এয়ারবাসের সুপারজাম্বো এ৩৮০-এর উত্থান-পতনের গল্প

সুপারজাম্বো এ৩৮০। ছবি : রয়টার্স
একসময় আকাশপথে যাত্রী পরিবহনের নতুন যুগের প্রতীক হয়ে উঠেছিল এয়ারবাস এ৩৮০। দুই তলা বিশাল এই উড়োজাহাজে একসঙ্গে ৮৫৩ জন পর্যন্ত যাত্রী বহন করা যায়।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে বিমান চলাচলের চাহিদা। বেড়েছে জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ। ফলে একসময়কার এই সুপারজাম্বোর এখন কমছে জনপ্রিয়তা।
সর্বশেষ সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার কান্তাস এয়ারওয়েজ। গত বৃহস্পতিবার প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ২০২৮ সালের মাঝামাঝি থেকে তাদের বহরে থাকা ১০টি এ৩৮০ অবসরে পাঠানো শুরু হবে।
আগের পরিকল্পনার চেয়ে চার বছর আগেই উড়োজাহাজগুলো অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটি।
কান্তাসের ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড ফ্রেইট বিভাগের প্রধান নির্বাহী ক্যাম ওয়ালেস জানিয়েছেন, এ৩৮০ উড্ডয়ন সচল রাখা দিন দিন ব্যয়বহুল ও জটিল হয়ে উঠছে। কারণ ২০২১ সাল থেকেই এই মডেলের উৎপাদন বন্ধ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যন্ত্রাংশ সরবরাহ ব্যবস্থার বাড়তি চাপ।
এয়ারবাস এ৩৮০ তৈরি করেছিল দীর্ঘপাল্লার উড়োজাহাজের বাজারে বোয়িং ৭৪৭-এর আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে। চার ইঞ্জিনের এই উড়োজাহাজটি পুরোপুরি দুই তলা। আকার ও যাত্রী ধারণক্ষমতায় এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ।
২০০৭ সালে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের মাধ্যমে এ৩৮০ বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু করে। এরপর বিভিন্ন এয়ারলাইনসের বহরে যুক্ত হয় এই বিশাল উড়োজাহাজ।
এয়ারবাস মোট ২৫১টি এ৩৮০ সরবরাহ করেছিল। তবে ২০২১ সালে এই মডেলের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।
এ৩৮০-এর বড় সমস্যা ছিল এর পরিচালন ব্যয়। বিশাল আকারের কারণে এতে জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ বেশি। একই সঙ্গে ৫০০-এর বেশি আসন নিয়মিত পূরণ করাও অনেক এয়ারলাইনসের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
এর ওপর বাজারে আসে আরও জ্বালানিসাশ্রয়ী দুই ইঞ্জিনের ওয়াইডবডি উড়োজাহাজ। বোয়িং ৭৮৭ ও এয়ারবাস এ৩৫০-এর মতো উড়োজাহাজ এ৩৮০-এর অর্থনৈতিক সুবিধাকে আরও দুর্বল করে দেয়।
করোনাভাইরাস এ৩৮০-এর পতন আরও ত্বরান্বিত করেছে। আন্তর্জাতিক ভ্রমণ প্রায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বের প্রায় পুরো এ৩৮০ বহরই গ্রাউন্ডেড হয়ে পড়ে।
এয়ারবাসের জুলাইয়ের তথ্য অনুযায়ী, সরবরাহ করা ২৫১টি এ৩৮০-এর মধ্যে বর্তমানে ১৯৬টি সেবায় রয়েছে।
এ৩৮০ বহর থেকে সরে যাওয়ার ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। এয়ার ফ্রান্স তাদের ১০টি এ৩৮০ ২০২০ সালেই অবসরে পাঠায়। আন্তর্জাতিক ভ্রমণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ২০২২ সালের পরিবর্তে আগেই এ সিদ্ধান্ত নেয় তারা।
করোনাকালে কান্তাসের এ৩৮০ বহর ৫০০ দিনেরও বেশি সময় গ্রাউন্ডেড ছিল। আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ধসে পড়ায় উড়োজাহাজগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ও আবুধাবিতে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণে রাখা হয়েছিল।
এ ছাড়া থাই এয়ারওয়েজ, লুফথানসা, কোরিয়ান এয়ার, সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস ও কাতার এয়ারওয়েজও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় তাদের এ৩৮০ বহর কমিয়েছে।
তবে এ৩৮০ এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। বরং সবচেয়ে বড় বহরটি ধরে রেখেছে এমিরেটস। তাদের বহরে বর্তমানে ১১৬টি এ৩৮০ রয়েছে। অর্থাৎ এখন পর্যন্ত সরবরাহ করা মোট এ৩৮০-এর প্রায় অর্ধেকই এমিরেটসের বহরে।
এমিরেটসের পর সবচেয়ে বড় এ৩৮০ অপারেটর সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস ও ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ। দুই প্রতিষ্ঠানই ১২টি করে এ৩৮০ পরিচালনা করছে।
লুফথানসা, কাতার এয়ারওয়েজ ও ইতিহাদ এয়ারওয়েজের বহরে রয়েছে আটটি করে এ৩৮০। কোরিয়ান এয়ার, এশিয়ানা এয়ারলাইনস এবং জাপানের অল নিপ্পন এয়ারওয়েজও এখনো এই মডেলের উড়োজাহাজ পরিচালনা করছে।
এ৩৮০-এর বিদায়ের সময় অবশ্য সব এয়ারলাইনসের জন্য এক নয়। এমিরেটস ২০৪০-এর দশক পর্যন্ত এই বিশাল উড়োজাহাজ উড়িয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। অন্যদিকে অন্যান্য অপারেটররা ২০৩০-এর দশকের শুরুর দিক থেকে এ৩৮০ বহর থেকে প্রস্তুতি নিচ্ছে সরে যাওয়ার।
সূত্র : রয়টার্স










