১০ বছরের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন দুই ঘণ্টায়
যেভাবে উত্তর কোরিয়া থেকে পালালেন একই পরিবারের ৯ জন

ছবি: এআই
উত্তর কোরিয়া মানেই এক রহস্যময় জেলখানা, যেখান থেকে পালানোর কথা ভাবলেও কলিজা শুকিয়ে যায়; কিন্তু সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছেন কিম পরিবারের ৯ জন সদস্য। ২০২৩ সালের ৬ মে রাতে একটি ছোট্ট মাছ ধরার নৌকায় চড়ে তারা নিঃশব্দে পীত সাগরে পাড়ি জমান। মাত্র দুই ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস যাত্রায় তারা পার হয়ে যান দুই কোরিয়ার বিপজ্জনক জলসীমা। এটি কেবল একটি পলায়ন নয়, বরং মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ফিরে আসার এক অবিশ্বাস্য গল্প।
এই পালানোর ছক কিন্তু এক দিনে হয়নি। ১০ বছরেরও বেশি সময় আগে কিম ভাইদের সমুদ্রপথে পালানোর বুদ্ধি দিয়েছিলেন তাদের বাবা। তিনি নিজে সেই স্বাধীনতা দেখে যেতে পারেননি; কিন্তু তার ছেলেরা ঠিকই বাবার স্বপ্ন পূরণ করেছেন। কিম ইল-হিউক এবং কিম ই-হিউক যেদিন শেষবারের মতো নৌকায় ওঠেন, সেদিন তারা সঙ্গে নিতে ভোলেননি বাবার চিতাভস্ম। বাবার স্মৃতি সঙ্গী করেই তারা পা বাড়ান অনিশ্চিত পথে।
পালানোর প্রস্তুতি ছিল দেখার মতো। ছোট ভাই কিম ই-হিউক উপকূলীয় এলাকায় গিয়ে মাছ ধরা শেখেন এবং নিজের জোগাড় করেন একটি নৌকা। এরপর শুরু হয় আসল খেলা। তিনি স্থানীয় রক্ষীদের ঘুষ দিয়ে হাত করেন এবং বারবার সীমান্তের কাছে মাছ ধরতে যাওয়ার ভান করেন। আসলে তিনি দেখছিলেন রক্ষীরা কতক্ষণ পরপর টহল দেয়। দিনের পর দিন এই নাটক করেই তিনি আসল পালানোর ছকটি নিখুঁতভাবে তৈরি করেন।
পালানোর রাতের দৃশ্যটি ছিল শিউরে ওঠার মতো। কিম ইল-হিউকের স্ত্রী ছিলেন পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা, তাকেসহ অন্য নারীদের প্রথমে হেঁটে পার হতে হয়েছে ভয়ংকর এক মাইনফিল্ড। একটু পা ফসকালেই মৃত্যু নিশ্চিত ছিল তাদের। এদিকে চার আর ছয় বছরের দুই শিশুকে পাটের বস্তার ভেতরে ঢুকিয়ে রাখা হয়েছিল। তাদের কঠোরভাবে বলে দেওয়া হয়েছিল মরে গেলেও যেন কোনো শব্দ না করে। পাহারাদারদের চোখ ফাঁকি দিতে ঝড়ের রাতের আবছা অন্ধকারকে বেছে নিয়েছিলেন তারা।
নৌকাটি পানির ওপর দিয়ে এত আস্তে চলছিল যে রাডারেও (যা সাধারণত গতিশীল বস্তু শনাক্ত করে) তাকে ধরা যাচ্ছিল না। মাঝ সমুদ্রে তখন সুনসান নীরবতা। সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কিম ইল-হিউক বলেন, সেই সময় ইঞ্জিনের শব্দের চেয়েও নিজের বুক ধড়ফড় করার শব্দ তার কাছে বেশি জোরে মনে হচ্ছিল। একটু পর পরই মনে হচ্ছিল এই বুঝি রক্ষীরা তাদের ধরে ফেলল; কিন্তু শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়ার ইওনপিয়ং দ্বীপের আলো দেখে তাদের ধড়ে প্রাণ ফিরে আসে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় পৌঁছানোর চার মাস পর সিউলে কিম দম্পতির কোলে এক ফুটফুটে কন্যাসন্তান আসে। পরিবারের সবাই মিলে ধুমধাম করে নাতনির প্রথম জন্মদিন পালন করেন। কিন্তু ভাগ্যের কী নিষ্ঠুর পরিহাস! এর মাত্র দুই মাস পর ছোট ভাই কিম ই-হিউক এক স্কুবা ডাইভিং দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। যার অক্লান্ত পরিশ্রমে পুরো পরিবার আজ স্বাধীন দেশে, তিনি নিজে সেই স্বাধীনতার স্বাদ উপভোগ করতে পারলেন মাত্র ১৯ মাস।
সব হারিয়েও বড় ভাই কিম ইল-হিউক এখন নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন। তিনি বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ায় বাবুর্চি হওয়ার প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন এবং সুযোগ পেলেই উত্তর কোরিয়ার বন্দি জীবনের দুঃসহ কাহিনী সবার কাছে তুলে ধরছেন। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে তার দ্বিতীয় কন্যাসন্তান পৃথিবীতে এসেছে। সবশেষে কিম ইল-হিউক বলেছেন, ‘হয়তো অনেক কিছু হারিয়েছি; কিন্তু পরিবার নিয়ে এই মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে পারছি, এটাই আমার সব থেকে বড় পাওয়া।’
কিম ইল-হিউকের কথা থেকে বোঝা যায় মানুষের জীবনে স্বাধীনতার গুরুত্ব কতটা অপরিসীম।


