের আমদানি ২ হাজার ৫৮৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশ্বে ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা, সমর কৌশল— এসব সূচক যাদের ওপরের দিকে তারাই পৃথিবী শাসন করে। সুপার পাওয়ার আমেরিকার সঙ্গে সমানতালে পাল্লা দিচ্ছে চীন। এমনই আগ্রাসী অথচ আধুনিক প্রযুক্তির নীরব বিপ্লবের মতোই ব্যবসা-বাণিজ্যের ধরন তাদের।
চীনের ভেতরের বহুমুখী, বৈচিত্র্যময় ও অগ্রসরমান কর্মকাণ্ড আর ব্যবসা-বাণিজ্যের নীতি-কৌশল মনে করিয়ে দেয় কবি সুকান্তের বিদ্রোহের গান কবিতার একটি পঙ্ক্তি— ‘রুখবে কে আর এ অগ্রগতি/সাধ্য কার?’