আফ্রিকায় ইবোলার মরণকামড়

ইবোলার মরণকামড়ে দিশাহারা আফ্রিকার দারিদ্র্যপীড়িত দুদেশ। গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র ও উগান্ডা। দেশ দুটিতে ইবোলা ভাইরাসে (সন্দেহভাজন) আক্রান্তের সংখ্যা এরই মধ্যে ৬০০ ছাড়িয়েছে। মৃত্যু হয়েছে ১৩৯ জনের। গত বুধবার জেনেভায় ডব্লিউএইচওর জরুরি কমিটির বৈঠকে এ তথ্য জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। আলজাজিরা, রয়টার্স ও সিএনএন।
সতর্ক পদক্ষেপ নিয়েছে মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার দেশগুলোও। সংস্থাটির মহাপরিচালক তেদরোস আধানম গেব্রেয়াসুস বলেছেন, ভাইরাসটি এখনো ‘জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে (রবিবার থেকে)। মহামারী পর্যায়ের জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়নি। আরও বাড়তে পারে মৃত্যু। মৃতদের মধ্যে স্বাস্থ্যকর্মীরাও রয়েছেন, যা বিশেষ উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তার ভাষ্য, ‘জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে এই মহামারীর ঝুঁকিকে উচ্চ হিসেবে মূল্যায়ন করছে ডব্লিউএইচও। তবে বৈশ্বিক পর্যায়ে ঝুঁকি কম।’ এর আগে মঙ্গলবার কঙ্গোর কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, ৫১৩টি সন্দেহভাজন সংক্রমণের মধ্যে আনুমানিক ১৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। দেশটি আগের ইবোলা মহামারীর সমাপ্তি ঘোষণা করার মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় নতুন এই প্রাদুর্ভাব দেখা দিল।
একই সংবাদ সম্মেলনে ডব্লিউএইচওর জরুরি বিভাগের প্রধান চিকউই ইহেকওয়াজু বলেছেন, সংস্থাটির মতে, ‘বিদ্যমান সব সংক্রমণ শৃঙ্খল শনাক্ত করাই এই মুহূর্তের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এর মাধ্যমে আমরা প্রাদুর্ভাবের প্রকৃত ব্যাপ্তি নির্ধারণ করতে পারব এবং আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবা দিতে সক্ষম হব।’
কঙ্গো ও উগান্ডার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ বলেছে, এই প্রাদুর্ভাবের পেছনে রয়েছে বান্ডিবুগিও স্ট্রেইন নামের ইবোলা ভাইরাসের একটি ধরন। এ ধরনের বিরুদ্ধে এখনো নেই কোনো কার্যকর টিকা বা চিকিৎসা। ৬০০ সন্দেহভাজন সংক্রমণের মধ্যে ৫১টি এরই মধ্যে নিশ্চিত হয়েছে বলে জানিয়েছে ডব্লিউএইচও। তাদের অবস্থান কঙ্গোর উত্তরাঞ্চলের ইতুরি ও নর্থ কিভু প্রদেশে। যেখানে প্রথম সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছিল এবার। উগান্ডাও রাজধানী কাম্পালায় দুটি সংক্রমণ নিশ্চিত করেছে। কঙ্গো থেকে উগান্ডায় গিয়েছিলেন আক্রান্ত দুই ব্যক্তি। তাদের মধ্যে মারা গেছেন একজন।
ডব্লিউএইচওর বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, তাদের ধারণা— এই প্রাদুর্ভাব কয়েক মাস আগে শুরু হয়েছে। প্রথম সন্দেহভাজন মৃত্যুর ঘটনা শনাক্ত হয় গত ২০ এপ্রিল কঙ্গোয়। প্রথম মৃত্যুর পর একটি সম্ভাব্য ‘সুপার-স্প্রেডার’ ঘটনা ঘটেছিল বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা। ধারণা করা হচ্ছে, সেটি কোনো জানাজা কিংবা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে ঘটতে পারে।
স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা জানিয়েছেন, রোগীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে বেশিরভাগ চিকিৎসা কেন্দ্রই। পর্যাপ্ত সুরক্ষা ছাড়াই এখনো কাজ করতে হচ্ছে তাদের।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক মুখপাত্র হর্নচিরোভা বলেছেন, ইউরোপে ইবোলার প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি ‘খুবই কম’। আমরা জানি রোগ সীমান্ত মেনে চলে না, ইবোলার ক্ষেত্রেও সেটি সত্য।’ তবে তিনি জানান, ইউরোপীয়দের জন্য সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বাইরে অতিরিক্ত কিছু করার প্রয়োজন আছে— এমন ‘কোনো ইঙ্গিত নেই।’
ইবোলা প্রাদুর্ভাবের বিরুদ্ধে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার দেশগুলো। যদিও ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক বলেছেন, আফ্রিকার বাইরে ঝুঁকি কম। সংযুক্ত আরব আমিরাত ইবোলা পর্যবেক্ষণ করছে। বাহরাইন এবং জর্ডান মঙ্গলবার কঙ্গো ও উগান্ডার ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে। বাহরাইনের নিষেধাজ্ঞায় দক্ষিণ সুদানও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
একই দিনে আমিরাতের স্বাস্থ্য ও প্রতিরোধ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা ‘যেকোনো স্বাস্থ্যগত পরিস্থিতির উন্নয়নে সাড়া দিতে প্রস্তুত’, তবে এখনো ঘোষণা করেনি কোনো ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা।
নড়েচড়ে বসেছে হংকংও। করোনাভাইরাস মহামারীর সময় কোয়ারেনটাইনের জন্য ব্যবহৃত লানতাউ দ্বীপের একটি আইসোলেশন সেন্টার পরিদর্শন করেছেন দেশটির কর্মকর্তারা।
ডব্লিউএইচওর উপদেষ্টা ডা. ভাসি মূর্তি বুধবার জেনেভায় সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘ইবোলার নির্দিষ্ট ধরনটির বিরুদ্ধে কার্যকর টিকা তৈরি হতে আরও ৯ মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।’ ১৯৭৬ সালে সর্বপ্রথম মধ্য আফ্রিকার দেশগুলোয় ইবোলা ভাইরাস শনাক্ত হয়।






