ইন্দোনেশীয় তরুণীদের গানে মজেছে বিশ্ব

‘নো না’ গার্ল গ্রুপের সদস্যরা
এশিয়ার বিনোদন জগতে এখন বইছে পরিবর্তনের হাওয়া। এতকাল ধরে কোরিয়ান পপ বা কে-পপের জয়জয়কার থাকলেও এবার সোশ্যাল মিডিয়া তোলপাড় করছে নতুন এক গার্ল গ্রুপ। তবে অবাক করা বিষয় হলো, তারা দক্ষিণ কোরিয়া থেকে নয় বরং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ইন্দোনেশিয়া থেকে উঠে এসেছে। চার সদস্যের এই তুখোড় ব্যান্ডের নাম দেওয়া হয়েছে ‘নো না’।
চলতি বছরে তাদের ‘ওয়ার্ক’ নামের একটি মিউজিক ভিডিও ইন্টারনেটে ভাইরাল হওয়ার পরেই তারা রাতারাতি তারকা হয়ে গেছে। মাত্র দুই মাসের মধ্যে তাদের গানটি স্পটিফাই এবং ইউটিউবে কয়েক কোটিবার শোনা হয়েছে। বিশেষ করে গানে ব্যান্ডের একজন সদস্যের নাচের অসাধারণ ভঙ্গি দেখে দর্শকরা রীতিমতো থমকে গেছেন এবং ইন্টারনেটে এটি নিয়ে ড্যান্স চ্যালেঞ্জ শুরু হয়ে গেছে।
পশ্চিমা বাজারে এশীয় সংগীতের দাপট নতুন কিছু নয়, কারণ গত এক দশকে বিটিএস বা ব্ল্যাকপিঙ্কের মতো গ্রুপগুলো বিশ্ব কাঁপাচ্ছে। তবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোনো ব্যান্ড নিজেদের ঐতিহ্য ধরে রেখে এত বড় সাফল্য আগে কখনো পায়নি। এই গ্রুপের চারজন সদস্য হলেন এস্থার, বাইলা, ক্রিস্টি এবং শাজ। সিএনএন কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তারা জানিয়েছেন যে তাদের মূল লক্ষ্য হলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়াকে নতুনভাবে সবার কাছে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। এমনকি তাদের আধুনিক পোশাকের ভেতরেও ইন্দোনেশিয়ার ঐতিহ্যবাহী ‘বাটিক’ শিল্পের সূক্ষ্ম কারুকাজ রাখা হয়েছে। তারা ইংরেজি গানের সাথে নিজেদের দেশি বাদ্যযন্ত্রের এমন এক অদ্ভুত মিশ্রণ ঘটিয়েছেন যা আগে কেউ শোনেনি।
এই মেয়েদের সফল হওয়ার গল্পটা বেশ রোমাঞ্চকর। ইন্দোনেশিয়ায় জন্ম ও বড় হওয়া এই চারজন লস অ্যাঞ্জেলেসে গিয়ে প্রায় তিন বছর কঠোর প্রশিক্ষণ নেন এবং ২০২৫ সালের মে মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করেন। ব্যান্ডের নাম ‘নো না’ আসলে একটি স্থানীয় শব্দ যার অর্থ হলো ‘কুমারী’। তাদের গানের পরতে পরতে ইন্দোনেশিয়ার ছোঁয়া পাওয়া যায়। যেমন ‘ওয়ার্ক’ গানের শুরুতেই বালির বিখ্যাত ‘চেং-চেং’ বা করতাল ব্যবহার করা হয়েছে। আবার কোনো গানে শোনা যায় জাভা দ্বীপের প্রাচীন বাদ্যযন্ত্র ‘গ্যামেলান’ কিংবা বাঁশের বাঁশি ‘সুলিং’ এর সুর। এমনকি তাদের মিউজিক ভিডিওগুলোতে বালির মনোরম ধানের ক্ষেত আর ঝরনার দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে যা দর্শকদের মুগ্ধ করছে।
গ্রুপের সদস্যরা নিজেদের ‘আইল্যান্ড গার্ল’ বা দ্বীপের মেয়ে হিসেবে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন। যেহেতু ইন্দোনেশিয়া ১৭ হাজার দ্বীপের দেশ, তাই তাদের স্বভাবেও সেই মুক্ত আর প্রাণবন্ত ভাবটি ফুটে ওঠে। ব্যান্ডের প্রধান গায়িকা এস্থার জানান যে তারা চান মানুষ তাদের গান শুনে যেন একদম চিন্তামুক্ত ও সতেজ অনুভব করে। বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ার আরও অনেক শিল্পী যেমন নিকি বা রিচ ব্রায়ান বিশ্বমঞ্চে নাম করছেন। ফিলিপাইনের ‘বিনি’ গ্রুপটিও সম্প্রতি বড় বড় উৎসবে পারফর্ম করে সাড়া ফেলেছে। এই সব ঘটনা প্রমাণ করে যে সারা বিশ্বে এখন এশীয় সংস্কৃতির প্রতি মানুষের আগ্রহ পাগলের মতো বাড়ছে। এমনকি ২০২৬ সালে ব্যাংককে ইউরোভিশন প্রতিযোগিতার গ্র্যান্ড ফিনালে আয়োজনের প্রস্তুতিও চলছে।
‘নো না’ বর্তমানে সাফল্যের শিখরে থাকলেও তাদের মন পড়ে আছে নিজের দেশে। ইতিমধ্যে তারা টোকিওতে গান গেয়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছে এবং সামনে লস অ্যাঞ্জেলেসে বড় একটি উৎসবে অংশ নেবে। তবে ব্যান্ডের সদস্য বাইলা জানিয়েছেন যে তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হলো নিজের দেশে অর্থাৎ ইন্দোনেশিয়ায় বিশাল এক কনসার্ট করা। তারা চান বিদেশের মাটিতে নাম কামিয়ে একদিন দেশের মাটিতে ফিরে এসে হাজার হাজার ভক্তের সামনে গান গেয়ে শোনাবেন। সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় এখন দিন গুনছে হাজারো অনুরাগী।

